ম্যান্ডেলা দিবস, আদর্শ ও উত্তরাধিকার ঘিরে বিভক্ত দক্ষিণ আফ্রিকা

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৪:১৭ পিএম

দক্ষিণ আফ্রিকায় নেলসন ম্যান্ডেলার আদর্শ ও উত্তরাধিকারকে ঘিরে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। দারিদ্র্য, বৈষম্য, বেকারত্ব এবং সামাজিক বিভাজনের মধ্যে এবারের নেলসন ম্যান্ডেলা দিবস দেশটিতে নতুন তাৎপর্য পেয়েছে। বিশেষ করে অভিবাসীবিরোধী সংগঠন ‘মার্চ অ্যান্ড মার্চ’-এর কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বিষয়টি আরও আলোচনায় এসেছে।

প্রতি বছর ১৮ জুলাই জাতিসংঘ ঘোষিত নেলসন ম্যান্ডেলা আন্তর্জাতিক দিবস পালিত হয়। ম্যান্ডেলার জনসেবামূলক ৬৭ বছরের সংগ্রামের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এদিন মানুষকে অন্তত ৬৭ মিনিট সমাজসেবামূলক কাজে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

তবে এবার সেই দিনটিকেই ভিন্নভাবে ব্যবহার করার ঘোষণা দিয়েছে অভিবাসীবিরোধী সংগঠন ‘মার্চ অ্যান্ড মার্চ’। সংগঠনটি জানিয়েছে, পূর্ব কেপ প্রদেশের বিভিন্ন শহরে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে তারা অবৈধভাবে অবস্থানরত বিদেশি শ্রমিক ও লাইসেন্সবিহীন ব্যবসা শনাক্ত করবে। তাদের দাবি, সরকারের ব্যর্থতার কারণে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়েছে এবং বিদেশি নাগরিকদের কারণে স্থানীয়দের কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এই ঘোষণার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে নেলসন ম্যান্ডেলা ফাউন্ডেশন। ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী মবঙ্গিসেনি বুথেলেজি বলেন, ম্যান্ডেলা দিবসকে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের চেষ্টা তার মানবিকতা, সংলাপ ও সাংবিধানিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। তিনি বলেন, 'এটি বিভাজন সৃষ্টি করে এবং আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই। ম্যান্ডেলার নামে কোনো শহর থেকে অভিবাসীদের তাড়িয়ে দেওয়ার কর্মসূচি গ্রহণ করা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।'

দক্ষিণ আফ্রিকা বর্তমানে উচ্চ বেকারত্ব, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং জনসেবায় সংকটের মতো নানা সমস্যার মুখোমুখি। ‘মার্চ অ্যান্ড মার্চ’-এর দাবি, অবৈধ অভিবাসীরা স্থানীয় শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াচ্ছে এবং সীমিত সম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। তারা কঠোর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও অভিবাসন আইন বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছে।

অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা ও অর্থনৈতিক সংকটের দায় অন্যদিকে সরিয়ে দিতেই অভিবাসীদের লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে। বুথেলেজি বলেন, 'রাষ্ট্রের ব্যর্থতার জন্য অভিবাসীরা দায়ী নয়। বাস্তব সমস্যাগুলোকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।'

সরকার একদিকে বিদেশিবিদ্বেষের নিন্দা জানালেও অন্যদিকে অভিবাসনবিষয়ক অভিযান জোরদার করেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ৫৩ হাজারের বেশি বিদেশি নাগরিককে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তাদের অধিকাংশই জিম্বাবুয়ে, মালাউই ও মোজাম্বিকের নাগরিক। তবে একই সঙ্গে সরকার জনগণকে আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। এরপরও বিভিন্ন অভিবাসীবিরোধী সংগঠন নিজেদের উদ্যোগে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।

আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের (এএনসি) ভেটেরান্স লীগের সভাপতি এবং ম্যান্ডেলার ঘনিষ্ঠ সহযোগী স্নুকি জিকালালা বলেন, ম্যান্ডেলা কখনোই আফ্রিকান অভিবাসীদের বিরুদ্ধে এমন অবস্থান সমর্থন করতেন না। তার ভাষায়, 'ম্যান্ডেলার নাম ব্যবহার করে মানুষকে তাড়িয়ে দেওয়া যাবে না। তারা মানুষ, কোনো পশু নয়।'

তিনি স্বীকার করেন, জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষায় এএনসি ব্যর্থ হয়েছে এবং দুর্বল নেতৃত্বের সুযোগে বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে তার দাবি, ‘মার্চ অ্যান্ড মার্চ’ দেশকে অস্থিতিশীল করার একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। যদিও সংগঠনটির নেতারা এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, তাদের একমাত্র লক্ষ্য দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিকদের স্বার্থ রক্ষা করা।

এদিকে বিতর্কের মধ্যেই ম্যান্ডেলার উত্তরাধিকার নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। আহমেদ কাথরাদা ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক নিশান বোল্টন বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ম্যান্ডেলার মুক্তিসংগ্রামী পরিচয় আড়ালে পড়ে গেছে এবং তাকে কেবল সমাজসেবার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, 'প্রত্যেকে নিজেদের সুবিধামতো ম্যান্ডেলাকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছে।'

এবারের ম্যান্ডেলা দিবসের প্রতিপাদ্য ‘দারিদ্র্য ও বৈষম্য দূর করা এখনো আমাদের হাতেই’। তবে এই প্রতিপাদ্যের পাশাপাশি দক্ষিণ আফ্রিকায় অভিবাসন, বৈষম্য ও জাতীয় পরিচয় নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, তা ম্যান্ডেলার উত্তরাধিকারকে নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। সূত্র: আলজাজিরা

AS
আরও পড়ুন