ইরানি হ্যাকারকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ করবে মন্টেনেগ্রো

আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৫১ পিএম

ইরানি-তুর্কি নাগরিক ও সাইবার হ্যাকার আমির বারাতিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণের অনুমোদন দিয়েছে মন্টেনেগ্রো। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী—আইআরজিসি ও অন্যান্য ইরানি প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে পরিচালিত একটি বড় সাইবার হামলা অভিযানে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

মন্টেনেগ্রোর পডগোরিৎসার হাইকোর্ট সরলীকৃত প্রক্রিয়ায় বারাতির প্রত্যর্পণের অনুমোদন দিয়েছে। আদালতের সিদ্ধান্তের পর দেশটির বিচার মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগকে বিষয়টি জানিয়েছে। পরবর্তী আনুষ্ঠানিকতা পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে সম্পন্ন করা হবে বলে জানিয়েছেন মন্টেনেগ্রোর বিচারমন্ত্রী বোয়ান বোজোভিচ।

৩৯ বছর বয়সী বারাতিকে গত ২৫ জুন মন্টেনেগ্রোর উপকূলীয় শহর কোটরে গ্রেপ্তার করা হয়। স্থানীয় পুলিশ ও যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন—এফবিআইয়ের যৌথ অভিযানে তাকে আটক করা হয়েছিল। মন্টেনেগ্রোর পুলিশ জানিয়েছিল, তিনি ইরান ও তুরস্ক—দুই দেশের নাগরিক।

বারাতির বিরুদ্ধে অভিযোগটি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মাবনা ইনস্টিটিউট সাইবার মামলার সঙ্গে যুক্ত। মার্কিন বিচার বিভাগ গত ১৮ আগস্ট প্রকাশ করা সংশোধিত অভিযোগপত্রে মাবনা ইনস্টিটিউটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১৭ ইরানির বিরুদ্ধে মামলা করে।

মার্কিন প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, তেহরানভিত্তিক মাবনা ইনস্টিটিউট ২০১৩ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি কোম্পানি এবং সরকারি সংস্থায় ধারাবাহিক সাইবার হামলা চালায়। এসব হামলার উদ্দেশ্য ছিল গবেষণা, একাডেমিক তথ্য, মেধাস্বত্ব ও অন্যান্য সংবেদনশীল তথ্য হাতিয়ে নেওয়া।

মার্কিন বিচার বিভাগের হিসাবে, এই নেটওয়ার্ক যুক্তরাষ্ট্রের ১৪৪টি এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশের ১৭৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালায়। এর মাধ্যমে ৩১ টেরাবাইটের বেশি একাডেমিক তথ্য ও মেধাস্বত্ব চুরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। মার্কিন কোম্পানি, সরকারি সংস্থা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও এ হামলার লক্ষ্য ছিল।

মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, এসব কর্মকাণ্ডের একটি অংশ আইআরজিসির হয়ে পরিচালিত হয়েছিল। তবে অভিযোগপত্রে থাকা এসব দাবি এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি।

বারাতির বিরুদ্ধে কী অভিযোগ?

মার্কিন বিচার বিভাগ বলছে, মাবনা নেটওয়ার্কের কার্যক্রমে বারাতির নির্দিষ্ট ভূমিকার মধ্যে ছিল স্পিয়ার-ফিশিং অভিযানের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, হ্যাক করা অ্যাকাউন্টের লগইন তথ্য সহ-ষড়যন্ত্রকারীদের মধ্যে আদান-প্রদান, সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকা তৈরি, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ এবং ফিশিং বার্তা তৈরিতে সহায়তা করা।

তার বিরুদ্ধে কম্পিউটার অনুপ্রবেশ ও ওয়্যার জালিয়াতির ষড়যন্ত্র, কম্পিউটার জালিয়াতি, ওয়্যার ফ্রড এবং গুরুতর পরিচয় চুরিসহ মোট সাতটি অভিযোগ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মন্টেনেগ্রোর পুলিশ এর আগে জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র বারাতির বিরুদ্ধে অন্তত ১৫০টি মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোয় ব্যাপক সাইবার হামলা এবং গোপন তথ্য ও মেধাস্বত্ব চুরির অভিযোগ এনেছে। এসব হামলায় ক্ষতির পরিমাণ ৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি বলে মার্কিন অভিযোগের বরাত দিয়ে জানিয়েছিল পুলিশ।

‘কিংলেট’ নামে পুরোনো সাইবার পরিচয়

ইরান ইন্টারন্যাশনালের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বারাতির সাইবার কর্মকাণ্ডের আরও পুরোনো ইতিহাসের কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৮৬ সালে ইরানের মাশহাদে জন্ম নেওয়া বারাতি তরুণ বয়সে ‘Iran Black Hats Team’ প্রতিষ্ঠা করেন। পরে তিনি ‘Digital Boys Underground Team’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা হন এবং অনলাইনে ‘Kinglet’ নামে পরিচিত ছিলেন।

ইরান ইন্টারন্যাশনালের দাবি, পুরোনো অনলাইন রেকর্ডে এসব সাইবার গ্রুপের সঙ্গে বিভিন্ন একাডেমিক, বাণিজ্যিক ও সরকারি ওয়েবসাইটে হামলার যোগসূত্র পাওয়া গেছে। এসব দাবির মধ্যে নাসা, মাইক্রোসফট, এমআইটি ও মার্কিন সামরিক ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সিস্টেমের নামও রয়েছে।

প্রতিবেদনটি আরও দাবি করে, ২০১০ সালে ইরানের গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়ের হাতে গ্রেপ্তারের পর বারাতির সঙ্গে দেশটির নিরাপত্তা কাঠামোর সম্পর্কের পরিবর্তন ঘটে। কয়েকটি সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, পরে তাকে অনুসরণ করার বদলে ইরানি কর্তৃপক্ষ তার সাইবার দক্ষতা কাজে লাগায়। তবে ইরান ইন্টারন্যাশনাল নিজেও উল্লেখ করেছে, গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপের বিষয়ে স্বাধীনভাবে এসব দাবি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

তুরস্কে চলে যাওয়ার পর মন্টেনেগ্রোতে গ্রেপ্তার

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বারাতি ২০২১ সালে ইরান ছেড়ে তুরস্কে চলে যান। পরে তিনি তুরস্কের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন এবং আদালতের মাধ্যমে নিজের নামও পরিবর্তন করেন।

মন্টেনেগ্রোর পুলিশ জানায়, ২৫ জুন কোটরে ছুটিতে থাকার সময় এফবিআইয়ের অনুরোধের ভিত্তিতে তাকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে প্রত্যর্পণের আবেদন করা হয়েছিল।

মন্টেনেগ্রোর স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘ভিয়েস্তি’ জানিয়েছে, পডগোরিৎসার হাইকোর্টের সিদ্ধান্তের পর বিচার মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগকে প্রত্যর্পণের বিষয়টি অবহিত করেছে। এখন পুলিশের সহযোগিতায় পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।

সাইবার নিরাপত্তায় নতুন চাপ

বারাতির প্রত্যর্পণ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মাবনা ইনস্টিটিউট-সংশ্লিষ্ট দীর্ঘদিনের সাইবার মামলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। ২০১৮ সালে এই নেটওয়ার্কের কয়েকজনের বিরুদ্ধে প্রথমবার অভিযোগ আনা হয়েছিল। ২০২৬ সালের নতুন অভিযোগপত্রে আরও আটজনকে যুক্ত করে মোট ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

মার্কিন বিচার বিভাগ বলছে, অভিযুক্তদের বেশির ভাগই যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে অবস্থান করছে। ফলে তাদের গ্রেপ্তার ও বিচারের আওতায় আনা কঠিন হয়ে আছে। বারাতি সেই তালিকার ব্যতিক্রম—তাকে তৃতীয় একটি দেশে অবস্থানের সময় গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে এবং এখন যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর আইনি প্রক্রিয়া এগিয়ে যাচ্ছে।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বারাতির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি। তিনি দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত আইনের দৃষ্টিতে নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত হবেন।

এমইউ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত