যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাপের কাছে ইরান তার অধিকার ও স্বার্থ বিসর্জন দেবে না বলে জানিয়েছে আইআরজিসি ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম ফারস নিউজ। ইরানের আলোচনাকারী দলের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, সামরিক ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও তেহরান নিজেদের অবস্থান থেকে সরে যাওয়ার বিষয়ে প্রস্তুত নয়।
সূত্রটি বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সর্বশেষ প্রস্তাবে ইরান একতরফা কোনো ছাড়ের কথা বলেনি। বরং প্রস্তাবটিতে ছিল ‘পারস্পরিক ও ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য একাধিক পদক্ষেপ’। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের কথা প্রকাশ্যে জানানোর পর ফারস নিউজের ওই সূত্র এই মন্তব্য করে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এর আগে জানিয়েছিলেন, তেহরান কাতারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সাত দিনের একটি রোডম্যাপ দিয়েছে। এতে প্রাথমিক কিছু পদক্ষেপ বাস্তবায়নের পর ষষ্ঠ দিনে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং সপ্তম দিনে পারমাণবিক ইস্যুসহ চূড়ান্ত সমঝোতা নিয়ে আলোচনা শুরুর প্রস্তাব রয়েছে। ইরানের প্রস্তাব অনুযায়ী, এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, ইরানের তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা শিথিল এবং অঞ্চলজুড়ে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার মতো পদক্ষেপ নিতে হবে। ইরান আরও কিছু জব্দ করা সম্পদ ছাড়ের দাবি জানিয়েছে বলে আল-জাজিরা জানিয়েছে।
তেহরানের বক্তব্য, এসব পদক্ষেপ পারস্পরিকভাবে বাস্তবায়িত হলে হরমুজে স্বাভাবিক নৌ চলাচল পুনরায় চালু করা এবং পরবর্তী পর্যায়ে পারমাণবিক আলোচনা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। ট্রাম্প শনিবার বলেছেন, তিনি ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে ইরানের আলোচনায় মূল মতপার্থক্যের একটি জায়গা হলো- তেহরান হরমুজ ও মার্কিন নৌ অবরোধকে আলোচনার কেন্দ্রীয় বিষয় করতে চাইছে, আর ওয়াশিংটন পারমাণবিক ইস্যুতে ইরানের কাছ থেকে আরও বড় ধরনের ছাড় চাচ্ছে।
তবে ট্রাম্পের প্রকাশ্য প্রত্যাখ্যানের পরও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা এখনো যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে। ফারস নিউজের আলোচনাকারী দলের ঘনিষ্ঠ সূত্রের বক্তব্যের মূল বার্তা হলো- যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সামরিক ও রাজনৈতিক চাপকে আলোচনায় ইরানের অবস্থান দুর্বল করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।
ইরানি কর্মকর্তারা এর আগেও বলে আসছেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপ ও নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের সঙ্গে যুক্ত। আরাগচি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে বলেছিলেন, ইরান চাপ, হুমকি বা ভয় দেখানোর কাছে নতি স্বীকার করবে না। তবে একই সময়ে তেহরান আলোচনার পথও খোলা রেখেছে। কাতারসহ মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনা হয়েছে এবং মার্কিন কর্মকর্তারাও এসব আলোচনাকে ‘ইতিবাচক ও গঠনমূলক’ বলে বর্ণনা করেছেন।
চলমান সংকটে হরমুজ প্রণালি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের বাণিজ্যিক তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। ফলে দীর্ঘ সময় হরমুজে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তার প্রভাব পড়ে। তবে মার্কিন পক্ষ বলছে, তাদের সামরিক সহায়তায় এখনো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তেলবাহী জাহাজ হরমুজ অতিক্রম করছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী, গত কয়েক দিনে কয়েক কোটি ব্যারেল তেল প্রণালিটি দিয়ে পরিবহন করা হয়েছে। তবে স্বাধীন শিপিং ডেটায় জাহাজ চলাচল এখনো যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় অনেক কম দেখা যাচ্ছে।
ফলে হরমুজকে ঘিরে ইরানের চাপ কতটা কার্যকর এবং যুক্তরাষ্ট্র কতটা তা সামাল দিতে পারছে এটি দুই পক্ষের দর-কষাকষির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। ট্রাম্পের প্রকাশ্য প্রত্যাখ্যানের পর ইরান সরাসরি নতুন কোনো সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেনি। বরং মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের আনুষ্ঠানিক অবস্থানের অপেক্ষায় রয়েছে তেহরান।
এদিকে ফারস নিউজের সূত্রের বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করছে না ইরান। তবে সেই সমঝোতা হতে হবে পারস্পরিক ও ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য শর্তের ভিত্তিতে এমন অবস্থানই তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ বর্তমান অচলাবস্থায় মূল প্রশ্ন শুধু হরমুজ কখন খুলবে তা নয়; বরং হরমুজ খোলার বিনিময়ে ইরান কী পাবে এবং যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের নিশ্চয়তা ও ছাড় দিতে প্রস্তুত, দর-কষাকষির কেন্দ্র এখন সেখানেই।
কানাডায় হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে পাইলটসহ নিহত ৪
ব্যাপক সহায়তা করেছে চীন-রাশিয়া: পেজেশকিয়ান
যে কারণে ইরানের শর্ত মানতে চাইছেন না ট্রাম্প
'ইরান এখনই আত্মসমর্পণ বা পরাজয় মেনে নেওয়ার অবস্থায় নেই'