'ইরান এখনই আত্মসমর্পণ বা পরাজয় মেনে নেওয়ার অবস্থায় নেই'

আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০২ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের প্রস্তাবিত সাত দিনের রোডম্যাপ প্রত্যাখ্যান করার পর ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত আবারও সামরিক উত্তেজনার দিকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এক বিশ্লেষক। বিশেষ করে নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় আগামী কয়েক সপ্তাহকে সংঘাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে দেখছেন তিনি।

দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহামাদ এলমাসরি আল জাজিরাকে বলেছেন, ইরান এখনই আত্মসমর্পণ বা কোনো ধরনের পরাজয় মেনে নেওয়ার অবস্থায় নেই। ফলে নভেম্বরের নির্বাচনের আগে সংঘাত আরও বাড়ার বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

এলমাসরির ভাষায়, ইরান চাইলে ট্রাম্পের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের জবাব দিতে পারে এবং দেশটির ওপর চলমান অর্থনৈতিক চাপের মূল্য যুক্তরাষ্ট্রকে দিতে বাধ্য করার চেষ্টা করতে পারে। তাঁর মতে, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, ততই এমন ঝুঁকি বাড়তে পারে।

ইরান সম্প্রতি কাতারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সাত দিনের একটি রোডম্যাপ পাঠায়। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হলে কয়েক দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া এবং সপ্তম দিনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরুর কথা বলা হয়।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছিলেন, প্রস্তাবটির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ তুলে নিতে, ইরানি তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে এবং আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হতে হবে। বিনিময়ে তেহরান হরমুজ দিয়ে স্বাভাবিক নৌ চলাচল পুনরায় চালুর কথা বলেছে।

কিন্তু ট্রাম্প ২৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশ্যে জানান, তিনি ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ইরান দ্রুত হরমুজ খুলতে চাইছে কারণ মার্কিন অবরোধের কারণে দেশটির আয় কমে গেছে।

এর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ট্রাম্প নির্বাচনের পর ইরানের বিরুদ্ধে আবারও বোমা হামলা চালানোর কথা তাঁর সহযোগীদের জানিয়েছেন। তবে এটি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন; নতুন হামলার কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়নি।

এলমাসরির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান যদি মনে করে কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রত্যাখ্যাত হয়েছে এবং অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ছে, তাহলে সামরিক বা কৌশলগত চাপ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

তবে তেহরান এখনো কূটনৈতিক পথ পুরোপুরি বন্ধ করেনি। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান সম্প্রতি আল জাজিরাকে বলেছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় তেহরানের আস্থা কমে গেছে। তাঁর অভিযোগ, আগের আলোচনার পর হামলা ও নিষেধাজ্ঞা এসেছে। একই সময়ে কাতার ও পাকিস্তান ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানে ভূমিকা রাখছে।

অর্থাৎ, সামরিক উত্তেজনার ঝুঁকি থাকলেও যোগাযোগের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি।

এলমাসরি মনে করেন, হরমুজ নিয়ে ইরানের প্রস্তাবকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও দেখা যায়। তাঁর মতে, হরমুজ খুলে দেওয়া হলে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ বাড়তে পারে এবং জ্বালানির দামের ওপর চাপ কমতে পারে। ফলে নভেম্বরের নির্বাচনের আগে মার্কিন ভোটারদের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ কমানোর একটি সুযোগ তৈরি হতে পারত।

হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট বাণিজ্যিক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে যাতায়াত করত। সংঘাতের কারণে এ পথের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও চাপ তৈরি হয়েছে।

এলমাসরি আরও বলেন, অর্থনৈতিক চাপ শুধু ইরানের ওপরই পড়ছে না; যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের ওপরও জ্বালানি মূল্য, যুদ্ধের ব্যয় এবং রাজনৈতিক চাপ রয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনটি বিষয় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালির নৌ চলাচল, ইরানের ওপর মার্কিন অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ এবং নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন।

ওয়াশিংটন হরমুজ দিয়ে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে চাইছে। অন্যদিকে তেহরান এটিকে আলোচনার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ধরে রাখতে চাইছে। ফলে উভয় পক্ষের অবস্থান এখনো অনেক দূরে।

তবে ইরান কূটনৈতিক প্রস্তাব দেওয়ার পরও ট্রাম্প তা প্রত্যাখ্যান করায় আলোচনার সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। একই সঙ্গে ইরান জানিয়েছে, তারা আত্মসমর্পণের অবস্থানে নেই এবং সামরিক চাপ অব্যাহত থাকলে প্রতিক্রিয়া জানাবে।

ফলে আগামী দিনগুলোতে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত থাকে, নাকি হরমুজ ও আঞ্চলিক সামরিক স্থাপনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে সংঘাত শুরু হয় সেদিকেই নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের।

বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনের আগে নতুন করে বড় ধরনের মার্কিন-ইরান সামরিক সংঘাত হবে এমন কোনো নিশ্চিত সিদ্ধান্ত বা ঘোষণা এখনো নেই। এটি মূলত বিভিন্ন বিশ্লেষক ও মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে আসা সম্ভাবনা। একই সময়ে ইরানও কূটনৈতিক সমাধানের কথা বলছে।

এএম
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত