যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই দ্বীপের অন্যতম পরিচিত প্রাকৃতিক নিদর্শন হোলেই সি আর্চ অবশেষে ধসে প্রশান্ত মহাসাগরে বিলীন হয়েছে। প্রায় ৫৫০ বছর আগে লাভা থেকে গড়ে ওঠা ৯০ ফুট বা প্রায় ২৭ দশমিক ৪ মিটার উঁচু এই প্রাকৃতিক খিলানটি হাওয়াই ভলকানোস ন্যাশনাল পার্কের উপকূলের একটি জনপ্রিয় পর্যটন আকর্ষণ ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিস জানিয়েছে, গত ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খিলানটি উপকূল থেকে সমুদ্রের দিকে দাঁড়িয়ে ছিল। তবে ২৭ সেপ্টেম্বর রোববার রাতের মধ্যে সেটি আর দেখা যায়নি। ঠিক কখন এটি ধসে পড়ে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পার্কটি সাময়িকভাবে বন্ধ থাকার সময় হারিকেন নোলোর প্রভাবে ধসটি ঘটে থাকতে পারে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
হোলেই সি আর্চের আশপাশের উপকূলীয় পাহাড়ে বহু বছর ধরেই অস্থিতিশীলতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল। বিশেষ করে ২০১৮ সালে কিলাউয়া আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ও শীর্ষভাগ ধসে পড়ার সময় সৃষ্ট ভূমিকম্পে খিলানটির আশপাশের খাড়া পাথুরে দেয়াল ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
২০২০ সালের জানুয়ারিতে পাহাড়ের দেয়ালে নতুন ফাটল ও অস্থিতিশীলতা দেখা দেওয়ার পর পুরোনো দর্শনীয় স্থানটি বন্ধ করে দেয় পার্ক কর্তৃপক্ষ। একই বছরের মার্চে দর্শনার্থীদের জন্য অপেক্ষাকৃত নিরাপদ দূরত্বে নতুন পর্যবেক্ষণ এলাকা চালু করা হয়।
এরপর ২০২০ সালের শেষ দিকে একটি শক্তিশালী গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড়ের বড় ঢেউ খিলানটির নিচের অংশের একটি বড় পাথর ভেঙে ফেলে। তখন থেকেই এর ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
হোলেই সি আর্চ ছিল প্রকৃতির দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়প্রক্রিয়ার একটি ফল। ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫৫০ বছর আগে লাভার প্রবাহ ঠান্ডা হয়ে শক্ত পাথরে পরিণত হওয়ার পর বাতাস ও সমুদ্রের ঢেউয়ের ক্রমাগত ক্ষয়ের ফলে উপকূলের পাথরে গুহা তৈরি হয়। সময়ের সঙ্গে সেই গুহা বিস্তৃত হয়ে প্রাকৃতিক খিলানের রূপ নেয়।
সমুদ্রের ঢেউয়ের এই ক্ষয়প্রক্রিয়া থেমে যায় না। খিলান তৈরি হওয়ার পরও ঢেউ তার পাথুরে কাঠামো ক্ষয় করতে থাকে। একপর্যায়ে খিলানের ওপরের অংশ দুর্বল হয়ে ধসে পড়ে। সাধারণত এরপর সেখানে পাথরের স্তম্ভ বা ‘সি স্ট্যাক’ তৈরি হতে পারে।
৫৫০ বছর ধরে উপকূলের সাক্ষী
হোলেই সি আর্চ হাওয়াইয়ের বিগ আইল্যান্ড নামে পরিচিত দ্বীপের হাওয়াই ভলকানোস ন্যাশনাল পার্কের চেইন অব ক্রেটার্স রোডের শেষ প্রান্তে অবস্থিত ছিল। এর অবস্থান ছিল খাড়া লাভাপাথরের উপকূল থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে বেরিয়ে থাকা একটি বিশাল প্রাকৃতিক খিলান হিসেবে।
পার্ক কর্তৃপক্ষ বহু আগে থেকেই দর্শনার্থীদের সতর্ক করে আসছিল। ২০২১ সালে ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিস জানিয়েছিল, খিলানটি শেষ পর্যন্ত সমুদ্রে ভেঙে পড়বে। একই সঙ্গে কর্তৃপক্ষ বলেছিল, উপকূল ধীরে ধীরে স্থলভাগের দিকে সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যতে অন্য জায়গায় নতুন খিলান তৈরি হতে পারে।
ঝড় ও ভূমিকম্পের প্রভাব
সাম্প্রতিক ধসের ক্ষেত্রে একক কোনো কারণ নিশ্চিত করা হয়নি। তবে ভূমিকম্প, সমুদ্রের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয় এবং শক্তিশালী ঢেউ—সব মিলিয়ে কাঠামোটির স্থায়িত্ব ক্রমেই কমে এসেছিল। হারিকেন নোলোর সময় পার্ক সাময়িকভাবে বন্ধ থাকায় ধসের মুহূর্তটি প্রত্যক্ষ করার সুযোগও হয়নি।
ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিস জানিয়েছে, খিলানটি ধসে পড়ার পরও ওই উপকূল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। খাড়া পাহাড়ের কিনারা অস্থিতিশীল এবং যেকোনো সময় আরও পাথর ধসে পড়তে পারে। তাই বন্ধ এলাকায় প্রবেশ না করতে দর্শনার্থীদের সতর্ক করা হয়েছে।
প্রকৃতির পরিবর্তনের আরেকটি স্মারক
হোলেই সি আর্চের বিলীন হয়ে যাওয়া শুধু একটি পর্যটন আকর্ষণ হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা নয়; এটি হাওয়াইয়ের পরিবর্তনশীল ভূপ্রকৃতিরও একটি দৃশ্যমান উদাহরণ। যে সমুদ্রের ঢেউ শত শত বছর ধরে লাভাপাথর ক্ষয় করে এই খিলান তৈরি করেছিল, শেষ পর্যন্ত সেই একই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াই এর পতন ঘটিয়েছে।
ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিসের ভাষায়, হোলেই ছিল সুন্দর কিন্তু সাময়িক একটি প্রাকৃতিক কাঠামো। এর জায়গায় ভবিষ্যতে উপকূলের অন্য কোনো অংশে নতুন প্রাকৃতিক খিলান তৈরি হতে পারে—যদিও তা ঘটতে কত সময় লাগবে, তা বলা সম্ভব নয়।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হোলেই সি আর্চের পতনের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সেখানে পুরোনো ছবি ও ভ্রমণের স্মৃতি শেয়ার করছেন বহু মানুষ। বহু বছর ধরে পর্যটকদের ক্যামেরায় বন্দি হওয়া এই প্রাকৃতিক নিদর্শন এখন থেকে হাওয়াইয়ের উপকূলের একটি হারিয়ে যাওয়া ভূদৃশ্য হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
ট্রাম্প নিজের কল্পনায় জিতেন, বাস্তবতা তৈরি করে ইরান: রেজাই
হুথিদের ওপর ভয়াবহ হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব
'মার্কিন-ইসরায়েল আগ্রাসনে নীরবতা মানেই সহিংসতার সঙ্গে সম্পৃক্ততা'