নোবেল শান্তি পুরস্কারের দৌড়ে কারা এগিয়ে

আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৪৯ পিএম

২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাড়ছে জল্পনা-কল্পনা। যুদ্ধকবলিত অঞ্চলে মানবিক সহায়তা, শিশুদের অধিকার রক্ষা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় ভূমিকা রাখা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় এসেছে। তালিকায় রয়েছেন ইউক্রেনের শিশু অধিকারকর্মী মাইকোলা কুলেবা, আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন, সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষাকারী কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) এবং সুদানের তৃণমূলভিত্তিক জরুরি ত্রাণ নেটওয়ার্ক ‘ইমার্জেন্সি রেসপন্স রুমস’।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (আইএসএস), আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) নামও আলোচনায় রয়েছে। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মধ্যে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি।

তবে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে সংবাদমাধ্যম ও পর্যবেক্ষকদের আলোচনা এবং নোবেল কমিটির আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত এক বিষয় নয়। পুরস্কার ঘোষণার আগে এসব নামকে নিশ্চিত বিজয়ী বা চূড়ান্ত তালিকার সদস্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে আলোচনায় রয়েছেন ইউক্রেনের শিশু অধিকারকর্মী মাইকোলা কুলেবা। রাশিয়া থেকে নিয়ে যাওয়া ইউক্রেনীয় শিশুদের শনাক্ত, উদ্ধার এবং তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টায় তাঁর ভূমিকার কথা উঠে এসেছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া শিশুদের পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলন এবং শিশুদের অধিকার রক্ষার বিষয়টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ ক্ষেত্রে কুলেবার কাজ তাঁকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় এনেছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হচ্ছে।

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেনও আলোচনায় রয়েছে। সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক সংকটে আক্রান্ত শিশুদের সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং জরুরি সহায়তা প্রদানে সংস্থাটির ভূমিকা এ আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।

সুদানের গৃহযুদ্ধের মধ্যে সাধারণ মানুষের কাছে খাবার, পানি, চিকিৎসা ও জরুরি সহায়তা পৌঁছে দিতে কাজ করছে ‘ইমার্জেন্সি রেসপন্স রুমস’ নামের তৃণমূলভিত্তিক নাগরিক নেটওয়ার্ক।

যুদ্ধের কারণে বহু এলাকায় নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা ও ত্রাণ কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে বিপন্ন মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগটি আন্তর্জাতিক মহলে মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।

মানবিক সংকট মোকাবিলা, সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষা এবং বিপর্যস্ত জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ানোর জন্য এই নেটওয়ার্কের নাম সম্ভাব্য নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রার্থীদের আলোচনায় এসেছে।

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা রক্ষায় কাজ করা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টসও (সিপিজে) সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচিত হচ্ছে।

সংঘাতপূর্ণ এলাকায় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের মৃত্যু, আটক, নির্যাতন ও হুমকির ঘটনা বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের কারণ। সাংবাদিকদের ওপর হামলার তদন্ত, দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার দাবি এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করে সিপিজে।

বিশেষ করে গাজায় সাংবাদিকদের প্রাণহানি নিয়ে উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে সাংবাদিকদের সুরক্ষা ও তথ্যপ্রবাহের স্বাধীনতার বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। তবে সাংবাদিকদের মৃত্যুর নির্দিষ্ট সংখ্যা ও কোন অঞ্চলকে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, সে বিষয়ে বছর ও তথ্যসূত্রভেদে পার্থক্য থাকতে পারে।

সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী নাম আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন বা আইএসএস। পৃথিবী থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার উচ্চতায় কক্ষপথে থাকা এই গবেষণাগারে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং আরও কয়েকটি দেশের মহাকাশ গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক উত্তেজনা ও ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানী ও মহাকাশচারীদের যৌথভাবে কাজ করার বিষয়টি আইএসএসকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছে।

নোবেল শান্তি পুরস্কারের সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনা করা পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট অসলোর (পিআরআইও) ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হাকন জারলোর বিশ্লেষণে আইএসএসের মতো উদ্যোগের গুরুত্ব উঠে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতা যখন অনেক ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ ও ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বের চাপে পড়ে, তখন মহাকাশ স্টেশনের যৌথ কার্যক্রম শান্তিপূর্ণ সহযোগিতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) নামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে উঠে এসেছে।

আইসিজে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার আইনি বিরোধ নিষ্পত্তি এবং আন্তর্জাতিক আইনসংক্রান্ত বিষয়ে পরামর্শমূলক মতামত দেওয়ার দায়িত্ব পালন করে। অন্যদিকে, আইসিসি গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও আগ্রাসনের অপরাধের মতো নির্দিষ্ট গুরুতর অপরাধের জন্য ব্যক্তির ফৌজদারি দায় নির্ধারণে কাজ করে।

আন্তর্জাতিক আইন, জবাবদিহি এবং সংঘাতের মধ্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার কারণে এ দুটি প্রতিষ্ঠানের নাম আলোচনায় রয়েছে। তবে তাদের সম্ভাব্য মনোনয়ন বা পুরস্কার পাওয়ার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের তথ্য এখানে উল্লেখ করা হয়নি।

শেষ পর্যন্ত কার হাতে উঠবে পুরস্কার?

নোবেল শান্তি পুরস্কার নিয়ে সম্ভাব্য প্রার্থীদের আলোচনা সাধারণত সংবাদমাধ্যম, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশেষজ্ঞ ও পর্যবেক্ষকদের মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু এসব পূর্বাভাসের সঙ্গে নোবেল কমিটির আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের সরাসরি সম্পর্ক ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

২০২৬ সালের পুরস্কারে শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি, মানবিক সংস্থা, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নাকি বহুপাক্ষিক সহযোগিতার কোনো উদ্যোগ স্বীকৃতি পাবে—তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণার জন্য। যুদ্ধ, মানবাধিকার লঙ্ঘন, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সংকটের প্রেক্ষাপটে এবারের পুরস্কার নিয়ে আগ্রহও তাই বিশেষভাবে লক্ষণীয়। 

সূত্র: টাইম ও এবিসি

এমইউ
আরও পড়ুন