রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি তেল কেনা দেশগুলোর ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের যে হুমকি দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, তা আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। রাশিয়াসংশ্লিষ্ট নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক কার্যকরের ক্ষেত্রে ছাড় দিয়ে নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন তিনি। এতে ভারত ও চীনসহ রাশিয়ার জ্বালানি তেলের বড় ক্রেতা দেশগুলো তাৎক্ষণিকভাবে স্বস্তি পেয়েছে।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাতে প্রকাশিত নির্বাহী আদেশে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘জাতীয় স্বার্থে’ তিনি সংশ্লিষ্ট নিষেধাজ্ঞা, বিধিনিষেধ ও শুল্ক প্রয়োগ থেকে সাময়িক ছাড় দিচ্ছেন। এ বিষয়ে কংগ্রেসকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করার কথাও জানান তিনি।
তবে এই সিদ্ধান্তে শুল্ক আরোপের সম্ভাবনা পুরোপুরি বাতিল হয়নি। বরং আপাতত তা কার্যকর করা স্থগিত রাখা হয়েছে। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি বিবেচনায় ট্রাম্প চাইলে আবারও এসব শুল্ক আরোপ করতে পারবেন।
গত মাসে ট্রাম্প স্বাক্ষর করেছিলেন ‘লিন্ডসে ও গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অব ২০২৬’ নামের আইনে। ইউক্রেনের পক্ষে সোচ্চার মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের নামে আইনটির নামকরণ করা হয়।
আইনটির লক্ষ্য ছিল ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রাশিয়ার অর্থায়নের সক্ষমতা কমানো। এ জন্য রাশিয়ার কর্মকর্তা, ব্যাংক, জ্বালানি খাত এবং মস্কোর সামরিক কার্যক্রমে সহায়তাকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞার সুযোগ রাখা হয়। পাশাপাশি রাশিয়ার তেল-গ্যাস কেনা দেশগুলোর ওপরও শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেওয়া হয় মার্কিন প্রেসিডেন্টকে।
আইন অনুযায়ী, রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের শীর্ষ পাঁচ ক্রেতা দেশ—চীন, ভারত, স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি ও আজারবাইজানের পণ্যে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের সুযোগ ছিল। এ ছাড়া রাশিয়ার জ্বালানি পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রে ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের বিধানও রাখা হয়েছিল।
১৮ অক্টোবর থেকে এসব ব্যবস্থা কার্যকরের সময়সীমা শেষ হওয়ার কথা ছিল। তার আগেই ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশে আপাতত শুল্ক প্রয়োগ স্থগিত হলো।
ভারতের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারত?
ভারতের ওপর নতুন করে ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হলে দেশটির যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারত। তবে নতুন শুল্কের প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করত কোন পণ্যে, কী হারে এবং কীভাবে তা কার্যকর করা হতো তার ওপর।
এর আগে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার কারণে ভারতের পণ্যে অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিলেন ট্রাম্প। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল আরও ২৫ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক। তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার তেল কেনার কারণে আরোপিত অতিরিক্ত শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত বাণিজ্য কাঠামোর আওতায় পারস্পরিক শুল্ক কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নতুন করে ১০০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হলে ভারতের রপ্তানিকারকদের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারত।
ভারতের প্রতিক্রিয়া কী ছিল?
রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞাসংক্রান্ত আইনটি মার্কিন কংগ্রেসে পাস হওয়ার পর ভারত জানিয়েছিল, নিজেদের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিতে তারা প্রস্তুত।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছিল, দেশটির ১৪০ কোটি মানুষের জ্বালানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সরকারের অগ্রাধিকার। সে লক্ষ্য পূরণে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ অব্যাহত রাখা হবে।
মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছিল, রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের তেল কেনার বিষয়টি সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিভিন্ন পর্যায়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় এসেছে। এ বাণিজ্যের সম্ভাব্য প্রভাব শুধু দুই দেশের সম্পর্কের ওপর নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ওপরও পড়তে পারে—এ বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে।
পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের সমঝোতা
রাশিয়ার ওপর শুল্ক স্থগিতের সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এল, যখন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের যোগাযোগ বাড়ছে। একই সময়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সমালোচনা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
গত সপ্তাহে পুতিনের সঙ্গে সমঝোতার কথা জানিয়ে ট্রাম্প বলেছিলেন, রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রে তাৎক্ষণিকভাবে তিন লাখ টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করবে। পরবর্তী কয়েক মাসেও আরও চালান পাঠানোর কথা রয়েছে।
এই সমঝোতার সমালোচনা করে জেলেনস্কি একে অংশীদারদের জন্য ‘অমর্যাদাকর’ ও ‘দুর্বল সিদ্ধান্ত’ বলে মন্তব্য করেন। তাঁর অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমন সমঝোতার পরও রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে, রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে জেলেনস্কির অক্ষমতার অভিযোগ তুলে ট্রাম্প ইউক্রেনের নতুন নেতা নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন।
সব মিলিয়ে, রাশিয়ার জ্বালানি বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য মার্কিন শুল্ক আপাতত স্থগিত হওয়ায় ভারত ও চীন তাৎক্ষণিক স্বস্তি পেলেও ভবিষ্যতে এ নীতি আবার কার্যকর হবে কি না, তা নির্ভর করছে ওয়াশিংটনের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।
সম্পাদনা-সংক্রান্ত সতর্কতা: প্রকাশের আগে মূল প্রতিবেদনে উল্লিখিত আইনটির নাম, লিন্ডসে গ্রাহামের মৃত্যুসংক্রান্ত দাবি এবং ভারতের ওপর আগে আরোপিত শুল্কের হার নির্ভরযোগ্য সূত্রে যাচাই করা উচিত। এসব তথ্যের মধ্যে অসংগতি থাকলে তা সংশোধন করে প্রকাশ করুন।
হুথিদের হামলায় ইরানকে দায়ী করলো সৌদি আরব
দায়িত্ব নেওয়ার পাঁচ দিনের মাথায় ট্রাম্পের প্রেস সচিব বরখাস্ত