সৌদি আরবের খাদ্য নিরাপত্তায় জাজানের কৃষির ভূমিকা

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২২ পিএম

সৌদি আরবের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জাজান প্রদেশ। বৈচিত্র্যময় জলবায়ু, উর্বর সমতলভূমি ও পাহাড়ি কৃষিজমির কারণে অঞ্চলটিতে উৎপাদিত হচ্ছে আম, পেঁপে, কলা, ডুমুরসহ নানা ধরনের ফল। পাশাপাশি উৎপাদিত হচ্ছে জোয়ার, তিল ও বিভিন্ন জাতের সবজি।

বিশ্ব খাদ্য দিবস উপলক্ষে শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) জানায়, জাজানের কৃষি উৎপাদন দেশটির খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা, কৃষিপণ্যের অপচয় কমানো এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পের বিকাশে অবদান রাখছে।

সৌদি আরবের পরিবেশ, পানি ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের জাজান শাখার তথ্য অনুযায়ী, অঞ্চলটিতে প্রায় ১০ লাখ আমগাছ রয়েছে। এসব গাছ থেকে বছরে প্রায় ৬৫ হাজার টন আম উৎপাদিত হয়। এই উৎপাদনকে কেন্দ্র করে মৌসুমি বাণিজ্যের পাশাপাশি ফল বাছাই, হিমাগারে সংরক্ষণ, প্যাকেটজাতকরণ ও জুস তৈরির মতো কার্যক্রমও গড়ে উঠেছে।

পেঁপে ও কলা উৎপাদনেও এগিয়ে

জাজানে প্রায় আট লাখ পেঁপেগাছ রয়েছে। এসব গাছ থেকে বছরে ৪০ হাজার টনের বেশি পেঁপে উৎপাদিত হয়। এ ছাড়া ১০ লাখের বেশি কলাগাছ থেকে বার্ষিক প্রায় ১৫ হাজার টন কলা পাওয়া যায়। অঞ্চলটির ৩৪৬টি খামারে ডুমুরের চাষ হয়। এসব খামারে চার লাখ ৮০ হাজারের বেশি ডুমুরগাছ রয়েছে, যেগুলো থেকে বছরে আনুমানিক ৯ হাজার ৬০০ টন ফল উৎপাদিত হয়।

এছাড়া জাজানে প্রায় ছয় হাজার পেয়ারা গাছ থেকে বছরে ৬০ টন পেয়ারা উৎপাদিত হয়। ১১০টি খামারে চার হাজার ২০০টির বেশি আতা গাছ রয়েছে, যেগুলো থেকে বছরে ৪২ টনের বেশি ফল পাওয়া যায়। কৃষিপণ্যের এই বৈচিত্র্য স্থানীয় বাজারে ফলের সরবরাহ বজায় রাখার পাশাপাশি সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের বিকাশেও সহায়তা করছে।

জোয়ার ও তিলের চাষে গুরুত্ব

ফল উৎপাদনের পাশাপাশি জাজানের কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে মাঠফসলের। অঞ্চলটিতে ৬০ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে জোয়ারের চাষ হয়। বছরে এই ফসলের উৎপাদন ৫৫ হাজার টন ছাড়িয়ে যায়। লাল ও সাদা দুই ধরনের জোয়ারই স্থানীয় খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পাশাপাশি পশুখাদ্য হিসেবেও এর চাহিদা রয়েছে।

তিল চাষেও এগিয়ে রয়েছে অঞ্চলটি। ৬ হাজার ৪০০ হেক্টরের বেশি জমিতে তিল উৎপাদিত হয়। বছরে তিলের বীজের উৎপাদন ৬ হাজার ৪২২ টনের বেশি। রান্নায় ব্যবহার এবং ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে তেল উৎপাদনে এই বীজ গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল হিসেবে কাজে লাগে।

সারা বছর সবজি উৎপাদন

জাজানে টমেটো, শসা, বেগুন, জুকিনি, ঢ্যাঁড়স, মরিচ ও বিভিন্ন শাকজাতীয় সবজি সারা বছর উৎপাদিত হয়। গ্রিন হাউসভিত্তিক চাষ, ফোঁটা ফোঁটা সেচ বা ড্রিপ ইরিগেশন এবং ফসল তোলার পর উন্নত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখা হচ্ছে। পানিসংকটপূর্ণ পরিবেশে কৃষিকাজের ক্ষেত্রে পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার সৌদি আরবের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ড্রিপ ইরিগেশনের মতো পদ্ধতি গাছের গোড়ায় প্রয়োজন অনুযায়ী পানি পৌঁছে দিয়ে অপচয় কমাতে সহায়তা করে।

পাহাড়ি কৃষি ও সৌদি ভিশন ২০৩০

জাজানের উঁচু এলাকায় পাহাড়ের ঢালে তৈরি কৃষি-সোপান পুনর্বাসন এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ প্রকল্পের মাধ্যমে চাষাবাদে সহায়তা করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগ পাহাড়ি জমিতে কৃষি উৎপাদন ধরে রাখার পাশাপাশি মাটির ক্ষয় কমাতেও ভূমিকা রাখে। এ অঞ্চলে কৃষিপণ্য বাছাই কেন্দ্র, হিমাগার ও সমন্বিত পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়নও গুরুত্ব পাচ্ছে। ফসল তোলার পর দ্রুত সংরক্ষণ ও বাজারজাত করা গেলে পচন ও অপচয় কমানো সম্ভব হয়। একই সঙ্গে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেটজাতকরণ এবং পরিবহনকে ঘিরে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসার সুযোগ তৈরি হয়।

সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’-এর অন্যতম লক্ষ্য অর্থনীতির বহুমুখীকরণ ও খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার করা। জাজানের কৃষিতে ফল, শস্য ও সবজির বৈচিত্র্য, পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং সংরক্ষণ অবকাঠামোর সম্প্রসারণ সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সহায়ক হচ্ছে। তবে খাদ্যনিরাপত্তা শুধু উৎপাদন বাড়ানোর ওপর নির্ভর করে না। পানি ও জমির টেকসই ব্যবহার, কৃষিপণ্যের সাশ্রয়ী পরিবহন, বাজারে নিয়মিত সরবরাহ এবং জলবায়ুগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

জেএম
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত