এআই বাণিজ্যে গতি পেলো চীনের অর্থনীতি

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০১:১৯ পিএম

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির বৈশ্বিক চাহিদা এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধির কারণে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। তবে দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারে দুর্বল ভোগব্যয় ও আবাসন খাতের সংকট এখনো অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

চীনের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর—তৃতীয় প্রান্তিকে দেশটির অর্থনীতি ৪ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। আগের প্রান্তিকের তুলনায় প্রবৃদ্ধি বাড়লেও বছরের প্রথম তিন মাসে, অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে মার্চে, অর্জিত ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির চেয়ে তা কম।

সর্বশেষ এই প্রবৃদ্ধি চীনের বার্ষিক ৪ দশমিক ৫ থেকে ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রার নিম্নসীমায় রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থান নীতিনির্ধারকদের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) চীনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরো জানায়, নানা চাপের মধ্যেও দেশটির অর্থনীতিতে স্থিতিশীল অগ্রগতি বজায় রয়েছে। নতুন প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্র তৈরি হওয়া এবং অর্থনৈতিক কাঠামোর উন্নতির ধারাও অব্যাহত রয়েছে বলে সংস্থাটি উল্লেখ করেছে।

রপ্তানি আয় বাড়ায় চীনের অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। গত বছর দেশটির পণ্য ও সেবার বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রেকর্ড ১ লাখ ২০ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছেছিল। অর্থাৎ আমদানির তুলনায় রপ্তানির পরিমাণ বেশি থাকায় যে উদ্বৃত্ত তৈরি হয়, তা এবার গত বছরের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।

তবে অর্থনীতির সব খাতে একই ধরনের উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে চীনের আবাসন খাতে বিনিয়োগ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০ শতাংশের বেশি কমেছে।

অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের গবেষক শিয়ানা ইউয়ের মতে, অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ ও ভোগব্যয় দুর্বল থাকলেও উৎপাদনশিল্প এবং উচ্চপ্রযুক্তিপণ্যের রপ্তানি চীনের প্রবৃদ্ধি বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে।

এআই প্রযুক্তির চাহিদায় বাড়ছে রপ্তানি

সাম্প্রতিক প্রান্তরগুলোতে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে প্রযুক্তিশিল্প। এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণে ব্যবহৃত কম্পিউটার চিপ ও অন্যান্য যন্ত্রাংশের বৈশ্বিক চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় চীনের রপ্তানি আয় বাড়ছে। এতে অভ্যন্তরীণ বাজারের দুর্বলতার প্রভাব কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে আবাসন খাতের মন্দা, মজুরি বৃদ্ধির ধীরগতি এবং তরুণদের মধ্যে উচ্চ বেকারত্বের কারণে চীনের সাধারণ মানুষের ব্যয় করার প্রবণতা কমেছে। ফলে অভ্যন্তরীণ চাহিদার ঘাটতি পূরণে দেশটির ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো রপ্তানির ওপর বেশি নির্ভর করছে।

এদিকে বাণিজ্য নিয়ে অনিশ্চয়তা ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে চীনের ভোক্তাদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। এর ফলে তাঁরা কেনাকাটা ও অন্যান্য খাতে ব্যয় করতে আগ্রহী হচ্ছেন না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

চীনের আবাসন খাতের সংকটও দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। অতিরিক্ত নির্মাণ এবং বেসরকারি আবাসন নির্মাতাদের বিপুল ঋণের কারণে কয়েক বছর ধরে এই খাতে মন্দা চলছে। অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের গবেষক শিয়ানা ইউয়ের মতে, এই পরিস্থিতির দ্রুত অবসানের কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না।

অর্থনীতিকে চাঙা করতে বিভিন্ন উদ্যোগ

অর্থনীতির গতি বাড়াতে গত সেপ্টেম্বরে বেশ কিছু সহায়তা কর্মসূচি ঘোষণা করে বেইজিং। এর মধ্যে কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য সুদের হার কমানো এবং বাড়ি কেনার ক্ষেত্রে ভর্তুকি দেওয়ার মতো পদক্ষেপ রয়েছে।

তবে এসব উদ্যোগের সুফল এখনো স্পষ্ট নয় বলে জানিয়েছেন মুডিস অ্যানালিটিকসের অর্থনীতিবিদ ডেভ চিয়া। তাঁর মতে, চীনের অর্থনীতির সামনে কয়েকটি বড় ঝুঁকি রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে রপ্তানির মতো একটি প্রধান বাহ্যিক চালিকাশক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা।

এদিকে বিপুল পরিমাণে কম দামের চীনা পণ্য বাজারে আসায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা অর্থনীতিগুলোর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। এসব পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর অনেক উৎপাদক চাপের মুখে পড়ছেন।

এআই অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এই খাতে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ভবিষ্যতে প্রত্যাশিত বিপুল মুনাফা অর্জন করতে পারবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

সব মিলিয়ে, এআই প্রযুক্তি ও উচ্চপ্রযুক্তিপণ্যের রপ্তানি চীনের অর্থনীতিকে সাময়িক গতি দিলেও অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয়, আবাসন খাতের মন্দা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য অনিশ্চয়তা দেশটির প্রবৃদ্ধির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

সূত্র: বিবিসি

এমইউ
আরও পড়ুন