যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের অবসান কেন চান গালিবাফপন্থীরা?

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০১ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের অবসানের পথ খোলা রাখতে চান ইরানের রক্ষণশীল রাজনৈতিক শিবিরের একটি অংশ। তবে এ জন্য ওয়াশিংটনের শর্ত মেনে নিয়ে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের সক্ষমতা বিসর্জন দিতে রাজি নন তারা। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এই গোষ্ঠীর অবস্থান হলো, প্রয়োজনে নতুন করে লড়াইয়ের প্রস্তুতি বজায় রেখে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার সুযোগ খোলা রাখা।

ইরানের রক্ষণশীল সংবাদপত্র খোরাসান ও সোবহে নো–তে প্রকাশিত সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে এই অবস্থানের প্রতিফলন দেখা গেছে। তাদের বক্তব্যে একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি গভীর অবিশ্বাস, অন্যদিকে আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ করার সম্ভাবনা- দুটি বিষয়ই গুরুত্ব পেয়েছে। এই অবস্থান ইরানের রক্ষণশীল রাজনীতির অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যও সামনে এনেছে। একাংশ যেখানে ওয়াশিংটনের সঙ্গে যেকোনো ছাড়ের বিরোধিতা করছে, অন্য অংশ সেখানে সামরিক চাপকে আলোচনায় সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে।

গালিবাফ-ঘনিষ্ঠ রক্ষণশীলদের কৌশলগত চিন্তায় হরমুজ প্রণালি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি এই প্রণালি ঘিরে অস্থিরতা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, নৌপরিবহন ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। খোরাসান-এ প্রকাশিত ‘অ্যামবিগুইটি: দ্য নিউ ব্যাটলফিল্ড’ শীর্ষক মন্তব্য-প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কূটনৈতিক যোগাযোগ শুরু হলেই সামরিক হুমকি শেষ হয়ে যায় না। বরং সম্ভাব্য নতুন হামলার আশঙ্কা প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। তাই আলোচনা চললেও সামরিক প্রস্তুতি অব্যাহত রাখার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে।

অন্য একটি বিশ্লেষণ, ‘দ্য পাজল অব ইরানিয়ান অ্যান্ড আমেরিকান রেজিলিয়েন্স’, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সহনশীলতার তুলনা করেছে। এতে ইরানের উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক সংকটের কথা স্বীকার করা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল ঋণ, আর্থিক বাজারের ঝুঁকি, ঋণ গ্রহণের ব্যয় এবং হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থার অর্থনৈতিক প্রভাবকেও সম্ভাব্য দুর্বলতা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে এসব বিশ্লেষণ থেকে প্রমাণিত হয় না যে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি সময় টিকে থাকতে পারবে। হরমুজে বিঘ্ন ঘটলে ইরানের নিজস্ব রপ্তানি, রাজস্ব ও বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে এই কৌশলের কার্যকারিতা নির্ভর করবে প্রতিপক্ষের ওপর চাপের পাশাপাশি ইরান নিজে কতটা অর্থনৈতিক ক্ষতি সামাল দিতে পারে, তার ওপরও।

গালিবাফ-ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে কূটনীতির দরজা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার কথা বলা হয়নি। ‘অ্যামবিগুইটি’ শীর্ষক লেখায় কাতারের মাধ্যমে পাঠানো সাত দিনের একটি প্রস্তাবের উল্লেখ রয়েছে। প্রস্তাবটির নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে সামুদ্রিক চলাচল পুনরায় চালুর সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে সেখানে বলা হয়েছে। তবে প্রস্তাবটির পূর্ণাঙ্গ শর্ত, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক সম্মতি কিংবা বাস্তবায়নের অবস্থা সম্পর্কে এখানে পর্যাপ্ত স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য নেই। তাই এটিকে কার্যকর চুক্তি বা নিশ্চিত যুদ্ধবিরতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির উপদেষ্টা হিসেবে পরিচিত রাজনৈতিক বিশ্লেষক এহসান সালেহিও আলোচনার ফলাফলকে জনসমক্ষে সম্ভাব্য অর্জন হিসেবে উপস্থাপনের পক্ষে মত দিয়েছেন। তার যুক্তি, সমঝোতাকে যদি শুরু থেকেই আত্মসমর্পণ বা বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে চিত্রিত করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। সালেহি প্রমাণ ছাড়া সরকারি কর্মকর্তাদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা দেওয়ারও বিরোধিতা করেছেন। তার মতে, কূটনীতি নিয়ে মতপার্থক্য যেন জাতীয় ঐক্যকে দুর্বল না করে।

ইরানের রক্ষণশীল রাজনীতি একক অবস্থানে নেই। পার্লামেন্ট স্পিকার গালিবাফের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী যেখানে সামরিক চাপ বজায় রেখে সমঝোতার সম্ভাবনা খোলা রাখতে চায়, সেখানে কট্টরপন্থী পায়দারি ফ্রন্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নেতারা সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড় দেওয়ার ব্যাপারে বেশি অনমনীয় অবস্থান নিয়ে থাকেন। কেইহান, জাভান ও তাসনিম-এর মতো সংবাদমাধ্যমে তুলনামূলকভাবে কঠোর অবস্থানের প্রতিফলন দেখা যায়। অন্যদিকে শার্ঘ ও সাজানদেগি’র মতো সংবাদমাধ্যমে কূটনীতির ওপর তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

গালিবাফপন্থীদের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, শুধু সামরিক পদক্ষেপ দিয়ে সব লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়; আলোচনার মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুবিধাও আদায় করা যেতে পারে। তবে সমঝোতার জন্য সামরিক প্রস্তুতি বা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অবিশ্বাস পরিত্যাগ করার প্রয়োজন নেই বলে তারা মনে করে। অন্যদিকে কট্টরপন্থীদের আশঙ্কা, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমঝোতা ইরানের প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল করতে পারে এবং ভবিষ্যতে নতুন হামলার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ফলে বিতর্কটি শুধু যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া বা বন্ধ করার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়; বরং কোন শর্তে যুদ্ধ শেষ হবে, সেটিই মূল বিষয়।

ইরানের পার্লামেন্টে গালিবাফের গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান রয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাসে তিনি ২৩৫ ভোট পেয়ে আবারও স্পিকার নির্বাচিত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালে তিনি ১৯৮ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। এই ফলাফল পার্লামেন্টে তার উল্লেখযোগ্য সমর্থনের ইঙ্গিত দেয়। তবে তার পক্ষে ভোট দেওয়া সব আইনপ্রণেতা পররাষ্ট্রনীতি বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার প্রশ্নে একই মত পোষণ করেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীতে তার অতীতের জ্যেষ্ঠ দায়িত্বও তাকে সামরিক বিষয়ে অভিজ্ঞতা ও যোগাযোগের একটি ভিত্তি দিয়েছে। কিন্তু এ কারণে তিনি সরাসরি সশস্ত্র বাহিনীর ওপর একক নিয়ন্ত্রণ রাখেন, এমনটি বলা ঠিক হবে না। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে প্রেসিডেন্ট, পার্লামেন্ট, সশস্ত্র বাহিনীসহ বিভিন্ন ক্ষমতাকেন্দ্রের প্রতিনিধিরা যুক্ত থাকেন। পরিষদের সিদ্ধান্তে সর্বোচ্চ নেতার অনুমোদন প্রয়োজন। ফলে গালিবাফ আলোচনায় প্রভাব বিস্তার করতে পারলেও তার পছন্দের সমঝোতা সামরিক নেতৃত্ব বা সর্বোচ্চ নেতৃত্ব মেনে নেবে, এ নিশ্চয়তা নেই।

যুদ্ধের সময় জাতীয় সংহতি বজায় রাখা এবং যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা দুটিই ইরানের নেতৃত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সালেহির বক্তব্যে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা বাড়ানো, বৃহত্তর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার মতো বিষয় উঠে এসেছে। গালিবাফ-ঘনিষ্ঠ শিবিরের সামনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হলো- যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো চুক্তিকে প্রতিরোধের পরাজয় নয়, বরং প্রতিরোধের মাধ্যমে অর্জিত ফল হিসেবে উপস্থাপন করা। এতে একদিকে যুদ্ধের অবসান ঘটানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে, অন্যদিকে কট্টরপন্থীদের সমালোচনাও সামাল দিতে হবে।

তবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কী ধরনের ছাড় দিতে পারে, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে কী শর্ত চাইবে এবং হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ ও সামুদ্রিক চলাচলের প্রশ্নে কী অবস্থান নেবে এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর চূড়ান্ত অবস্থান প্রতিষ্ঠিত নয়।

সব মিলিয়ে, গালিবাফ-ঘনিষ্ঠ রক্ষণশীলদের কৌশলকে বলা যায়- যুদ্ধের অবসানের সম্ভাবনা খোলা রাখা, কিন্তু আলোচনার আগে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের হাতিয়ার ত্যাগ না করা। এই কৌশল বাস্তবে সমঝোতায় পৌঁছাবে, না-কি সংঘাত দীর্ঘায়িত করবে, তা নির্ভর করবে ইরানের ক্ষমতাকেন্দ্রগুলোর ঐকমত্য, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং উভয় পক্ষের গ্রহণযোগ্য শর্ত নির্ধারণের ওপর। হরমুজ প্রণালিকে দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ধরে রাখার ইরানি পরিকল্পনা তাই শুধু সামরিক কৌশলের বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও কূটনীতির একটি জটিল সমীকরণ।

জেএম
আরও পড়ুন