মাত্র ৫৬ ডলারের ক্ষতির অপরাধে ইরানে বিক্ষোভকারীর মৃত্যুদণ্ড

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৫ এএম

ইরানে ২০২২ সালের ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলনের সময় গ্রেপ্তার হওয়া এক বিক্ষোভকারীর মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। তার আইনজীবীর দাবি, একটি ছোট বিস্ফোরণের ঘটনায় প্রায় ৫৬ ডলারের সমপরিমাণ সম্পত্তির ক্ষতির অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

বুধবার (২১ অক্টোবর) ইরানি সংবাদমাধ্যম এমতেদাদ এ তথ্য জানিয়েছে। মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা ওই ব্যক্তির নাম মানুচেহর ফাল্লাহ। ৪২ বছর বয়সী এই শ্রমিক ইরানের উত্তরাঞ্চলীয় গিলান প্রদেশের বাসিন্দা। তার বিরুদ্ধে ‘সরকারের বিরোধিতার উদ্দেশ্যে সম্পত্তি ধ্বংসের’ অভিযোগ আনা হয়েছে।

ফাল্লাহর আইনজীবী মিলাদ পানাহিপুরের ভাষ্য অনুযায়ী, গিলান প্রদেশের বিচার বিভাগীয় ভবনের বাইরে রাত আনুমানিক ১টার দিকে একটি ছোট আতশবাজি বা ফায়ারক্র্যাকার বিস্ফোরণের ঘটনায় মামলাটির সূত্রপাত। আইনজীবীর দাবি, ওই ঘটনায় ১৫ কোটি রিয়াল বা প্রায় ৫৬ ডলারের সমপরিমাণ সম্পত্তির ক্ষতি হয়েছিল। এই ক্ষতির অভিযোগকে কেন্দ্র করেই ফাল্লাহর বিরুদ্ধে মামলা হয়। তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও ঘটনার বিবরণ এখানে আইনজীবীর বক্তব্যের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে; স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য হিসেবে তা প্রতিষ্ঠিত নয়।

প্রথমে রাশত শহরের বিপ্লবী আদালতের দ্বিতীয় শাখা ফাল্লাহকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। পরে পুনর্বিচারের আবেদনের পর সেই সাজা বাতিল করা হয়। কিন্তু আদালতের আরেকটি শাখা পুনরায় মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়। সর্বশেষে সুপ্রিম কোর্ট সেই সাজা বহাল রেখেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মামলাটি এখন রাশতের ফৌজদারি দণ্ড কার্যকরের দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। এর অর্থ, দণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার পর্যায়ে মামলাটি পৌঁছেছে। তবে প্রতিবেদনে ফাল্লাহর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নির্দিষ্ট তারিখ জানানো হয়নি।

ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা বাড়ছে বলে উদ্বেগ জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটির ১৬ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৬ সালের জানুয়ারির অভ্যুত্থান-পরবর্তী ঘটনায় অন্তত ৩৪ জনকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে ইরানি কর্তৃপক্ষ। অ্যামনেস্টির ভাষ্য অনুযায়ী, এসব মামলায় বিচারপ্রক্রিয়া ছিল অন্যায্য এবং নির্যাতনের অভিযোগও ছিল।

সংস্থাটি আরও দাবি করেছে, এপ্রিলের পর থেকে অন্তত ২০ জনের মৃত্যুদণ্ড সুপ্রিম কোর্টে বহাল রাখা হয়েছে, যা তাদের দ্রুত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঝুঁকিতে ফেলেছে। অ্যামনেস্টির তথ্য অনুযায়ী, ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ অক্টোবরের মধ্যে অন্তত পাঁচজন বিক্ষোভকারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সংস্থাটি অভিযোগ করেছে, ভিন্নমত দমনে মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার, জোর করে স্বীকারোক্তি আদায় এবং আইনজীবীর কাছে প্রবেশাধিকার সীমিত করার ঘটনা ইরানের বিচারব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করছে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইরানে অন্তত ২ হাজার ১৫৯ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল। সংস্থাটি ২০২৪ সালে যে সংখ্যা নথিভুক্ত করেছিল, তার দ্বিগুণেরও বেশি এটি। এই পরিসংখ্যান মানবাধিকার সংস্থাটির নথিভুক্ত হিসাব; ইরানের সব মৃত্যুদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিসংখ্যানের সঙ্গে এর পার্থক্য থাকতে পারে।

ফাল্লাহর মামলাটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন ইরানের বিচারপ্রক্রিয়া, বিক্ষোভকারীদের প্রতি আচরণ এবং মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে। তার আইনজীবীর বর্ণনা অনুযায়ী, সীমিত সম্পত্তির ক্ষতির অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকার বিষয়টি মামলাটিকে আরও বিতর্কিত করে তুলেছে।

জেএম
আরও পড়ুন