ট্রাম্পের চোখে অর্থনৈতিক লাভ, পুতিনের চোখে রাশিয়ার জয়

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৪৮ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেখানে রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতা করে ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান এবং বিপুল অর্থনৈতিক লাভের সম্ভাবনা দেখছেন, সেখানে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দেখছেন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নিজের কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের সুযোগ। ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধ বন্ধে একের পর এক উদ্যোগ নিলেও ইউক্রেনে নিজেদের ঘোষিত লক্ষ্য থেকে সরে আসার কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছে না মস্কো। ফলে ওয়াশিংটন যে সমঝোতাকে যুদ্ধ অবসানের পথ হিসেবে বিবেচনা করছে, ক্রেমলিন সেটিকেই রাশিয়ার স্বার্থ এগিয়ে নেওয়ার সাফল্য হিসেবে দেখছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান বৈশ্বিক বিষয়ক সংবাদদাতা ম্যাথিউ চান্সের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গিতে ইউক্রেন যুদ্ধের দ্রুত অবসান একটি সহজ সিদ্ধান্ত। তার হিসাবে, চলমান সংঘাত থামলে প্রতি মাসে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ হারানো হাজারো তরুণের মৃত্যু বন্ধ হবে। একই সঙ্গে রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং দুই দেশের মধ্যে লাভজনক বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলার পথও খুলে যাবে। অর্থাৎ, শান্তি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জনও ট্রাম্পের হিসাবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কিন্তু সমস্যাটি হলো, ট্রাম্প রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট নন। দেশটির নেতৃত্বে রয়েছেন পুতিন, যিনি রাশিয়ার যুদ্ধের লক্ষ্যগুলো নিয়ে আপস করতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে না। রুশ ও ইউক্রেনীয়দের প্রাণহানি বন্ধ করা কিংবা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মাধ্যমে বিপুল অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনাও তাকে নিজের অবস্থান থেকে সরাতে পারছে না। ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টা বারবার ব্যর্থ হওয়ার পেছনে এই মৌলিক ভুল বোঝাবুঝি কাজ করছে বলে মনে করেন চান্স।

সম্প্রতি রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকেও বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। ট্রাম্পের ব্যবসায়িক পরিচিতি থেকে আলোচক হয়ে ওঠা উইটকফের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকে পুতিন আগের দিন নরওয়েতে অনুষ্ঠিত আলোচনার ফলাফল সম্পর্কে জানতে চান। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও ন্যাটোর কর্মকর্তারা ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে সম্ভাব্য নতুন শান্তি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। এসব প্রস্তাবে মস্কোর জন্য অর্থনৈতিক প্রণোদনার বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

বৈঠকের পর ক্রেমলিনের এক শীর্ষ সহযোগী নিশ্চিত করেন, উইটকফ রুশ প্রেসিডেন্টকে নরওয়ের আলোচনার বিষয়ে অবহিত করেছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, ইউক্রেন সংকট সমাধানের ক্ষেত্রে ওই আলোচনায় প্রকৃত মূল্যসম্পন্ন বিষয় খুব কমই ছিল। চান্সের বিশ্লেষণে, ক্রেমলিনের এমন প্রতিক্রিয়া ছিল প্রত্যাশিত। কারণ, পূর্ব ইউক্রেনের পুরো দনবাস অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং কিয়েভের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর প্রভাব বিস্তারের দাবিসহ কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসার কোনো লক্ষণ দেখায়নি রাশিয়া।

তবু হোয়াইট হাউস হয়তো আশা করেছিল, মস্কো এবার আপসের বিষয়ে কিছুটা বেশি আগ্রহ দেখাবে। বিশেষ করে গত সপ্তাহে ট্রাম্প রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার পর এমন প্রত্যাশা তৈরি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম কমানোর রাজনৈতিক হিসাব থেকে নেওয়া ওই সিদ্ধান্ত রাশিয়ার জন্যও বড় অর্থনৈতিক সুবিধা তৈরি করেছে।

এরপর ট্রাম্প একটি জ্বালানি যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। তবে উদ্যোগটি সফল হয়নি। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে ইউক্রেনকে রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে ক্ষতিকর ড্রোন হামলা বন্ধ করতে হতো। এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানও প্রভাবিত হয়। একই সময়ে ট্রাম্প ইউক্রেনের নেতৃত্বে পরিবর্তনের আহ্বান জানান।

চান্সের মতে, এসব ঘটনাই ক্রেমলিনের কাছে ইতিবাচক বার্তা হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে। ওয়াশিংটন যে পদক্ষেপগুলোকে সমঝোতার পথ প্রশস্ত করার উদ্যোগ হিসেবে দেখছে, মস্কো সেগুলোকে নিজেদের কৌশল কার্যকর হওয়ার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়ানো, অর্থনৈতিক প্রণোদনা দেওয়া কিংবা কিয়েভের নেতৃত্ব নিয়ে ট্রাম্পের অসন্তোষ, কোনোটিই পুতিনকে যুদ্ধের লক্ষ্য থেকে সরে আসতে উৎসাহিত করছে না। বরং এসবের মধ্য দিয়ে তিনি নিজের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার সুযোগ দেখছেন।

বিশ্লেষকের মতে, ট্রাম্পকে কোন বিষয়গুলো আকৃষ্ট করে, তা বুঝতে পেরেছেন পুতিন। বিপুল অর্থনৈতিক চুক্তির সম্ভাবনা সামনে রেখে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে আলোচনায় ধরে রাখতে পারছেন। সেন্ট পিটার্সবার্গের বৈঠকেও পুতিন রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ সার রপ্তানি বাড়ানোর সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন।

বৈঠক শেষে রাশিয়ার সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের প্রধান এবং ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি কিরিল দিমিত্রিয়েভ জানান, দুই পক্ষের মধ্যে তথ্যকেন্দ্র, জ্বালানি খাত এবং জ্বালানি সহযোগিতাসহ বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তিন ঘণ্টার ওই বৈঠকে এসব অর্থনৈতিক উদ্যোগের প্রসঙ্গ সামনে আনা হয়। চান্সের বিশ্লেষণে, এ ধরনের প্রস্তাবের উদ্দেশ্য শুধু বাণিজ্য বাড়ানো নয়; বরং ট্রাম্পের মনোযোগ ধরে রাখা এবং ওয়াশিংটনে রাশিয়ার প্রতি সহানুভূতিশীল মনোভাবকে কাজে লাগানোও এর অংশ।

পুতিনের এই কৌশলে অর্থনৈতিক প্রস্তাবের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও মানবিক পদক্ষেপও ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন চান্স। সেন্ট পিটার্সবার্গের বৈঠকের আগে রাশিয়া ৭৪ বছর বয়সী মার্কিন নাগরিক স্টিফেন হাবার্ডকে মুক্তি দেয়। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর সময় তিনি দেশটিতে আটক হয়েছিলেন। ভাড়াটে যোদ্ধা-সংক্রান্ত অভিযোগে দণ্ডিত হওয়ার পর তিনি রাশিয়ার কারাগারে ছিলেন।

মিশিগানের বাসিন্দা সাবেক শিক্ষক হাবার্ড রাশিয়ার একটি প্রত্যন্ত দণ্ডশিবিরে বন্দি থাকার সময় গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তার মুক্তিকে উইটকফ মানবিক পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেন। হোয়াইট হাউসও ঘটনাটিকে ট্রাম্পের সমঝোতা করার দক্ষতা এবং পুতিনের তার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের নিদর্শন হিসেবে তুলে ধরে।

ট্রাম্পের নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতি সম্মান দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে এর বিনিময়ে কিছুই দিতে হয়নি, রাশিয়ার ক্ষেত্রে যা নজিরবিহীন। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে হাবার্ডের মুক্তিকে ট্রাম্প প্রশাসন নিজেদের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করে।

তবে চান্সের বিশ্লেষণ বলছে, পুতিন ঘটনাটিকে একইভাবে দেখছেন, এমনটা ধরে নেওয়ার কারণ নেই। বরং ইউক্রেনে আটক হওয়ার পর দীর্ঘদিন রুশ হেফাজতে থাকা ৭৪ বছর বয়সী এক মার্কিন নাগরিকের মুক্তির বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বড় ধরনের রাজনৈতিক স্বীকৃতি আদায় করতে পেরেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট। বিশ্লেষকের ধারণা, হাবার্ডকে এমন একটি মুহূর্তের জন্য দর-কষাকষির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।

চান্সের মূল্যায়নে, এই মুক্তির ঘটনাকে ট্রাম্প প্রশাসন নিজেদের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে প্রচার করলেও এর রাজনৈতিক মূল্য রাশিয়ার পক্ষেই যেতে পারে। একদিকে পুতিন মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে নিজের পদক্ষেপের জন্য কার্যত প্রশংসা ও স্বীকৃতি পেয়েছেন, অন্যদিকে ইউক্রেনের কাছে ওয়াশিংটনের এমন অবস্থান বিশ্বাসঘাতকতার মতো মনে হতে পারে।

সব মিলিয়ে, ট্রাম্প ও পুতিনের মধ্যে আলোচনার মূল পার্থক্যটি এখানেই। ট্রাম্প যেখানে অর্থনৈতিক সুবিধা ও সমঝোতার মাধ্যমে যুদ্ধ থামানোর সম্ভাবনা দেখছেন, পুতিন সেখানে রাশিয়ার সামরিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের সুযোগ খুঁজছেন। চান্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মস্কো এখন পর্যন্ত নিজের অবস্থান বদলানোর চেয়ে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে সুবিধা আদায়েই বেশি সফল হচ্ছে। ফলে যে আলোচনা ট্রাম্পের কাছে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির পথ, পুতিনের কাছে তা রাশিয়ার কৌশলগত জয়ের আরেকটি ধাপ হয়ে উঠছে। সূত্র: সিএনএন

এএস
আরও পড়ুন