নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জীবন কী এখানেই শেষ?

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২৩ এএম

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আবারও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। ৭ অক্টোবরের হামলা, গাজা ও লেবাননে যুদ্ধ, ইরানের সঙ্গে সংঘাত এবং ডানপন্থি ও কট্টর ইহুদি ধর্মীয় দলগুলোর সঙ্গে সরকার পরিচালনা—সব মিলিয়ে নির্বাচনকে নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব ও ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথের পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জনসমর্থন কমে যাওয়ায় এবারের নির্বাচনে সরকার গঠন করতে সমস্যায় পড়তে পারেন নেতানিয়াহু। তবে দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের রাজনীতিতে প্রভাব ধরে রাখা এই নেতাকে এখনই রাজনৈতিকভাবে শেষ বলে মনে করছেন না তাঁরা। বিরোধী দলগুলোর দুর্বলতা এবং ডানপন্থি রাজনৈতিক শক্তির অবস্থান তাঁর ক্ষমতায় থাকার সম্ভাবনা ধরে রেখেছে।

ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক ও জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গিডিয়ন রাহাতের মতে, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক শক্তির পেছনে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে। প্রথমত, অতি-গোঁড়া ইহুদি ধর্মীয় গোষ্ঠী, যাদের অনেকেই সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক দায়িত্ব পালন থেকে অব্যাহতি পেয়ে থাকেন। দ্বিতীয়ত, কট্টর ডানপন্থিরা, যাদের বসতি সম্প্রসারণ ও পশ্চিম তীরের ওপর কার্যত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মতো রাজনৈতিক লক্ষ্য নেতানিয়াহুর সরকারের সময়ে এগিয়েছে। তৃতীয়ত, নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত অনুসারীরা।

রাহাতের ভাষ্য, নেতানিয়াহু নিজের সমর্থকদের মধ্যে এমন ধারণা প্রতিষ্ঠা করেছেন যে ইসরায়েল পরিচালনার জন্য তিনিই একমাত্র উপযুক্ত ব্যক্তি। তাঁর মতে, নেতানিয়াহু নিজেকে রাষ্ট্রের সঙ্গে একাকার করে দেখেন এবং তাঁর সমর্থকদের মধ্যেও সেই ধারণা তৈরি করেছেন।

রাহাত আরও বলেন, ইসরায়েলের রাজনীতিতে পরিচয়ভিত্তিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সামরিক ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রত্যাশিত প্রভাব ফেলেনি। তাঁর সমর্থকদের একটি অংশ মনে করে, দেশটির রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি অংশ নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে কাজ করছে এবং ৭ অক্টোবরের হামলার মতো ব্যর্থতার দায়ও তাঁর ওপর চাপানো উচিত নয়।

তবে গত চার বছরে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকারের বিভিন্ন নীতি নিয়ে অসন্তোষ বেড়েছে। তেল আবিবের কাছাকাছি অবস্থিত বার-ইলান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক জোনাথন রিনহোল্ড বলেন, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে কট্টর ডানপন্থি ও ধর্মীয় জোটের নীতির কারণে অনেক ইসরায়েলি মনে করছেন, একই ধরনের সরকার আবার ক্ষমতায় এলে তাঁদের দেশ ছাড়ার বিষয়টিও বিবেচনা করতে হতে পারে।

রিনহোল্ডের মতে, সরকারের বিচার বিভাগ সংস্কারের উদ্যোগ গণতন্ত্রের জন্য হুমকি বলে মনে করেন অনেকে। একই সঙ্গে সামরিক বাহিনীতে জনবলের সংকট থাকলেও অতি-গোঁড়া ইহুদি সম্প্রদায়ের সদস্যদের বাধ্যতামূলক সামরিক দায়িত্বে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি অমীমাংসিত রয়েছে। এ ছাড়া সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দুই মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোত্রিচের মতো কট্টর ডানপন্থি নেতাদের প্রভাবও বেড়েছে।

এসব কারণে নেতানিয়াহু আবার প্রধানমন্ত্রী হলে দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজন আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সমালোচকেরা। তবে এই অসন্তোষ তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য যথেষ্ট হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জীবনে সংকট নতুন নয়। ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী থাকার পর তিনি নির্বাচনে ক্ষমতা হারান। পরে আবার রাজনীতিতে ফিরে আসেন। ২০১৯ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সরকার ধরে রাখতে তাঁকে চার দফা নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হয়। ২০২১ সালে নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের নেতৃত্বে গঠিত জোট তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়। তবে পরবর্তী সময়ে আবারও প্রধানমন্ত্রী হন তিনি।

এবারের নির্বাচনে তাঁর জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করেছে কয়েক বছর ধরে চলা দুর্নীতির বিচার এবং রাজনৈতিক জীবনে জড়িয়ে পড়া বিভিন্ন বিতর্ক। নিরাপত্তা ও কূটনীতিতে নিজের দক্ষতার কথা তুলে ধরলেও গাজা, লেবানন ও ইরানকে ঘিরে সংঘাতের ফল, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ নীতি নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছেন তিনি।

আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার আশঙ্কার প্রসঙ্গও সামনে এসেছে। সম্প্রতি অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় বিকল্প বা ছায়া ক্রিপ্টো অর্থনীতি গড়ে তোলার কথা বলেছেন নেতানিয়াহু বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি তাঁর সরকারের নীতিতে জোটের শরিকেরা বেশি সুবিধা পেয়েছেন, আর সমাজের অন্য অংশগুলো তুলনামূলকভাবে বঞ্চিত হয়েছে—এমন অভিযোগও রয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থনও নেতানিয়াহুর নির্বাচনী পরিস্থিতি বদলে দিতে পারছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ১৮ অক্টোবর ট্রাম্পের সমর্থন ঘোষণার পর ইসরায়েলের চ্যানেল ১২ নিউজের একটি জরিপে দেখা যায়, ৬৪ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, ট্রাম্পের ঘোষণায় তাঁদের ভোটের সিদ্ধান্তে কোনো প্রভাব পড়বে না। ১৭ শতাংশ বলেছেন, এতে নেতানিয়াহুকে সমর্থন করার সম্ভাবনা তাঁদের কমেছে। আর প্রায় ১২ শতাংশ জানিয়েছেন, ট্রাম্পের ঘোষণায় লিকুদ পার্টিকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত আরও দৃঢ় হয়েছে।

একই জরিপে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নেতানিয়াহুর চেয়ে বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোটকে এগিয়ে রাখা হয়। আইজেনকোটের পক্ষে সমর্থন ছিল ৪৫ শতাংশ, আর নেতানিয়াহুর পক্ষে ৩৩ শতাংশ। জরিপের পূর্বাভাস অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি বিদায়ী নেসেটে থাকা ৩২টি আসনের বিপরীতে ২১টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে আইজেনকোটের ইয়াশার পার্টি ২৪টি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা দেখিয়েছে জরিপটি।

তবে নির্বাচনের ফল নির্ধারণে আইজেনকোট ও বিরোধী দলগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে মনে করছেন তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও বারাক লিডারশিপ সেন্টারের প্রধান উদি সোমার। তাঁর মতে, ৭ অক্টোবরের হামলার আগে ও পরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবিলায় নেতানিয়াহুর ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও বিরোধী দলগুলোও সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।

সোমারের মতে, বিরোধী নেতা ইয়ার লাপিদও রাজনৈতিকভাবে কার্যকর অবস্থান ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন। একসময় তাঁর দলের নেসেটে ২৪ জন সদস্য থাকলেও ভবিষ্যতে সেই সংখ্যা কমে মাত্র দুটিতে নেমে আসতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সোমার বলেন, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট আসন হারাতে পারে। তবে ইসরায়েলের রাজনীতি ডানদিকে ঝুঁকে পড়া এবং বিরোধী দলগুলোর দুর্বল অবস্থানের কারণে নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। ভোটারদের মধ্যে তাঁর প্রতি অসন্তোষ স্পষ্ট হলেও বিরোধীরা সেই অসন্তোষকে রাজনৈতিক সাফল্যে রূপ দিতে পারেনি।

নির্বাচনের আগে প্রকাশিত কোনো চূড়ান্ত জরিপেই নেতানিয়াহু বা বিরোধী জোটের জন্য সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতার নিশ্চয়তা দেখা যায়নি। এ কারণে বিশ্লেষকেরা নির্বাচনের ফল নিয়ে নিশ্চিত পূর্বাভাস দিতে রাজি নন।

সম্ভাব্য পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ও আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বৃহত্তম বিরোধী দলের মধ্যে মধ্যপন্থি জোট গঠন কিংবা ২০২৭ সালের শুরুর দিকে আবারও নির্বাচন। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকার সুযোগ পেতে পারেন। সে ক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে নিজের দীর্ঘদিনের ক্ষমতা ধরে রাখার ইতিহাস আরও দীর্ঘ করার সুযোগও তাঁর সামনে থাকবে।

সূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল

ওয়াইএ
আরও পড়ুন