নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ ফাঁকি দিয়ে ইরানের অস্ত্র আমদানি

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:১৬ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধের মধ্যেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আমদানি অব্যাহত রেখেছে ইরান। সামরিক সরঞ্জাম, বিস্ফোরক এবং ভারী ট্রাক আমদানিতে দেশটি পাঁচ হাজারের বেশি সংস্থার একটি গোপন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছে বলে রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ইরান অন্তত ২০০ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম, বিস্ফোরক ও ভারী ট্রাক আমদানি করেছে। এসব আমদানির ক্ষেত্রে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও মার্কিন নৌ অবরোধ এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে বলে অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে।

পাঁচ হাজার সংস্থার জটিল নেটওয়ার্ক

রয়টার্সের অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার নামের শুরুতে ‘MOD’ ব্যবহৃত হয়। এমন পাঁচ হাজারের বেশি সংস্থা দেশটির সামরিক ও আর্থিক সরবরাহব্যবস্থার অংশ হিসেবে কাজ করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০১৬ সাল থেকে এসব সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের চিহ্ন বিভিন্ন পণ্য পরিবহনের নথি ও শিপিং-সংক্রান্ত তথ্যে পাওয়া গেছে। কিছু সংস্থার সঙ্গে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং ইরানের প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণাধীন ‘বোনিয়াদ’ নামে পরিচিত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আমদানি, অর্থ পরিশোধ এবং পণ্য পরিবহনের বিভিন্ন ধাপ পরিচালিত হওয়ায় সরবরাহব্যবস্থার প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের জন্য ভারী ট্রাক

প্রতিবেদনে ইভেকো (Iveco) ব্র্যান্ডের ভারী ট্রাক আমদানির বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ৫ মার্চ প্রকাশিত একটি ভিডিওতে ইরানের একটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণযানে হামলার দাবি করেছিল। যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান জেনস (Janes) যানটিকে ইভেকো হিসেবে শনাক্ত করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

রয়টার্সের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ইরানের সামরিক বাহিনী গোপন সংস্থাগুলোর মাধ্যমে শত শত ভারী ইভেকো ট্রাক আমদানি করেছে। এসব যান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কর্মসূচির সরবরাহব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ভারী ট্রাক সামরিক সরঞ্জাম পরিবহন, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণব্যবস্থা বহন এবং বিভিন্ন সামরিক স্থাপনার মধ্যে সরঞ্জাম স্থানান্তরে ব্যবহার করা যায়। তবে নির্দিষ্ট কোনো ট্রাকের প্রকৃত ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট যান ও সামরিক ইউনিটের তথ্য আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

যুদ্ধের মধ্যেও সরবরাহ অব্যাহত

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ চলাকালেও স্থলপথ, সমুদ্রপথ ও আকাশপথে ইরানে বিভিন্ন সরঞ্জাম পৌঁছেছে। এর মধ্যে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ, বিস্ফোরক এবং ভারী যানবাহন রয়েছে বলে অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে। এতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে- হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারের পরও ইরান কীভাবে তার সামরিক মজুত পুনরায় পূরণ করছে?

রয়টার্সের অনুসন্ধান বলছে, ইরানের বিস্তৃত সামরিক-আর্থিক নেটওয়ার্ক এই সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। তবে আমদানির মোট মূল্য, প্রতিটি চালানের প্রকৃত গন্তব্য এবং সরঞ্জামগুলোর সামরিক ব্যবহারের পরিমাণ সম্পর্কে সব তথ্য প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।

নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন

ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে। এসব নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য দেশটির সামরিক সক্ষমতা এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কর্মসূচিতে প্রয়োজনীয় অর্থ ও সরঞ্জামের প্রবাহ সীমিত করা। কিন্তু একাধিক সংস্থা, জটিল আর্থিক লেনদেন এবং আন্তর্জাতিক পরিবহন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আমদানি অব্যাহত থাকলে নিষেধাজ্ঞার প্রয়োগ ও নজরদারি কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

রয়টার্সের অনুসন্ধান ইঙ্গিত দিচ্ছে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা বোঝার ক্ষেত্রে শুধু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের উৎপাদনকেন্দ্র দেখলেই হবে না; এর পেছনে থাকা অর্থায়ন, আমদানি, পরিবহন এবং ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কও বিবেচনায় নিতে হবে।

জেএম
আরও পড়ুন