১৯৫৩ সালের আগস্ট মাসে, তেল শিল্প জাতীয়করণের ফলে যেসব ঔপনিবেশিক শক্তির স্বার্থ হুমকির মুখে পড়েছিল, তারাই ইরানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেকের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্র করে, যাতে তেল সমৃদ্ধ দেশটির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের পুতুল সরকারের হাতে তুলে দেওয়া যায়।
ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে দশকের পর দশক ধরে চলে আসা বৈরিতার শিকড় খুঁজতে গেলে বেশ কয়েকটি ষড়যন্ত্রের কথা সামনে আসে, যেগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো ঔপনিবেশিক শক্তির প্রতি ইরানিদের মনে গভীর অবিশ্বাস তৈরি করেছে।
আজ থেকে ৬৮ বছর আগে এই সময়েই মার্কিন ও ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা ইরানে এমন এক অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল, যা পশ্চিম এশিয়ার (মধ্যপ্রাচ্য) রাজনৈতিক সমীকরণ চিরতরে বদলে দেয় বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক। ইরানে এটি পরিচিত ‘২৮ মোরদাদ অভ্যুত্থান’ নামে। ১৯৫৩ সালের ১৯ আগস্ট গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির রাজতান্ত্রিক শাসন সুসংহত করা হয় এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে।
যুক্তরাষ্ট্র সে সময় ইরানের বৈধ সরকার উৎখাত করে একনায়কতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠা করে, যার সুযোগে সেই একনায়ক ইরানি জনগণের ওপর নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালান বলে অভিযোগ রয়েছে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সম্পদ লুণ্ঠন করে শত শত বিলিয়ন ডলার আয় করে বলে দাবি করা হয়। ১৯৫৩ সালের এই অভ্যুত্থান, ১৯৭৯ সালে মার্কিন-সমর্থিত পাহলভি রাজতন্ত্রের পতন এবং একই বছর ইমাম খোমেনির অনুসারী মুসলিম শিক্ষার্থীদের মার্কিন দূতাবাস দখল, এসব ঘটনা ইরানের আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
তেল জাতীয়করণই কি অভ্যুত্থানের মূল কারণ
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ১৯৫১ সালে মোসাদ্দেকের উত্থাপিত এক বিলের মাধ্যমে ইরানের তেল শিল্প জাতীয়করণই ছিল যুক্তরাষ্ট্র-পরিকল্পিত এই অভ্যুত্থানের মূল কারণ। মোহাম্মদ মোসাদ্দেক ছিলেন ইরানের জনপ্রিয় রাজনীতিক, যিনি ১৯৫১ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত দেশটির ৩৫তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের পরিকল্পনায় সংঘটিত ১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থানে তার সরকারের পতন ঘটে।
লেখক, প্রশাসক, আইনজীবী ও সংসদ সদস্য হিসেবে পরিচিত মোসাদ্দেকের শাসনামলে সামাজিক নিরাপত্তা, ভূমি সংস্কার এবং জমির ভাড়ার ওপর কর আরোপসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক-রাজনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তবে তার সরকারের সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্ত ছিল ইরানের তেল শিল্প জাতীয়করণ, যা সরাসরি আঘাত হানে ইরানে কার্যরত ব্রিটিশ তেল কোম্পানিগুলোর স্বার্থে। এই পদক্ষেপের কারণে তিনি ইরানের পশ্চিমাপন্থী অভিজাত শ্রেণি এবং শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন।
প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেক ও আয়াতুল্লাহ কাশানি ছিলেন তেল জাতীয়করণ আন্দোলনের প্রধান দুই কারিগর। ১৯৫১ সালের শেষদিকে ইরানের পার্লামেন্ট প্রায় সর্বসম্মতিক্রমে তেল জাতীয়করণ চুক্তি অনুমোদন করে। এই সিদ্ধান্ত এবং আয়াতুল্লাহ কাশানির সমর্থন মোসাদ্দেককে রাতারাতি লাখো ইরানির কাছে জাতীয় বীরে পরিণত করে, আর ইরান তখন বিশ্ব মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। বহু ইরানি মনে করেছিলেন, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রথমবারের মতো তারা নিজেদের দেশের নিয়ন্ত্রণ নিজেরাই নিতে যাচ্ছেন, আর জাতীয়করণের ফলে দেশজুড়ে সম্পদের প্রাচুর্য আসবে বলেই ছিল তাদের প্রত্যাশা।
মোসাদ্দেকের এই পদক্ষেপের মুখে যুক্তরাজ্য নতুন ইরান সরকারের সঙ্গে মুখোমুখি হয়, যেখানে সংসদ ও জনগণের জোরালো সমর্থন নিয়ে মোসাদ্দেক আরও সুবিধাজনক ছাড় দাবি করেন-যা ব্রিটেন কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে।
যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের ষড়যন্ত্র
ইতিহাস সাক্ষী, ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো সব সময়ই অন্য দেশের সম্পদ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে, আর এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যও ব্যতিক্রম নয়। মোসাদ্দেকের তেল জাতীয়করণ সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেনি লন্ডন, আর তাই দুই বছর পর ১৯৫৩ সালে আমেরিকার সহযোগিতায় গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত মোসাদ্দেক সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের মঞ্চ প্রস্তুত করা হয়।
ইরানের তৎকালীন শাসকের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সিআইএ ও ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ্দেকের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র সাজাতে শুরু করে। তেহরানে দাঙ্গা উসকে দেওয়ার মতো ভয়ংকর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে এই গোয়েন্দা সংস্থাগুলো, যার শেষ পরিণতি ছিল মোসাদ্দেকের গ্রেপ্তার।
২০১৩ সালের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এই অভ্যুত্থানে নিজেদের ভূমিকা স্বীকার করে নেয়। এ সময় প্রকাশিত বিপুল পরিমাণ গোপন নথিতে দেখা যায়, অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন-দুটোই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে, যার মধ্যে ছিল ইরানের রাজনীতিক, নিরাপত্তা কর্মকর্তা এবং সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ঘুষ দেওয়া এবং পক্ষে প্রচারণা চালানোর মতো কর্মকাণ্ড। প্রকাশিত নথিতে সিআইএ নিজেই স্বীকার করে, এই অভ্যুত্থান পরিচালিত হয়েছিল ‘সিআইএ-র সরাসরি নির্দেশনায়’ এবং এটি ছিল ‘সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পরিকল্পিত ও অনুমোদিত মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অংশ’।
গোপন নথি অনুযায়ী, ১৯ আগস্ট তেহরানে দাঙ্গা সৃষ্টির জন্য শহরের সবচেয়ে ভয়ংকর অপরাধী চক্রগুলোকে ভাড়া করেছিল সিআইএ। সিআইএর অর্থে ভাড়া করা লোকজনকে বাস ও ট্রাকে করে তেহরানে আনা হয় এবং তারা শহরের রাস্তা দখলে নেয়।
তেল সমৃদ্ধ ইরানে বসানো হয় পুতুল শাসক
১৯৫৩ সালের ১৯ আগস্ট সিআইএ ও ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার অর্থায়ন ও পরিকল্পনায় সংগঠিত রাজপথের বিক্ষোভের ছত্রছায়ায় সেনাবাহিনী মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করে, যাতে তেল সমৃদ্ধ দেশটির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের পছন্দের পুতুল শাসকের হাতে তুলে দেওয়া যায়। শাহপন্থী শক্তি ও বিশেষ করে ইরানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে সিআইএ প্রলোভন, হুমকি ও ঘুষের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করে মোসাদ্দেকবিরোধী অভ্যুত্থানকে সফল করে তোলে।
এই মার্কিন-ব্রিটিশ সমর্থিত সামরিক অভ্যুত্থানে শত শত ইরানি নিহত হন। মোসাদ্দেককে গ্রেপ্তার করে শাহের সামরিক আদালতে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে বিচার করা হয়। ১৯৫৩ সালের ২১ ডিসেম্বর তাকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়, আর এরপর বাকি জীবন তিনি গৃহবন্দি অবস্থায় কাটান।
মার্কিন সহায়তার প্রতিদান হিসেবে শাহ মোহাম্মদ রেজা ইরানের প্রায় ৪০ শতাংশ তেলক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ তুলে দেন মার্কিন কোম্পানিগুলোর হাতে। অভ্যুত্থানের পর শাহ পরবর্তী ২৬ বছর রাজতান্ত্রিক শাসন চালিয়ে যান, যতদিন না ইসলামি বিপ্লবে তার পতন ঘটে।
অভ্যুত্থান-উত্তর ইরান
১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থানের পর জেনারেল ফজলুল্লাহ জাহেদির নেতৃত্বে গঠিত হয় নতুন সরকার, যার হাত ধরে ইরানের সর্বশেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি আরও দৃঢ়ভাবে রাজতান্ত্রিক ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ পান। ক্ষমতায় টিকে থাকতে তিনি প্রবলভাবে নির্ভর করেন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের ওপর। এর পর থেকে ১৯৫০, ৬০ ও ৭০-এর দশক জুড়ে শীতল যুদ্ধের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মিত্র হিসেবে শাহের প্রতি অবিরাম অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা পাঠাতে থাকে যুক্তরাষ্ট্র।
১৯৭৮ সালের জানুয়ারি থেকে ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ইসলামি বিপ্লবের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইরানি জনগণ পশ্চিমা-সমর্থিত ধর্মনিরপেক্ষ শাহি শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠেন, যে শাসনামলে ইরানি জাতিকে বহু দুর্ভোগ ও নিপীড়নের মুখে পড়তে হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ১৯৭৯ সালের শুরুতে দেশজুড়ে বিশাল বিক্ষোভ ও জনঅসন্তোষ চরমে পৌঁছালে ১৬ জানুয়ারি ইরানের শাহ ও তার পরিবার চিরতরে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান।
তুরস্কের সেনা মোতায়েন থামাতে সিরিয়ায় ইসরায়েলি হামলা
ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ নেই: গালিবাফ
ইউরোপে ইরানের হামলার শঙ্কায় প্রস্তুত ন্যাটো
মিষ্টি আঙুরে তিক্ততা: পাকিস্তানের সিদ্ধান্তে দিশেহারা কান্দাহার!
পারস্য উপসাগরে ‘পোস্ট-আমেরিকান অর্ডার’-এ স্বাগতম: রেজাই
প্রিন্সেস ডায়ানার ‘সত্য’ জানাতে ভাইয়ের নতুন বই