‘সৌদিরা ভেবেছিল আল-মাখা রক্ষা করবে যুক্তরাষ্ট্র’

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০৫ এএম

ইয়েমেনে হুথিদের দ্রুত অগ্রযাত্রার পেছনে সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মন্তব্য করেছেন আমেরিকান ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক উইলিয়াম লরেন্স। তাঁর দাবি, সৌদি আরব মনে করেছিল আল-মাখা (মোকা) এলাকা রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে আসবে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও ধরে নিয়েছিল সৌদি বাহিনীই ওই এলাকা প্রতিরক্ষা করবে।

আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাবেক এই মার্কিন কূটনীতিক বলেন, ‘‘বেশ কয়েকটি জায়গায় সমন্বয় ভেঙে পড়েছিল এবং একাধিক বিষয় ভুলভাবে পরিচালিত হয়েছিল।’’

লরেন্সের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব দুই পক্ষের প্রত্যাশার এই অসামঞ্জস্যের কারণে হুথিদের দ্রুত অগ্রযাত্রার সময় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া যথেষ্ট ছিল না। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে সহায়তা চেয়েছিলেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। ট্রাম্প তখন সরাসরি সামরিক সহায়তায় সম্মত না হওয়ায় সৌদি বাহিনীকে পরিস্থিতি সামাল দিতে দেরিতে সক্রিয় হতে হয় এমনটাই লরেন্সের মূল্যায়ন।

আল-মাখা বা মোকা ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ একটি বন্দর। এর উত্তরে হুদাইদাহ এবং দক্ষিণে বাব আল-মান্দেব প্রণালির অবস্থান। ফলে এই উপকূলীয় এলাকার নিয়ন্ত্রণ ইয়েমেনের যুদ্ধের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে হুথিরা পশ্চিম উপকূলের দিকে অগ্রসর হয়ে বাব আল-মান্দেবের কাছাকাছি এলাকায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে বলে আল জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

লরেন্স আরও বলেন, হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইরত জোটের জন্য সৌদি আরব যে নতুন কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো তৈরি করেছিল, সেটিও হুথিদের আকস্মিক অভিযানের শুরুতে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারেনি।

তাঁর মতে, হুথিরা পশ্চিম উপকূল ধরে দ্রুত বাব আল-মান্দেবের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় নতুন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সমন্বয় কাঠামো প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি।

আল জাজিরার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, হুথিদের কয়েক দিনের অভিযানে ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলে বড় এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। এর ফলে বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর তাদের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হয়েছে।

এর আগে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী হুথিদের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযান শুরু করেছে। তবে লরেন্সের মতে, দখল হয়ে যাওয়া ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারে এসব পাল্টা অভিযান এখন পর্যন্ত সীমিত সাফল্য পেয়েছে।

লরেন্স বলেন, পরিস্থিতিটিকে শুধু হুথিদের সামরিক সক্ষমতার অতিমূল্যায়ন হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তাঁর মতে, মূল সমস্যা ছিল যে হুথিদের অভিযানের মাত্রা ও গতি অনুযায়ী সৌদি নেতৃত্বাধীন পক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে পর্যাপ্ত প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেনি।

সাম্প্রতিক লড়াইয়ের বিষয়ে আল জাজিরার বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার বর্তমানে আগের তুলনায় বেশি সম্পদ, সমন্বয় ও উন্নত অস্ত্রের সুবিধা পাচ্ছে। কিন্তু বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছে, হুথিদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও চূড়ান্ত বিজয়ের পরিবর্তে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

এদিকে হুথিদের অগ্রযাত্রার কারণে বাব আল-মান্দেবের নিরাপত্তা নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। প্রণালিটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ, যার মধ্য দিয়ে ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন হয়।

আল জাজিরার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিরা যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছে তারা মার্কিন জাহাজে হামলা করতে চায় না এবং তাদের বর্তমান নিষেধাজ্ঞা সৌদি-সংশ্লিষ্ট জাহাজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। তবে এর ফলে বাব আল-মান্দেব ও হরমুজ—দুই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথেই সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

ফলে আল-মাখা ও বাব আল-মান্দেবকে ঘিরে বর্তমান লড়াই শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার সংঘাত নয়; এটি সৌদি আরবের নিরাপত্তা, যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক সামরিক ভূমিকা এবং বৈশ্বিক নৌবাণিজ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

এএম
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত