বাস্তুচ্যুতদের জন্য হিজবুল্লাহকে ইরানের ২০০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫০ পিএম

ইসরায়েলের সঙ্গে চলতি বছরের যুদ্ধে বাস্তুচ্যুত লেবানিজদের সহায়তায় ইরান থেকে ২০০ মিলিয়ন ডলার পেয়েছে হিজবুল্লাহ। অর্থ স্থানান্তরের বিষয়ে সরাসরি অবগত দুই ব্যক্তির বরাত দিয়ে এ তথ্য জানা গেছে। যুদ্ধের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হিজবুল্লাহর সমর্থকদের জন্য এটিই গোষ্ঠীটির প্রথম বড় ধরনের সহায়তা বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একজনের ভাষ্য, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ বাড়ার এবং তেহরানের সঙ্গে লেবাননের হিজবুল্লাহর অর্থনৈতিক যোগাযোগ কঠিন হয়ে পড়ার মধ্যেই গত মাসে এই অর্থ পেয়েছে গোষ্ঠীটি।

তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অর্থ স্থানান্তরের সঙ্গে জড়িত মধ্যস্থতাকারীরা ঝুঁকির কারণে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নিয়েছেন। একজন জানান, এই কমিশন স্বাভাবিক হারের তুলনায় চার গুণ বেশি।

এ বিষয়ে হিজবুল্লাহর এক কর্মকর্তা বলেন, একটি অর্থের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং আগামী কয়েক দিনের মধ্যে তা বিতরণের পরিকল্পনা জানানো হবে। তবে অর্থের উৎস সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জেনেভায় দেশটির স্থায়ী মিশন, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এবং লেবানন সরকার এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধের তাৎক্ষণিক জবাব দেয়নি।

ইরানের সমর্থনে ২ মার্চ আঞ্চলিক যুদ্ধে হিজবুল্লাহ যোগ দেওয়ার পর ইসরায়েলের বোমাবর্ষণ ও লেবাননে স্থল অভিযান দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের কয়েক লাখ হিজবুল্লাহ সমর্থককে বাস্তুচ্যুত করে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাদের জন্য হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে খুব সামান্য, কিংবা কোনো সহায়তাই পৌঁছায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

৫০ হাজার পরিবারকে সহায়তার পরিকল্পনা

প্রাপ্ত অর্থ থেকে প্রাথমিকভাবে প্রতিটি পরিবারকে ৩ হাজার ডলার করে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। অগ্রাধিকার দেওয়া হবে যেসব পরিবারের গ্রাম ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংস হয়েছে অথবা ইসরায়েলি দখলের কারণে যেসব এলাকায় প্রবেশ করা যাচ্ছে না, তাদের। এমন পরিবারের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার বলে একজন জানিয়েছেন।

বছরের পর বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরান হিজবুল্লাহকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ২০২৫ সালের প্রথম ১০ মাসে ইরান গোষ্ঠীটিকে ১০০ কোটি ডলার দিয়েছিল।

তবে হিজবুল্লাহকে অর্থায়নের বিষয়টি ইরান কখনো স্বীকার করেনি। আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়নের ইরানি নীতি অতীতেও দেশটির ধর্মীয় শাসকদের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ তৈরি করেছে। ইরানে অর্থনৈতিক দুরবস্থা বাড়ার সময়ে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জুনে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি হওয়ার পর ইরানকে তেল বিক্রির সুযোগ দেওয়া হলে হিজবুল্লাহকে আরও অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তেহরান। তবে জুলাইয়ে সেই চুক্তি ভেঙে যায়।

এরপর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়েছে। নিষেধাজ্ঞা কঠোর করার পাশাপাশি ইরানের তেল রপ্তানি ঠেকাতে নৌ অবরোধও আরোপ করেছে ওয়াশিংটন।

গত মাসে হিজবুল্লাহর নেতা নাঈম কাসেম এক ভাষণে বলেন, যুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত হাজারো মানুষের আবাসনের লক্ষ্যে একটি প্রকল্পে শিগগিরই গোষ্ঠীটি অবদান রাখবে। এ কাজে উপলব্ধ সম্পদ ও অনুদান ব্যবহার করা হবে বলেও জানান তিনি।

স্থানীয় সেবা এবং যুদ্ধ-পরবর্তী সহায়তা দিতে পারার সক্ষমতা অতীতেও হিজবুল্লাহর সমর্থন ধরে রাখতে ভূমিকা রেখেছে। ২০০৬ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের পর ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত নগদ অর্থ দেওয়ার পাশাপাশি বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলের নিজেদের শক্ত ঘাঁটিতে পুনর্গঠন কার্যক্রমেও দ্রুত এগিয়েছিল গোষ্ঠীটি।

তবে এবারের যুদ্ধে এখন পর্যন্ত পুনর্গঠনের তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম গত মাসে বলেছেন, ২০২৪ সালের পর সংঘটিত দুটি যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি পুনর্গঠনে মোট ব্যয় ২৭০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

অর্থ সরানোও কঠিন হয়ে পড়েছে

২০০ মিলিয়ন ডলার কীভাবে লেবাননে পৌঁছেছে, সে বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য দেননি সংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তি।

তাদের একজন বলেন, যেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আগে হিজবুল্লাহর অর্থ স্থানান্তর করা হতো, সেগুলোর মাধ্যমে এখন অর্থ সরানো ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। ইরাক ও দুবাইভিত্তিক এমন প্রতিষ্ঠানগুলো এখন আর ব্যবহার করা যাচ্ছে না। তুরস্কের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও চাপ বাড়ছে বলে জানান তিনি।

হিজবুল্লাহর বিরোধীরা মনে করে, অর্থই বর্তমানে গোষ্ঠীটির টিকে থাকার প্রধান অবলম্বন। অর্থ সংগ্রহে নানা জটিলতা তৈরি হলেও গোষ্ঠীটি যোদ্ধাদের এবং যুদ্ধে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের অর্থ দেওয়া বন্ধ করেনি বলে ওই ব্যক্তি জানান।

লেবাননে চলমান যুদ্ধে হিজবুল্লাহর প্রধান সমর্থক শিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের দখল করা বিস্তীর্ণ এলাকায় ইসরায়েল বহু গ্রাম ধ্বংস করেছে। ইসরায়েলের দাবি, হিজবুল্লাহর হামলা থেকে উত্তরাঞ্চলকে সুরক্ষিত রাখতেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ২ মার্চ থেকে ইসরায়েলি হামলায় দেশটিতে ৪ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে কতজন যোদ্ধা ছিলেন, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের হিসাবে আলাদা তথ্য নেই। হিজবুল্লাহও যুদ্ধে নিজেদের নিহত সদস্যের সংখ্যা প্রকাশ করেনি। তবে এর আগে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, যুদ্ধে কয়েক হাজার হিজবুল্লাহ যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল

এএস
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত