৭ অক্টোবরের পর কীভাবে বদলে গেল মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০২:২৩ পিএম

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের আকস্মিক হামলার মধ্য দিয়ে যে যুদ্ধের সূচনা, তিন বছর পর তার অভিঘাত আর শুধু গাজা বা ইসরায়েলের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন, ইরান, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ—সবকিছুর ওপরই পড়েছে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব।

৭ অক্টোবরের হামলার পর ইসরায়েল গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। তিন বছর পরও গাজা ভয়াবহ ধ্বংসের চিহ্ন বহন করছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ ইসরায়েলি নিহত এবং ২৫১ জন জিম্মি হন। পরবর্তী যুদ্ধে গাজায় ফিলিস্তিনি নিহতের সংখ্যা ৭৪ হাজার ছাড়িয়েছে।

এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক ফলগুলোর একটি হলো—মধ্যপ্রাচ্যের পুরোনো শক্তির ভারসাম্য নড়বড়ে হয়ে যাওয়া।

ইরানের ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ কতটা দুর্বল?

দীর্ঘদিন ধরে ইরান লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস এবং ইয়েমেনের হুথিদের মতো মিত্রগোষ্ঠীর মাধ্যমে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার করেছে। কিন্তু গত তিন বছরে এই নেটওয়ার্কের ওপর বড় ধরনের সামরিক চাপ তৈরি হয়েছে।

হিজবুল্লাহর নেতৃত্ব ও সামরিক অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামাসও গাজায় দীর্ঘ যুদ্ধের মধ্যে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে। একই সময়ে ইরানের ওপর সরাসরি সামরিক চাপ বেড়েছে। আল জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানের আঞ্চলিক জোটব্যবস্থা আগের তুলনায় অনেক দুর্বল হয়েছে, যদিও ইয়েমেনের হুথিরা এখনও গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। যৌথ মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন বলে ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম নিশ্চিত করে।

এ ঘটনা ইরানের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর গভীর প্রভাব ফেলে এবং মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির সমীকরণে নতুন অধ্যায় তৈরি করে।

ইসরায়েল সামরিকভাবে শক্তিশালী, কিন্তু নিরাপত্তা কি বেড়েছে?

গত তিন বছরে ইসরায়েল একাধিক ফ্রন্টে সামরিক অভিযান চালিয়েছে। গাজায় দীর্ঘস্থায়ী অভিযান, লেবাননে স্থল অভিযান এবং ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক সংঘাতে ইসরায়েল তার সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে।

আল জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইসরায়েল বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম—এবং সামরিক সক্ষমতার বিচারে সম্ভবত প্রধান—শক্তি। কিন্তু সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এক বিষয় নয়। চ্যাথাম হাউসের সানাম ভাকিলের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কোনো দেশের প্রকৃত আঞ্চলিক ক্ষমতা শুধু সামরিক শক্তিতে নয়, স্থিতিশীলতা তৈরি ও তা বজায় রাখার সক্ষমতার সঙ্গেও সম্পর্কিত।

অর্থাৎ ইসরায়েল সামরিকভাবে শক্তিশালী হলেও তার চারপাশের নিরাপত্তা পরিবেশ আরও জটিল হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘নিরাপত্তা ছাতা’ নিয়েও প্রশ্ন

৭ অক্টোবরের আগে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতির বড় একটি অংশ ছিল ইসরায়েল ও আরব দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা এবং আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের মাধ্যমে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানো।

কিন্তু যুদ্ধের পর সেই প্রক্রিয়া বড় ধাক্কা খায়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র নিজেও ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।

২০২৬ সালের সংঘাতের সময় কাতারের রাস লাফান গ্যাসকেন্দ্র, দুবাইয়ের বিমানবন্দরসংলগ্ন এলাকা এবং ফুজাইরাহর তেল অবকাঠামোর আশপাশে হামলার ঘটনা উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করে। আল জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এসব ঘটনার ফলে ওয়াশিংটন একক নিরাপত্তা-গ্যারান্টর হিসেবে কতটা নির্ভরযোগ্য—তা নিয়ে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে প্রশ্ন বেড়েছে।

এরই মধ্যে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান আগস্টে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করে। চুক্তিতে একটি দেশের ওপর হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনার নীতি রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি অন্যান্য অংশীদারের ওপরও নির্ভরতা বাড়াতে চাইছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

হুথিদের উত্থান ও বাব আল-মান্দাব

মধ্যপ্রাচ্যের নতুন মানচিত্রে ইয়েমেনের হুথিদের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

ইরানের মিত্র হিসেবে পরিচিত হুথিরা গত কয়েক বছরে শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের পক্ষ নয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ে পরিণত হয়েছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে তারা লোহিত সাগরের উপকূল বরাবর অগ্রসর হয়ে মোখা বন্দর ও আশপাশের দ্বীপ দখল করে বলে আল জাজিরা জানিয়েছে। এর ফলে বাব আল-মান্দাব প্রণালির ওপর তাদের কৌশলগত অবস্থান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বাব আল-মান্দাব হলো এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান পথ।

ফলে হরমুজে উত্তেজনার সঙ্গে বাব আল-মান্দাবের নিরাপত্তা সংকট যুক্ত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।

হরমুজ থেকে অর্থনীতির নতুন বাস্তবতা

২০২৬ সালের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিকে অর্থনীতির সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করেছে। ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান দেশটিকে হরমুজ প্রণালির ওপর গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত প্রভাব দিয়েছে।

আল জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হরমুজ দিয়ে সাধারণত বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। যুদ্ধের কারণে এই পথে বাধা তৈরি হওয়ায় ইরান সরাসরি সামরিক শক্তির পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির সক্ষমতাও অর্জন করেছে।

তবে এর প্রভাব সব দেশের ওপর সমান নয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ২০২৬ সালের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সামান্য কমালেও পশ্চিমা অর্থনীতিগুলো জরুরি মজুত, যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ তেল উৎপাদন এবং নরওয়ের মতো সরবরাহকারীদের কারণে তুলনামূলকভাবে কিছুটা চাপ সামলাতে পেরেছে।

অন্যদিকে উপসাগরীয় অর্থনীতিগুলো বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। আল জাজিরার উদ্ধৃত হিসাব অনুযায়ী, সৌদি আরবের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ৩ দশমিক ১ শতাংশে নামানো হয়। কাতারের ক্ষেত্রে ৬ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস পরিবর্তিত হয়ে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ সংকোচনের পূর্বাভাসে পরিণত হয়।

সিরিয়া ও লেবাননেও নতুন সমীকরণ

৭ অক্টোবরের পর যুদ্ধের প্রভাব লেবানন ও সিরিয়াতেও পড়েছে। হিজবুল্লাহর ওপর সামরিক চাপ বাড়ার পর লেবাননে ইসরায়েলি অভিযান বিস্তৃত হয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চে ইসরায়েলের নতুন স্থল অভিযানের সময় প্রায় ১০ লাখ লেবানিজ বাস্তুচ্যুত হওয়ার কথা আল জাজিরা জানিয়েছিল।

সিরিয়ায়ও ২০২৪ সালে বাশার আল-আসাদের পতনের পর তৈরি হওয়া ক্ষমতার শূন্যতা নতুন আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরি করে। ইসরায়েল সিরিয়ার কিছু ভূখণ্ডে সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে বলে আল জাজিরার বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফলে সিরিয়া এখন শুধু গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনের প্রশ্ন নয়; এটি তুরস্ক, ইসরায়েল, ইরান এবং অন্যান্য শক্তির প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রও হয়ে উঠেছে।

আরব বিশ্ব কি নতুন নিরাপত্তা কাঠামোর দিকে?

৭ অক্টোবরের পর আরব দেশগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—কীভাবে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।

একদিকে সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সামরিক সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কও অনেক দেশ বজায় রাখছে। এর পাশাপাশি তুরস্ক, পাকিস্তান, চীনসহ অন্যান্য শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।

চ্যাথাম হাউসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য ঐতিহাসিকভাবেই বহু-মেরুকেন্দ্রিক ছিল; বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই প্রবণতা আরও বেড়েছে। তুরস্কের সিরিয়ায় প্রভাব এবং চীনের কূটনৈতিক ভূমিকা তার উদাহরণ।

তিন বছর পর নতুন মধ্যপ্রাচ্য

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের আগে মধ্যপ্রাচ্যে যে কূটনৈতিক কাঠামো তৈরি হচ্ছিল, তা ছিল তুলনামূলকভাবে ভিন্ন। ইসরায়েল-আরব সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ, ইরানের সঙ্গে আঞ্চলিক সমঝোতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতাকে কেন্দ্র করে একটি নতুন ভারসাম্য গড়ে উঠছিল।

তিন বছরের যুদ্ধে সেই কাঠামো বড় ধাক্কা খেয়েছে।

গাজা এখনও ধ্বংসস্তূপ ও বাস্তুচ্যুত মানুষের সংকটে আক্রান্ত। রয়টার্সের ৭ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের পরও ইসরায়েল গাজার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণ করছে এবং অধিকাংশ মানুষ তাঁবু বা ধ্বংসপ্রাপ্ত এলাকায় বসবাস করছেন।

অন্যদিকে ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের অনেকেই দুর্বল হয়েছে, কিন্তু হুথিরা এখনও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও কৌশলগত শক্তি হিসেবে টিকে আছে। ইসরায়েল সামরিকভাবে আরও প্রভাবশালী হয়েছে, কিন্তু তার নিরাপত্তা পরিবেশও আরও অস্থির হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে আঞ্চলিক দেশগুলোর প্রশ্ন বেড়েছে। আর হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব—দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথই মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে আরও গভীরভাবে যুক্ত করেছে।

অতএব, ৭ অক্টোবর শুধু একটি যুদ্ধের সূচনা করেনি; এটি মধ্যপ্রাচ্যের পুরোনো শক্তির ভারসাম্যকে নড়িয়ে দিয়ে নতুন জোট, নতুন নিরাপত্তা কাঠামো এবং নতুন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পথ খুলে দিয়েছে। আগামী দিনের মধ্যপ্রাচ্য সম্ভবত আর আগের সেই একক নিরাপত্তা-নির্ভর অঞ্চল থাকবে না; বরং একাধিক শক্তির মধ্যে ভারসাম্য খোঁজার আরও জটিল এক ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্র হয়ে উঠবে।

এমএজেড
আরও পড়ুন