নির্বাচনী প্রচারে নাম ও ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বিদ্রূপ করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এবার মিশিগান থেকে সিনেটর নির্বাচিত হয়ে তাকেই পাল্টা খোঁচা দিলেন ডেমোক্র্যাট নেতা আবদুল এল-সাইয়েদ। ট্রাম্পের নাম উচ্চারণে সমস্যা হলে তাকে সিনেটর বলে ডাকলেই চলবে, বিজয় ভাষণে এমন মন্তব্য করেন তিনি। ৪২ বছর বয়সী এই চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন।
মঙ্গলবারের (৩ নভেম্বর) মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে হারিয়ে জয় নিশ্চিত করেন এল-সাইয়েদ। বুধবার (৪ নভেম্বর) ভোরে ডেট্রয়েটে বিজয় সমাবেশে সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকেও খোঁচা দেন। ভ্যান্সকে উদ্দেশ করে বলেন, জানুয়ারিতে তাকে সিনেটর হিসেবে শপথ পড়ানোর সাংবিধানিক দায়িত্ব রয়েছে ভাইস প্রেসিডেন্টের। আর ট্রাম্পের উদ্দেশে বলেন, তার নাম উচ্চারণ করতে প্রেসিডেন্টের সমস্যা হয় জানেন তিনি। তাই ভ্যান্স যখন তাকে শপথ পড়াবেন, তখন ট্রাম্প তাকে সিনেটর বলে ডাকতে পারেন। মিশিগানে যেন আর কখনো তাদের মতো কাউকে দেখতে না হয়, সেই প্রত্যাশাও জানান তিনি।
নির্বাচনী প্রচারের সময় এল-সাইয়েদকে লক্ষ্য করে একাধিক বর্ণবাদী ও ইসলামবিদ্বেষী মন্তব্য করেছিলেন ট্রাম্প ও ভ্যান্স। ট্রাম্প তার নাম নিয়ে বিদ্রূপ করে তাকে জিহাদি বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। ভ্যান্স তাকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে অসুস্থ বলেও মন্তব্য করেন। অন্যদিকে, রিপাবলিকান প্রার্থী রজার্স তার সঙ্গে মুসলিম ব্রাদারহুডের যোগাযোগ ও সহানুভূতির অভিযোগ তুলেছিলেন। এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন এল-সাইয়েদ।
বিজয় ভাষণে এল-সাইয়েদ বলেন, যেসব মা-বাবাকে সন্তানদের বোঝাতে হয়েছে কেন একজন প্রেসিডেন্ট কারও নাম কিংবা প্রার্থনার ধরন নিয়ে প্রকাশ্যে বিদ্রূপ করেন, তাদের জানাতে চান, এবার অন্যায়কারীরা হেরেছে। ৯৫ শতাংশের বেশি ভোট গণনা শেষে তিনি ৫২ শতাংশের বেশি ভোট পেতে যাচ্ছিলেন।
তবে ঐতিহাসিক জয়ের পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থনৈতিক বৈষম্য মোকাবিলার প্রতিশ্রুতিও সামনে এনেছেন এল-সাইয়েদ। তার ভাষায়, মিশিগানে মানুষের পক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনা, গাড়িতে জ্বালানি ভরা কিংবা কর পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। মানুষের করের অর্থ তাদের ও তাদের সন্তানদের কল্যাণে ব্যয় হওয়া উচিত, অন্য দেশের মানুষের ওপর বোমা ফেলতে নয়।
মিশিগানের ডেট্রয়েট অঞ্চলে জন্ম ও বেড়ে ওঠা এল-সাইয়েদের পরিবার মিসরীয় বংশোদ্ভূত। ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান থেকে ২০০৭ সালে স্নাতক শেষ করেন তিনি। ওই বছর নিজের শ্রেণিতে সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জন করেন। পরে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে রোডস স্কলার হিসেবে পড়াশোনা করেন এবং নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ডিগ্রি নেন। নির্বাচনী রাজনীতিতে আসার আগে মহামারিবিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। ডেট্রয়েটের স্বাস্থ্য বিভাগের নির্বাহী পরিচালক এবং পরে ওয়েইন কাউন্টির স্বাস্থ্য, মানবিক ও প্রবীণসেবা বিভাগের পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
২০১৮ সালে মিশিগানের গভর্নর নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মনোনয়ন চেয়ে প্রথমবার নির্বাচনী রাজনীতিতে আসেন এল-সাইয়েদ। স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ানো এবং করপোরেট প্রভাব কমানোর প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রচার চালালেও দলীয় প্রাথমিক নির্বাচনে গ্রেচেন হুইটমারের কাছে হেরে যান। তবে ওই নির্বাচনী প্রচার তাকে মিশিগানের রাজনীতিতে পরিচিত মুখ করে তোলে।
২০২৬ সালে অবসর নিতে যাওয়া ডেমোক্র্যাট সিনেটর গ্যারি পিটার্সের আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সিনেট নির্বাচনের প্রচার শুরু করেন তিনি। আগস্টে দলীয় প্রাথমিক নির্বাচনে কংগ্রেস সদস্য হেইলি স্টিভেন্সকে পরাজিত করেন। স্টিভেন্সের পক্ষে প্রকাশ্যে প্রচার চালিয়েছিল আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (আইপ্যাক)। প্রাথমিক নির্বাচনে ৫ কোটি ডলারের বেশি ব্যয় হয়, যার মধ্যে অন্তত ৩ কোটি ডলার স্টিভেন্সের পক্ষে ব্যয় করেছিল আইপ্যাক। পরে নভেম্বরে এল-সাইয়েদকে সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া স্টিভেন্স ভোটের কয়েক দিন আগে রিপাবলিকান প্রার্থী রজার্সকে সমর্থন জানান।
স্বাস্থ্যসেবাকে সবার জন্য সহজলভ্য করা, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং করপোরেট প্রভাব নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতেও পরিবর্তন চান এল-সাইয়েদ। তিনি সবার জন্য সরকারি অর্থায়নে স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি মেডিকেয়ার ফর অল সমর্থন করেন। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধকে অযৌক্তিক বলে সমালোচনা করেছেন। তার মতে, এ যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম ও মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। ইসরায়েলকে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধেরও দাবি জানিয়েছেন তিনি। গাজায় ইসরায়েলি সরকারের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা আখ্যা দিয়ে বলেছেন, মার্কিন করদাতাদের অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিশুযত্নে ব্যয় করা উচিত।
বিজয়ের পর নিজের ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক আক্রমণের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারেরও জবাব দেন এল-সাইয়েদ। তিনি বলেন, ফিলিস্তিনি শিশুদের নিজেদের পূর্বপুরুষের ভূমিতে হত্যা ছাড়াই বেড়ে ওঠার অধিকার কিংবা সবার জন্য সমান অধিকার, শান্তি, মর্যাদা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের পক্ষে কথা বলা ঘৃণা নয়, বরং ভালোবাসার প্রকাশ। প্রচারের সময় তারা ‘ইনশাআল্লাহ’ বলে জয়ের আশা প্রকাশ করেছিলেন; আর এখন সেই প্রত্যাশা ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলার মুহূর্তে পৌঁছেছে। সূত্র: আলজাজিরা
এআই বিপ্লবের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে ভোটারদের ‘ভূমিকম্প’
ডেমোক্র্যাটদের জয়, ট্রাম্প প্রশাসনের পরাজয়ের বড় প্রমাণ: মোজতবা খামেনি
‘ট্রাম্পকে তুলে ডাস্টবিনে ফেলার’ ভিডিও ভাইরাল!
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার হতে যাচ্ছেন হাকিম জেফরিস