বেলজিয়ামে শতাধিক শিক্ষার্থী গ্রেপ্তার

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪৫ এএম

শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী এবং শিক্ষা উপকরণের সংকটের প্রতিবাদে বেলজিয়ামের লিয়েজ শহরে বিক্ষোভে নেমেছেন শত শত শিক্ষার্থী। কয়েক দিন ধরে চলা এই বিক্ষোভে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ১০৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

বুধবার (৭ অক্টোবর) লিয়েজে বিক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় কিছু বিক্ষোভকারী দোকানের জানালা ভাঙচুর এবং বিভিন্ন স্থানে আগুন ধরিয়ে দেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে। নিরাপত্তাজনিত কারণে স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আগেভাগে বন্ধ হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় এবং শহরের প্রধান রেলস্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।

বিক্ষোভকারীদের প্রধান অভিযোগ, ফরাসিভাষী বেলজিয়ামের শিক্ষা ব্যবস্থায় শ্রেণিকক্ষগুলো অতিরিক্ত ভিড়ে পরিণত হয়েছে এবং শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পর্যাপ্তভাবে পাচ্ছে না।

এর পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে টিউশন ফি বাড়ানোর সিদ্ধান্তও ক্ষোভ বাড়িয়েছে। ফরাসিভাষী অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য ফি ৮৩৫ ইউরো থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ১৯৪ ইউরো করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এর আগেও ব্রাসেলসে বিক্ষোভ হয়েছিল।

শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ডে শিক্ষা অধিকার, ব্যয় কমানো এবং শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবি তুলে ধরেছেন।

বেলজিয়ামের বর্তমান ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে প্রতিবেশী ফ্রান্সের সাম্প্রতিক শিক্ষার্থী বিক্ষোভেরও যোগসূত্র রয়েছে। ফ্রান্সে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা আন্দোলনের মূল দাবির মধ্যে রয়েছে শিক্ষক সংকট দূর করা, জরাজীর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো সংস্কার এবং শিক্ষা খাতে সরকারি অর্থায়ন বাড়ানো।

লিয়েজের ১৯ বছর বয়সী শিক্ষার্থী অ্যামেলিয়া দি সালভে রয়টার্সকে বলেন, প্রতিবেশী ফ্রান্সের আন্দোলন তাদের কিছুটা প্রভাবিত করেছে। আরেক শিক্ষার্থী আলফ্রেড বলেন, দুই দেশের শিক্ষার্থীরা অনেকটা একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হওয়ায় তাদের মধ্যে পারস্পরিক সংহতি তৈরি হয়েছে।

তবে বেলজিয়ামের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের নিজস্ব কারণও রয়েছে। বিশেষ করে ফরাসিভাষী অঞ্চলে শিক্ষা সংস্কার ও ব্যয় বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করেই সাম্প্রতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

বেলজিয়ামের পুলিশ জানিয়েছে, কয়েকটি ঘটনায় বিক্ষোভকারীরা সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তির ক্ষতি করেছেন এবং আগুন ধরিয়েছেন। এর আগে অক্টোবরের শুরু থেকেই লিয়েজসহ বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ চলছিল।

৫ অক্টোবরের বিক্ষোভেও পুলিশ ১৬ জনকে প্রশাসনিকভাবে আটক করেছিল। কয়েকজনের কাছে মলোটভ ককটেল তৈরিতে ব্যবহার করা হতে পারে—এমন কাচের বোতল ও কাপড় পাওয়া গেলেও কোনো দাহ্য পদার্থ পাওয়া যায়নি বলে পুলিশ জানিয়েছিল।

পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, উদ্বেগ বাড়ছে

ক্রমবর্ধমান উত্তেজনায় লিয়েজের মেয়র উইলি ডেমেয়ার সংলাপের মাধ্যমে পরিস্থিতি শান্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, তরুণদের নিজেদের অভিযোগ শান্তিপূর্ণভাবে তুলে ধরার সুযোগ দেওয়া এবং তাদের উদ্বেগ শোনা প্রয়োজন।

তবে কর্তৃপক্ষের উদ্বেগের কারণও রয়েছে। অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের কারণে শহরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

বেলজিয়ামের এই আন্দোলন এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশে শিক্ষা খাত নিয়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা বিক্ষোভ করছেন।

ফ্রান্সে শিক্ষক সংকট, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, জরাজীর্ণ স্কুল ভবন এবং শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না দেওয়ার অভিযোগে বড় ধরনের আন্দোলন চলছে। ৬ অক্টোবর দেশজুড়ে লাখো মানুষ এতে অংশ নেয় বলে এপি জানিয়েছে। একই সময়ে পুলিশি দমন-পদ্ধতি নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশেও শিক্ষা খাতে ব্যয় সংকোচন ও বাজেট কমানোর সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। অর্থনৈতিক চাপ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি বাজেটের ঘাটতি সামাল দিতে বিভিন্ন দেশে শিক্ষা খাতেও ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

বেলজিয়ামের বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, শিক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি শুধু বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি তরুণদের মধ্যে বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক অসন্তোষের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

লিয়েজের মেয়রসহ স্থানীয় কর্তৃপক্ষ সংলাপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের কথা বললেও শিক্ষার্থীরা তাদের দাবিতে অনড়। ফলে শিক্ষা সংস্কার, টিউশন ফি এবং শিক্ষা খাতে সরকারি বিনিয়োগ নিয়ে সরকার ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলোচনার ফল কী হয়, তার ওপরই পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ অনেকটা নির্ভর করবে।

এদিকে ফ্রান্স ও বেলজিয়ামে প্রায় একই সময়ে শিক্ষার্থীদের রাজপথে নামার ঘটনা ইউরোপের শিক্ষা ব্যবস্থায় অর্থায়ন, সমতা ও সুযোগের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। তবে বেলজিয়ামের আন্দোলনকে ফ্রান্সের আন্দোলনের সরাসরি অংশ হিসেবে দেখার বদলে—দুই দেশের অভিন্ন শিক্ষা-সংকটের মধ্যে পারস্পরিক প্রভাব ও অনুপ্রেরণার সম্পর্ক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এমএজেড
আরও পড়ুন