স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর হলো যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। সময়ের প্রবাহে এই মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে এসেছে বহু পরিবর্তন। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও উপদেষ্টা- বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, শাসনব্যবস্থা এবং নির্দলীয় ব্যক্তিত্বরা পর্যায়ক্রমে এ দায়িত্ব পালন করেছেন। এই ধারাবাহিক পরিবর্তন কেবল প্রশাসনিক রদবদলের ইতিহাস নয়; বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক পালাবদল, সামরিক ও গণতান্ত্রিক শাসনের উত্থান-পতন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অভিজ্ঞতা এবং আধুনিক প্রশাসনিক রূপান্তরের এক জীবন্ত দলিল।
স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত মোট ৩৩জন ব্যক্তি এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০১৪ সালে একসঙ্গে দুইজন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ও একজন উপমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেন—যা মন্ত্রণালয়ের ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
স্বাধীন বাংলাদেশের এই মন্ত্রণালয়ের যাত্রা শুরু হয় ১৯৭২ সালের ১৩ জানুয়ারি, যখন মোহাম্মদ ইউসুফ আলী মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
এরপর বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলেছে নেতৃত্বও। সামরিক শাসন, গণতান্ত্রিক সরকার, তত্ত্বাবধায়ক প্রশাসন- প্রতিটি পর্যায়ে নতুন মুখ এসেছে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে।
প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তাহেরউদ্দিন ঠাকুর এবং উপদেষ্টা হিসেবে আবুল ফজল। রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নেতৃত্বেও আসে নতুন মুখ- শামসুল হুদা চৌধুরী, প্রতিমন্ত্রী আমিরুল ইসলাম কালাম এবং নুর মোহাম্মদ পর্যায়ক্রমে দায়িত্ব পালন করেন।
এরশাদ সরকারের আমলে দায়িত্বে ছিলেন শফিকুল গনি স্বপন, জাকির খান চৌধুরী, মোস্তফা জামাল হায়দার, সুনীল কুমার গুপ্ত, শেখ শহীদুল ইসলাম, মোহাম্মদ আবদুল গাফফার হালদার, আবুল খায়ের চৌধুরী, এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার এবং নিতাই রায় চৌধুরী।
নব্বইয়ের দশকে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর প্রশাসনে নতুন গতি আসে। উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আলমগীর এম. এ. কবীর। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন মির্জা আব্বাস ও সাদেক হোসেন খোকা। পরে উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন শামসুল হক, আর আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ওবায়দুল কাদের। পরবর্তী সময়ে উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এ এস এম শাহজাহান এবং বিএনপির প্রতিমন্ত্রী ছিলেন ফজলুর রহমান পটল।
১/১১ সরকারের সময় উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সি এম শফি সামি, সফিকুল হক চৌধুরী ও তপন চৌধুরী। তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে মাহবুব জামিলও এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে যুক্ত ছিলেন।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর দায়িত্বে আসেন আহাদ আলী সরকার, মুজিবুল হক চুন্নু ও বীরেন শিকদার। উপমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আরিফ খান জয়। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন জাহিদ আহসান রাসেল এবং পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন নাজমুল হাসান পাপন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ক্রীড়া উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া। তার পদত্যাগের পর এই দায়িত্ব পালন করেছেন ড. আসিফ নজরুল।
রাষ্ট্রের পথচলার সঙ্গে সঙ্গে নেতৃত্ব বদলেছে, দায়িত্ব বদলেছে, সময় বদলেছে- কিন্তু প্রশাসনের এই দীর্ঘ ধারাবাহিকতা আজও দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার এক নীরব সাক্ষী হয়ে আছে। তবুও প্রশ্ন থেকে যায়- এই দীর্ঘ যাত্রার পরও বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন যেন এখনও পূর্ণ বিকাশের অপেক্ষায়, যেন এখনও প্রস্তুতির প্রাথমিক স্তরেই অবস্থান করছে।
ইতিহাস এগিয়েছে, নেতৃত্ব বদলেছে- কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ক্রীড়া উন্নয়নের স্বপ্ন এখনও অপূর্ণই রয়ে গেছে।

