কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বর্তমানে কার্যত অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ আরো ঘনীভূত হচ্ছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলন (ইউএনসিটিএডি)।
এদিকে ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ সংকট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করলেন সাবেক সিআইএ প্রধান বিল বার্নস।
বুধবার ইউএনসিটিএডির প্রকাশিত এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান এই নৌপথে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে এই প্রণালি দিয়ে দৈনিক গড়ে প্রায় ১৩০টি জাহাজ চলাচল করতো। তবে মার্চ মাসে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ছয়টিতে। অর্থাৎ, এক মাসের ব্যবধানে জাহাজ চলাচল প্রায় ৯৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
ইউএনসিটিএডি উল্লেখ করেছে, এই নৌপথের 'প্রতিবন্ধকতা' বিশ্বের অধিকাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। এটি সরাসরি উৎপাদন, বাণিজ্য ও ভোগের ওপর প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে সমুদ্রপথ, বিমান কার্গো এবং বন্দর লজিস্টিকসের মতো পরিবহন ব্যবস্থার ওপরও বিরূপ প্রভাব বিস্তার করছে।
সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, যদি এই 'প্রতিবন্ধকতা' অব্যাহত থাকে বা আরো বৃদ্ধি পায় এবং জ্বালানি অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময়ের জন্য চড়া থাকবে। এর ফলে বিশ্ব জুড়ে স্থায়ী মুদ্রাস্ফীতির চাপ সৃষ্টি হতে পারে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া ও ইউরোপের মতো অঞ্চলগুলো, যারা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর অধিক নির্ভরশীল, তারা বর্তমানে আরো বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে।
এদিকে ইরানের সঙ্গে ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ চলমান থাকলে পারস্য উপসাগরের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ 'হরমুজ প্রণালি' কখনোই স্থিতিশীল হবে না বলে সতর্ক করে দিয়েছে চীন। বৃহস্পতিবার চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এই সতর্কবার্তা দেন বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে জানানো হয়। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদের সঙ্গে এক ফোনালাপে ঐ মন্তব্য করেন। ফোনালাপের সময় তিনি অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বানও জানান। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতের বিষয়টি ইরান যুদ্ধেরই একটি পরোক্ষ প্রভাব এবং যতদিন এই যুদ্ধ চলবে, ততদিন এই জলপথ স্থিতিশীল থাকবে না।
এর আগে, গত মঙ্গলবার বেইজিংয়ে পাকিস্তান ও চীনের দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকের পর এক যৌথ বিবৃতিতে মধ্যপ্রাচ্যে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি এবং হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ-চলাচল নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। বর্তমানে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের পঞ্চম সপ্তাহ চলছে; যা বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও সামুদ্রিক বাণিজ্যে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে বিমান হামলা শুরু করে ইসরাইলের সামরিক বাহিনী। পরে 'অপারেশন এপিক ফিউরি' নামে ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রও। এর জবাবে ইরানও উপসাগরীয় অঞ্চল জুড়ে ইসরাইল ও মার্কিন স্বার্থ লক্ষ্য করে পালটা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে।
অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত ও হরমুজ প্রণালিতে সৃষ্ট অচলাবস্থা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সতর্ক করেছেন মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর সাবেক পরিচালক বিল বার্নস। তার মতে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখার দায়িত্ব ইউরোপীয় মিত্র বা উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর ওপর চাপিয়ে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে সরিয়ে নিতে পারে। ফরেন অ্যাফেয়ার্স ম্যাগাজিনের এক পডকাস্টে সাবেক এই গোয়েন্দা প্রধান বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের প্রধান তেল টার্মিনাল খার্গ দ্বীপ বা হরমুজ প্রণালি সংলগ্ন এলাকা দখলে নিতে স্থল অভিযান চালাতে পারেন, তবে এর প্রতিটি পদক্ষেপেই চরম ঝুঁকি রয়েছে।
সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েলের ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধ-পূর্ববর্তী বিখ্যাত 'পটারি বার্ন রুল' (আমরা ভেঙেছি, তাই মালিকানা আমাদের)-এর প্রসঙ্গ টেনে বার্নস বলেন, এবার পরিস্থিতি উলটো হতে পারে। তার ভাষায়, এবার নীতিটি হতে পারে এমন, 'আমরা ভেঙেছি, এখন দায়ভার তোমাদের'। অর্থাৎ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখার দায়িত্ব ইউরোপীয় মিত্র বা উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর ওপর চাপিয়ে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে সরিয়ে নিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল মিলে ইরানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ শুরু করেছে, তাকে 'পছন্দমাফিক যুদ্ধ' বলে অভিহিত করেন বার্নস।
তিনি মনে করেন, এই যুদ্ধ ইরানের কট্টরপন্থিদের আরো শক্তিশালী করে তুলতে পারে। ওবামা শাসনামলে ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তির আগে তেহরানের সঙ্গে গোপন আলোচনায় অংশ নেওয়া এই অভিজ্ঞ কূটনীতিক বলেন, ইরান সরকার অর্থনীতি ব্যবস্থাপনার মতো অনেক বিষয়ে অদক্ষ হতে পারে, কিন্তু তারা নিজেদের টিকিয়ে রাখতে এবং অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়ন চালাতে পারদর্শী। এমনকি শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দিলেও তারা টিকে থাকার ক্ষমতা রাখে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ শীর্ষ নেতাদের নিহতের ঘটনায় দেশটিতে 'শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন' হয়েছে বলে ডোনাল্ড ট্রাম্প যে দাবি করেছেন, তার সঙ্গে একমত নন বিল বার্নস। তিনি বলেন, কিছু দিক থেকে এই শাসনব্যবস্থা দুর্বল হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এটি এখন আরো বেশি উগ্র, কট্টর ও রক্ষণশীল হয়ে উঠেছে। ইরানি নেতাদের কাছে টিকে থাকাই হলো বিজয়।
বিল বার্নস আরো বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বাস করি যে এই শাসনব্যবস্থা পতনের দিকেই যাচ্ছে। কিন্তু আমার আশঙ্কা হচ্ছে, এই যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা সেই পতনের মুহূর্তকে ত্বরান্বিত করার বদলে উলটো কিছুটা ধীর করে দিয়েছি। সূত্র: আলজাজিরা, সিনহুয়া, সিএমজি
স্থল অভিযানে‘শত্রুসেনাদের’ কেউ যেন জীবিত না ফেরে
