নিখোঁজ পাইলটকে কেন জীবিত পেতে মরিয়া ওয়াশিংটন ও তেহরান?

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:১৩ পিএম

ইরানের দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে ভূপাতিত মার্কিন এফ-১৫ই (F-15E) যুদ্ধবিমান। বিমানটিতে থাকা দুই পাইলটের মধ্যে একজনকে উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও দ্বিতীয় পাইলটের খোঁজ এখনও চলছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের এই সেনাকে উদ্ধারে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে, অন্যদিকে ইরান তাকে জীবিত বন্দি করতে ঘোষণা করেছে বিশাল পুরস্কার। 

শুক্রবার (৩ এপ্রিল) এ বিমান ধ্বংসের ঘটনা ঘটে। এই একজন পাইলটকে ঘিরে দুই দেশের এই চরম মরিয়া ভাবের পেছনে কাজ করছে গভীর রাজনৈতিক ও কৌশলগত সমীকরণ।

এই এফ-১৫ জেট ধ্বংসের পর থেকেই মার্কিন ও ইরানি বাহিনী উভয়ই পাইলটদের অবস্থান শনাক্তে তৎপর। মার্কিন পক্ষ অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে, অন্যদিকে তেহরানের সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনী এবং সাধারণ নাগরিকরা নিখোঁজ পাইলটের খোঁজে তন্নতন্ন করছে।

টাইম ম্যাগাজিনকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হিউস্টন ক্যান্টওয়েল এবং মেজর জেনারেল থমাস কুঙ্কেল জানিয়েছেন, বিমান বিধ্বস্ত হলে প্রথম অগ্রাধিকার হলো ক্রু সদস্যদের অবস্থান শনাক্ত করা। এ কাজ খুবই কঠিন কারণ শত্রু বাহিনী প্রায়ই ভুল তথ্য ছড়িয়ে দেয়।

সাবেক মার্কিন সামরিক উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার পাইলট কুঙ্কেল বলেন, আমাদের পুরো কর্মজীবন এই ধরনের পরিস্থিতির জন্য প্রশিক্ষণ নেওয়ায় ব্যয় হয়। বিপদের মুহূর্তে আমাদের উদ্ধারকর্মীরা সর্বোচ্চ সীমা পর্যন্ত যেতে পারে। পাইলটদের কাছে থাকে সারভাইভাল কিট এবং বিশেষ রেডিও ডিভাইস, যা বিমান থেকে বের হওয়ার পরও তাদের সঙ্গে থাকে।

উদ্ধার অভিযানে সাধারণত ১০-২০ জনের একটি দল মোতায়েন করা হয়। এই দলে এইচএইচ-৬০ডব্লিউ হেলিকপ্টার, দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার জন্য এইচসি-১৩০জে রিফুয়েলিং বিমান এবং শত্রু আক্রমণ প্রতিহত করতে এ-১০ নামক ভারী সাঁজোয়া বিমান ব্যবহৃত হয়। এছাড়া ইলেকট্রনিক জ্যামিং বিমানও মোতায়েন করা হতে পারে।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) নিখোঁজ মার্কিন পাইলটকে আটক করতে পারলে বেসামরিক নাগরিকদের জন্য ৬০ হাজার ডলার পুরস্কারের ঘোষণা করেছে। গ্রামীণ প্রদেশগুলোতে এই তথ্য প্রচার করা হচ্ছে। 

সাধারণ মানুষ ব্যক্তিগত যানবাহনে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে, তবে কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে যে পাইলটের সঙ্গে খারাপ আচরণ করা যাবে না।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি ইরান পাইলটকে আটক করতে সক্ষম হয়, তবে যুদ্ধের কৌশলে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। পাইলটকে জিজ্ঞাসা করা হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র কত যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে এবং আকাশে গোপনে আক্রমণের তথ্য আদায় করার চেষ্টা করা হতে পারে।

অন্যদিকে, মার্কিন বাহিনী যদি দ্রুত পাইলটকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়, তবে ঘটনাটি সীমিত কৌশলগত ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। পাইলটের অবস্থান ও ভাগ্য উভয় পক্ষই প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, যা পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়াবে এবং সংঘাত দীর্ঘায়িত করতে পারে।

ক্যান্টওয়েল জানান, বিমান থেকে প্যারাসুটে বের হওয়ার পর স্বয়ংক্রিয় অ্যালার্ট তৈরি হয়। এরপর ক্রু অবস্থান শনাক্ত করে একটি রেসকিউ প্যাকেজ বা উদ্ধারকারী দল গঠন করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় পরিবেশগত ও পরিস্থিতি সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করা হয়।

তিনি আরও জানান, ক্রু সদস্যরা সবসময় এই ধরনের পরিস্থিতির জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং রিফ্রেশার ট্রেনিং নিয়েছেন। পরিস্থিতি পরিবর্তনশীল হওয়ায় নির্দিষ্ট কোনো কাজ করা কঠিন।

বিমান বিধ্বস্তের পর পাইলটদের অবস্থা নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়েছে। অসমর্থিত রিপোর্ট অনুযায়ী, পাইলট প্যারাসুটে বের হয়ে ইরানি ভূখণ্ডে অবতরণ করেছেন। অন্য কিছু সূত্রে বলা হয়েছে, তিনি ইরানি বাহিনীর হাতে বন্দি রয়েছেন।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ইন্টেলিজেন্স সংক্রান্ত অস্পষ্ট পোস্ট এবং ছবি প্রকাশ করেছে, যেখানে একটি ইজেকশন সিট দেখা যাচ্ছে। পোস্টে মার্কিন প্রচারণা কৌশলের সমালোচনা করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, লক্ষ্যভেদে ব্যর্থতা গতিশীল অপারেশন হিসেবে চালানো হচ্ছে এবং পরাজয়কে মিশন সম্পন্ন হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

নিখোঁজ পাইলটের অবস্থান ও উদ্ধারের ফলাফল উভয় পক্ষের কৌশল ও সংঘাতের ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করতে পারে। মার্কিন বাহিনী দ্রুত উদ্ধার করতে পারলে তারা দাপটের সঙ্গে সংঘাত চালিয়ে যেতে পারবে, অন্যদিকে ইরান পাইলটকে আটক করতে পারলে যুক্তরাষ্ট্রকে দরকষাকষি ও আঞ্চলিক চাপ মোকাবিলা করতে হবে।

AHA
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত