শিশু নিরাপত্তা: সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো কী বলছে

আপডেট : ২৩ মে ২০২৬, ১২:৩৪ পিএম

আমাদের শহরগুলো দিন দিন বাড়ছে, হচ্ছে চকচকে। কিন্তু বাড়ছে উদ্বেগও। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ—আমাদের শিশুদের নিরাপত্তা। সম্প্রতি নগর অপরাধের কিছু ঘটনা যেন ঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছে সবার মনে।

গত কয়েক মাসে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরে শিশু নিয়ে উদ্বেগজনক কিছু ঘটনা ঘটেছে। শিশু অপহরণ, ধর্ষণ, হত্যা, পথ দুর্ঘটনা, আবার কখনো স্কুলের সামনেই হয়রানির ঘটনা—এসব আর নতুন নয়, কিন্তু বেড়ে চলেছে উদ্বেগের মাত্রা।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী সাত বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। তার মরদেহের একটি অংশ পাওয়া যায় প্রতিবেশীর ঘরের খাটের নিচে এবং মাথা উদ্ধার করা হয় বাথরুম থেকে। অভিযোগ রয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে পালাতে সহায়তা করেছেন তার স্ত্রীও।

এছাড়া গত ১৬ মে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার চান্দের চর গ্রামের মদিনাপাড়ায় আছিয়া আক্তার নামে ১০ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। নিহত শিশুর গলায় শ্বাসরোধের চিহ্ন এবং ধর্ষণের প্রাথমিক আলামত পাওয়ার পর পুলিশ অভিযুক্ত রাজা মিয়াকে (৪৫) আটক করে। 

গত ১৪ মে ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল উপজেলায় ধর্ষণের পর লামিয়া আক্তার নামে চার বছর বয়সী এক শিশুকে হত্যা করা হয়। নিখোঁজ হওয়ার একদিন পর এলাকার একটি ভুট্টাক্ষেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। 

এদিকে গত ৬ মে সিলেট সদর উপজেলার জালালাবাদ এলাকায় চার বছর বয়সী শিশু ফাহিমা আক্তারকে ধর্ষণের চেষ্টার পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরে অভিযুক্ত জাকির হোসেন শিশুটির মরদেহ খাটের নিচে লুকিয়ে রেখে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাকে খোঁজার নাটক করেন বলে অভিযোগ ওঠে।

এভাবে প্রতিনিয়ত দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশু হত্যা, ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এর সংগৃহীত তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশে অন্তত এক হাজার ৮৯০ জন শিশু ও কিশোরী নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৪৮৩ জন নিহত এবং এক হাজার ৪০৭ জন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এছাড়া ৫৮০ জন শিশু ধর্ষণ এবং ৩১৮ জন যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। 

এদিকে, বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের গত সাড়ে চার মাসে (জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত) সারা দেশে অন্তত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

আসকের তথ্যমতে, এই একই সময়ে ধর্ষণ চেষ্টার শিকার হয়েছে অন্তত আরও ৪৬ শিশু। এছাড়া ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে অন্তত ১৭ শিশুকে। এর মধ্যে শুধু গত দুই সপ্তাহেই হত্যার শিকার হয়েছে ৪টি শিশু। প্রতিটি ঘটনাই সমাজে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাহীনতার প্রতিফলন হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮ ও ৩২ অনুচ্ছেদে শিশুদের জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। জাতীয় শিশু নীতিতেও শিশুদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা ও বৈষম্যহীন বিকাশকে রাষ্ট্রের অন্যতম অঙ্গীকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি, জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবেও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে বর্তমান বাস্তবতায় এই সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

শিশু হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের মতো সহিংসতা প্রতিরোধ করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও আইনগত দায়িত্ব। কিন্তু একের পর এক এমন ঘটনা প্রমাণ করছে, শিশু সুরক্ষায় বিদ্যমান ব্যবস্থা যথেষ্ট কার্যকর নয়। বিচারহীনতার সংস্কৃতি, দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া এবং দুর্বল আইন প্রয়োগের কারণে এ ধরনের অপরাধ বাড়ছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির চিত্র ফুটে উঠছে। 

বিশ্লেষকদের মতে, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি সমাজের নৈতিক ভিত্তি ও মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। রাজনৈতিক দলগুলোর জবাবদিহি ও কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া শিশুদের ওপর এই সহিংসতা কমানো সম্ভব নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খন্দকার ফারজানা রহমান বলেন, একটি চাইল্ড প্রোটেকশন কমিশন (শিশু সুরক্ষা কমিশন) গঠন করা প্রয়োজন, যা শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শিশুদের সুরক্ষায় সহায়তা করবে এবং অপরাধীদের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি রাখবে। 

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই বিষয়গুলোকে রাজনৈতিক এজেন্ডায় কখনোই গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বছরের শুরুতে জাতীয় নির্বাচনের আগে ১২টি রাজনৈতিক দল ইউনিসেফের শিশু অধিকার ইশতেহারে স্বাক্ষর করলেও, তাদের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বে শিশু সুরক্ষা কতটুকু আছে তা নিয়ে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. এস এম আতিকুর রহমান বলেন, বাইরের দেশে এই ধরনের অপরাধপ্রবণ মানসিকতার মানুষদের সমাজে চিহ্নিত করে দেওয়া হলেও আমাদের দেশে তা হয় না। ফলে শিশুরা এক অনিরাপদ পরিবেশে বড় হচ্ছে। অপরাধপ্রবণ মানুষদের কাছে অপরাধ করা বা কাউকে মেরে ফেলাটা এখন খুব সহজ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শিশু মনোবিদ ও সমাজকর্মীরা বলছেন, শুধু আইন করে হবে না। দরকার সচেতনতা। অভিভাবকদের এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক হতে হবে। শিশুকে শেখাতে হবে— ‌‘কোনো অপরিচিত মানুষের সাথে যাবে না’, ‘কাছে গাড়ি এলে দূরে সরে দাঁড়াবে’, ‘কাউকে ঘরের ভেতরের ছবি অনলাইনে পাঠাবে না।’

তবে শুধু শিক্ষাদান নয়, প্রয়োজন নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা। স্কুলের আশপাশে পর্যাপ্ত আলো, সিসিটিভি ক্যামেরা, ট্রাফিক সিগনাল, পুলিশি টহল—এই কাজগুলো এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।

শিশুরা আমাদের ভবিষ্যৎ। আজ যদি তারা নিরাপদ না-ওঠে, তাহালে সেই ভবিষ্যৎ অন্ধকার। নগর অপরাধ যতই বাড়ুক, আমরা যদি সচেতন হই, পাশাপাশি দাঁড়াই, আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করি—তবে একদিন প্রতিটি শিশু নির্ভয়ে স্কুলে যাবে, খেলতে পারবে পার্কে।

কেবল বিচারিক প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ না থেকে ধর্ষকদের সামাজিকভাবেও চিহ্নিত করা জরুরি। প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তা বিধান এবং এই ভয়াবহ পরিস্থিতি উত্তরণে রাজনীতিবিদদের দায়বদ্ধতা ও জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।এখনই সময় সজাগ হওয়ার। প্রতিবেশী, অভিভাবক, শিক্ষক—সব মিলে গড়তে হবে সুরক্ষার এক সুদৃঢ় বেড়া। কারণ, আমাদের আজকের সতর্কতাই পারে কালকের শিশুদের জীবন বাঁচাতে।

আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত