ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্প্রতি ঘোষিত ভঙ্গুর ও অস্পষ্ট যুদ্ধবিরতি মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। তবে এই যুদ্ধে কোনো পক্ষই নিজেকে বিজয়ী দাবি করতে না পারলেও, বিশ্লেষক ও খোদ ইসরায়েলের অভ্যন্তরে বিরোধীদের মতে সবচেয়ে বড় পরাজিত পক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। বছরের পর বছর ধরে ইরানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধের ছক তিনি কষেছিলেন, তা শেষ পর্যন্ত একটি ‘ব্যর্থ অভিযান’ এবং ‘কৌশলগত বিপর্যয়’ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
নেতানিয়াহুর লক্ষ্য ও বাস্তবতার ব্যবধান
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে নেতানিয়াহু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সরব ছিলেন। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বিভিন্ন ছবি ও গোপন নথিপত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে তিনি বিশ্ববাসীকে ইরানের ‘অস্তিত্বের হুমকি’ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন এবং পর পর বেশ কয়েকজন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামার জন্য কূটনৈতিক চাপ দিয়ে এসেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই সংঘাত নেতানিয়াহুর কোনো লক্ষ্যই পূরণ করতে পারেনি।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আগেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল যে, ইরানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন বা বিপ্লবের যে স্বপ্ন ইসরায়েল দেখাচ্ছে তা অবাস্তব এবং শেষ পর্যন্ত সেটিই সত্য প্রমাণিত হয়েছে। ইসরায়েলি পরিকল্পনা ছিল যে এই যুদ্ধ বড়জোর কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হবে, কিন্তু সেই হিসাবও চরমভাবে ভুল ছিল।
ট্রাম্পের ‘ইউ-টার্ন’ ও ইসরায়েলের বিচ্ছিন্নতা
ইসরায়েলি চ্যানেল ১২-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাত্র দুদিন আগেও নেতানিয়াহু ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি না হওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। ট্রাম্প একদিন তেহরানকে ‘মুছে দেওয়ার’ হুমকি দিলেও পরক্ষণেই সেই অবস্থান থেকে সরে আসেন এবং ইরানকে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির সুযোগ দেন। এই সিদ্ধান্তে ইসরায়েলকে কার্যত আলোচনা থেকে দূরে রাখা হয়েছে।
ইসরায়েলের প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার ল্যাপিদ এই পরিস্থিতিকে একটি ‘নজিরবিহীন রাজনৈতিক বিপর্যয়’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, "ইসরায়েলের ইতিহাসে এমন রাজনৈতিক বিপর্যয় আগে কখনো ঘটেনি। যখন আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার মূল বিষয়গুলো নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছিল, ইসরায়েল তখন আলোচনার টেবিলে তো দূরে থাক, তার আশেপাশেও ছিল না।" তিনি আরও যোগ করেন, নেতানিয়াহু রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন এবং তার দাম্ভিকতার কারণে ইসরায়েলের যে ক্ষতি হয়েছে তা কাটিয়ে উঠতে বছরের পর বছর সময় লাগবে।
কৌশলগত ব্যর্থতা ও ইরানের টিকে থাকা
নেতানিয়াহু বাজি ধরেছিলেন যে এই যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানের থিওক্রেটিক (ধর্মতান্ত্রিক) শাসনের পতন ঘটবে এবং তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভাণ্ডার দখল করা যাবে। কিন্তু বাস্তবে ইরান টিকে আছে এবং দেশটির ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর’ (আইআরজিসি) রাজনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। তেহরানের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল বিশ্বের দুই বড় সামরিক শক্তির মাসব্যাপী আক্রমণ থেকে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করা, যা তারা আপাতত করতে পেরেছে।
অন্যদিকে, গাজায় গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি এই যুদ্ধের ফলে আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বামপন্থী ডেমোক্র্যাট পার্টির নেতা ইয়ার গোলান এই যুদ্ধবিরতিকে নেতানিয়াহুর একটি ‘চরম কৌশলগত ব্যর্থতা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, "নেতানিয়াহু একটি ঐতিহাসিক বিজয় ও প্রজন্মের পর প্রজন্মের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু বাস্তবে আমরা পেলাম চরম অনিরাপত্তা।"
লেবানন ও হিজবুল্লাহ ফ্রন্ট
ইরানে লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়ে নেতানিয়াহু এখন দক্ষিণ লেবাননে হামলা জোরদার করেছেন। ইসরায়েলের ঘোষিত লক্ষ্য হলো সেখানে একটি ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ তৈরি করা। কিন্তু হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে স্থলযুদ্ধে লড়া ইসরায়েলি বাহিনীর জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে বলে মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকরা। গত কয়েকদিনের ভয়াবহ বিমান হামলাকে অনেক বিশেষজ্ঞ ইরানের ব্যর্থতা ঢাকার জন্য লেবাননের ওপর একটি ‘প্রতিহিংসামূলক শাস্তি’ হিসেবে দেখছেন।
ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট
নেতানিয়াহুর জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থনের ফাটল। রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট উভয় পক্ষেই এখন ইসরায়েলের যুদ্ধংদেহী ভূমিকার সমালোচনা হচ্ছে। এমনকি মার্কিন ইহুদি ভোটারদের মধ্যেও ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন ঐতিহাসিকভাবে নিম্নপর্যায়ে পৌঁছেছে।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরেও নেতানিয়াহু বড় ধরনের চাপের মুখে রয়েছেন। এটি একটি নির্বাচনের বছর এবং তিনি যে ‘অস্তিত্বের হুমকি’ দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা রয়ে গেছে আগের মতোই। হ্যারেৎজ-এর সামরিক বিষয়ক সংবাদদাতা আমোস হারেল লিখেছেন, "নেতানিয়াহুর যুদ্ধ পরিকল্পনার মধ্যেই ব্যর্থতা লুকিয়ে ছিল। বিশেষজ্ঞদের মতামত উপেক্ষা করে কেবল রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার ওপর ভিত্তি করে এই পরিকল্পনা সাজানো হয়েছিল।"
পরিশেষে, নেতানিয়াহুর জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা হলো যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ সমর্থনে বড় পরিসরে সামরিক অভিযানের যে সুযোগ তিনি পেয়েছিলেন, তা তিনি কাজে লাগাতে পারেননি। ডোনাল্ড ট্রাম্প স্থল সেনা মোতায়েন বা যুদ্ধের চরম উত্তেজনার মুহূর্তে পিছু হটেছেন, যা প্রমাণ করে যে নেতানিয়াহু হয়তো আর কখনোই আমেরিকার কাছ থেকে এমন সর্বাত্মক সমর্থনের ‘সুযোগ’ পাবেন না। গাজা, লেবানন এবং এখন ইরান নেতানিয়াহুর ‘চূড়ান্ত বিজয়’-এর প্রতিটি প্রতিশ্রুতিই আজ ফাঁপা বলে প্রমাণিত হয়েছে।

