কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির বিশ্বব্যাপী একাধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো অত্যাধুনিক সেমিকন্ডাক্টর চিপের সহজলভ্যতা। তবে পর্দার আড়ালে চীন এমন এক গোপন হাতিয়ার তৈরি করছে, যা এই প্রতিযোগিতার সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে। বেইজিংয়ের সেই তাসের টেক্কাটি হলো তাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ এবং অবিশ্বাস্য রকমের সস্তা বিদ্যুৎ শক্তি। এআই মডেলগুলো সচল রাখতে যে বিশাল ডেটা সেন্টারের প্রয়োজন হয়, তার জন্য এই সস্তা ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ চীনের জন্য সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
বিশাল কম্পিউটিং ক্ষমতাসম্পন্ন এই ডেটা সেন্টারগুলো মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রশিক্ষণ ও পরিচালনায় ব্যবহৃত হয়, যা সচল রাখতে দরকার পড়ে কল্পনাতীত জ্বালানি। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, একটি সাধারণ ডেটা সেন্টার সচল রাখতেই প্রায় এক লাখ পরিবারের সমান বিদ্যুৎ খরচ হয়। অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের অতি-বৃহৎ (হাইপারস্কেল) সুবিধা সম্পন্ন কেন্দ্রগুলোতে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় বিশ লাখ পরিবারের মোট চাহিদার সমান। এমন বিশাল শক্তির জোগান দিতে চীন তাদের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যবস্থাকে অভাবনীয় স্তরে নিয়ে গেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ।
খাত সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, আগামী পাঁচ বছরে চীনের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অন্তত ছয় গুণ বৃদ্ধি পাবে। এই বাড়তি সক্ষমতার সিংহভাগই আসবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে। ইতিমধ্যে গত বছরই চীন বিশ্বজুড়ে যুক্ত হওয়া মোট সবুজ জ্বালানির অর্ধেকের বেশি একা উৎপাদন করেছে। নিজেদের এই শক্তির উৎসকে সরাসরি এআই খাতের সঙ্গে যুক্ত করতে বেইজিং অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী কৌশল হাতে নিয়েছে, যা তাদের পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রত্যন্ত অঞ্চলের সস্তা জমির প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগাচ্ছে।
চীনের এই মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে সম্প্রতি দেশটির নিংক্সিয়া অঞ্চলে একটি বৃহৎ আকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প সরাসরি একটি ক্লাউড ডেটা সেন্টারের সাথে যুক্ত করা হয়েছে। 'ইস্ট ডেটা, ওয়েস্ট কম্পিউটিং' উদ্যোগের আওতায় বেইজিং মূলত জনবহুল পূর্ব উপকূলের পরিবর্তে দেশের পশ্চিমাঞ্চলে ডেটা সেন্টার তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে যে দেশ সস্তা, স্থিতিশীল এবং কম কার্বন নির্গমনকারী বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারবে, তথ্যপ্রযুক্তির অবকাঠামো নির্মাণে তারাই সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। এই মুহূর্তে চীন সৌর, বায়ু এবং আল্ট্রা-হাই-ভোল্টেজ বিদ্যুৎ সঞ্চালনে বৈশ্বিক নেতৃত্ব দিচ্ছে।
অবশ্য সংখ্যার বিচারে ডেটা সেন্টারের বৈশ্বিক পদচারণায় যুক্তরাষ্ট্র এখনো অনেক এগিয়ে রয়েছে। গত বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার ডেটা সেন্টার রয়েছে, সেখানে চীনে এই সংখ্যা মাত্র সাড়ে চারশর কাছাকাছি। এমনকি সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি জায়ান্ট যেমন অ্যামাজন, মাইক্রোসফট, মেটা এবং অ্যালফাবেট এই খাতে যে পরিমাণ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে, তা আলিবাবা বা টেনসেন্টের মতো চীনা জায়ান্টদের তুলনায় বহুগুণ বেশি। তবে চীন যেভাবে প্রতি বছর ৩০ শতাংশ হারে তাদের ডেটা সেন্টারের পরিধি বাড়াচ্ছে, তাতে দুই পরাশক্তির এই ব্যবধান খুব দ্রুত ঘুচে আসছে।
পরাশক্তিদের এই লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের জন্য এখন চিপের চেয়েও বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্যুৎ গ্রিডের সীমাবদ্ধতা। মার্কিন বিদ্যুৎ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে সেখানে নতুন ডেটা সেন্টার প্রকল্পের হার প্রায় অর্ধেক নেমে গেছে এবং স্থানীয় পর্যায়ে তীব্র জনরোষের কারণে অনেক প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। চীনের ক্ষেত্রে এমন কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক বাধা নেই, যা তাদের অবকাঠামো নির্মাণকে শ্লথ করতে পারে। মার্কিন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্কও অকপটে স্বীকার করেছেন যে, এআই প্রযুক্তির প্রসারে মূল বাধা এখন চিপ নয় বরং বিদ্যুৎ শক্তি এবং এই ক্ষেত্রে চীনের প্রবৃদ্ধি অবিশ্বাস্য রকমের তীব্র।
তবে চীনের এই চোখধাঁধানো অগ্রযাত্রার পেছনেও কিছু বড় সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। বেইজিং তাদের পশ্চিমাঞ্চলে সবুজ জ্বালানি ও ডেটা সেন্টার গড়তে চাইলেও এখনো বেশিরভাগ মূল কেন্দ্র বেইজিং বা সাংহাইয়ের মতো পূর্বের মেগাসিটিগুলোতেই কেন্দ্রীভূত রয়ে গেছে। উপরন্তু, চীনের বিদ্যুৎ গ্রিড ব্যবস্থা এখনো প্রাদেশিক স্তরে বিভক্ত হওয়ায় এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে বিদ্যুৎ সঞ্চালন বেশ জটিল ও ধীরগতির। একই সাথে তড়িঘড়ি করে তৈরি করা অবকাঠামোর কারণে কিছু ডেটা সেন্টারের নির্মাণশৈলী ও গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
সব মিলিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই বিশ্বজয়ের লড়াইকে একটি ভিন্ন আঙ্গিকে দেখছেন প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পর্যাপ্ত চিপ থাকলেও তারা তীব্র বিদ্যুৎ সংকটে ভুগছে, অন্যদিকে চীনের কাছে বিপুল পরিমাণ সস্তা বিদ্যুৎ থাকলেও তারা উন্নত চিপের সংকটে রয়েছে।
কেনিয়ায় স্কুলে অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ১৬ শিক্ষার্থী নিহত
তারেক রহমানকে নরেন্দ্র মোদির ঈদের শুভেচ্ছা
মুসলিমদের ঈদুল আজহার শুভেচ্ছা জানালেন পুতিন