ট্রাম্পের হাত ধরে ‘বাসের নিচে’ চাপা পড়ছে ইসরায়েল

আপডেট : ৩১ মে ২০২৬, ০২:২৭ পিএম

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন ইসরায়েলি ও মার্কিন ফাইটার জেটগুলো একযোগে ইরানের ওপর তীব্র হামলা চালায়, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একে অপরের ‌‘ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত’ উদযাপন করেছিলেন। নেতানিয়াহু তখন ইসরায়েলিদের আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, দুই দেশের মিত্রতা এর আগে কখনো এতটা মজবুত ছিল না। তবে এর মাত্র তিন মাস পর, একটি যৌথ সামরিক অভিযান হিসেবে যা শুরু হয়েছিল, তা এখন মার্কিন নেতৃত্বাধীন একটি কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় রূপ নিতে যাচ্ছে, যেখানে নেতানিয়াহু নিজেকে পুরোপুরি একপাশে ছিটকে পড়া অবস্থায় দেখছেন।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী অবশ্য প্রকাশ্যে ট্রাম্পের কোনো সমালোচনা করছেন না। তবে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ইসরায়েলি সূত্রগুলো জানাচ্ছে, নেতানিয়াহু নিজেই স্বীকার করেছেন যে যুদ্ধ বন্ধে মার্কিন-ইরান আলোচনার ফলাফলের ওপর ইসরায়েলের প্রভাব এখন অত্যন্ত সীমিত। গত এপ্রিলে প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে নেতানিয়াহু বারবার ট্রাম্পকে পূর্ণমাত্রায় সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু করার জন্য চাপ দিয়ে আসছিলেন। তার যুক্তি ছিল, ক্রমাগত চাপ ধরে রাখলে ইরানি শাসনের পতন ঘটানো সম্ভব। কিন্তু হোয়াইট হাউস স্পষ্টতই উল্টো পথে হেঁটেছে। এখন ইসরায়েলি নীতিনির্ধারকদের মূল ভয় হলো, ওয়াশিংটনের উদীয়মান এই চুক্তিটি ইসরায়েলের প্রধান উদ্বেগের জায়গাগুলোকে যেমন ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত, তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক কোনো সমাধান ছাড়াই রেখে দেবে, অথচ তেহরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, ট্রাম্প হয়তো একটি ‘খারাপ অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি’ মেনে নিতে যাচ্ছেন। চুক্তি অনুযায়ী যদি ইরান থেকে ইউরেনিয়াম পুরোপুরি সরিয়ে নেওয়া হয়, তবেই কেবল তা মানা সম্ভব। কিন্তু এটি যদি কেবল একটি মৌখিক বা লিখিত ইচ্ছার বিবৃতি হয়, তবে ইরানিরা মার্কিনিদের ধোঁকা দিয়ে শেষ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম নিজেদের কাছেই রেখে দিতে পারে। অথচ ইরান শুরু থেকেই স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তাদের উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভাগ্য এই অন্তর্বর্তী চুক্তির আলোচনার অংশ নয়। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রথমে ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তরের কথা বললেও, সম্প্রতি এই বিষয়ে বেশ নমনীয় মনোভাব দেখাচ্ছেন, যা ওয়াশিংটন ও জেরুজালেমের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথকেই প্রশস্ত করবে।

পরিস্থিতি এতটাই বদলেছে যে, ক্ষুব্ধ এক ইসরায়েলি সূত্র সোজাসুজি মন্তব্য করেছে ট্রাম্পের মতো মিত্রের হাত ধরে এভাবে ‘বাসের নিচে চাপা পড়ার’ অনুভূতি সত্যিই নজিরবিহীন। এর বাইরে আরেকটি বড় জটিলতা তৈরি হয়েছে লেবাননকে ঘিরে। ইরান চাইছে এই চুক্তির আওতায় লেবাননেও যেন যুদ্ধবিরতি অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যেখানে ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলি সামরিক পদক্ষেপের ওপর লাগাম টেনে ধরেছে। এদিকে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলি সেনা ও উত্তর সীমান্তের শহরগুলোতে ড্রোন হামলা আরও বাড়িয়েছে। মার্কিন এই সীমাবদ্ধতা নেতানিয়াহুর ওপর নিজ দেশের ভেতর থেকেও রাজনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে তার জোট সরকারের কট্টরপন্থী শরিক ইতামার বেন গভির ও বেজালেল স্মোট্রিচ আরও আক্রমণাত্মক সামরিক জবাবের দাবি তুলছেন। বেন গভির তো নেতানিয়াহুকে সরাসরি ট্রাম্পের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ইসরায়েলের অবস্থান স্পষ্ট করার আহ্বান জানিয়েছেন।

তবে এই চুক্তিতে ইসরায়েল চরম অসন্তুষ্ট হলেও নেতানিয়াহুর প্রতিক্রিয়া এবার বেশ মৃদু। ২০১৫ সালে ওবামা প্রশাসনের সময় করা ইরান পারমাণবিক চুক্তির বিরুদ্ধে নেতানিয়াহু যেভাবে মার্কিন কংগ্রেসে গিয়ে সরাসরি যুদ্ধংদেহী ভাষণ দিয়েছিলেন, ট্রাম্পের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ আর নেই। ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কের পেছনে নেতানিয়াহু তার রাজনৈতিক পুঁজির সিংহভাগ ঢেলে দিয়েছেন। ফলে আসন্ন নির্বাচনের আগে ট্রাম্পকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করা তার জন্য চরম রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করবে। সে কারণেই নেতানিয়াহু কৌশলে সমস্ত দোষ চাপাচ্ছেন মার্কিন আলোচনাকারী দল, বিশেষ করে জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফের ওপর। নেতানিয়াহু-পন্থী ইসরায়েলি গণমাধ্যমগুলো এখন মার্কিন আলোচনা দলের তীব্র সমালোচনা করছে, যাতে প্রধানমন্ত্রীর গায়ে সরাসরি কোনো আঁচ না লাগে।

অবশ্য ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, ইসরায়েল আসলে পুরো পরিস্থিতি ভুল হিসাব করেছিল। তারা ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের আশায় এতটাই মশগুল ছিল যে, এই যুদ্ধ খোদ ওয়াশিংটনেই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটাতে পারে তা বুঝতে পারেনি। ট্রাম্প বুঝতে পেরেছিলেন যে ‘নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যের একটি বড় যুদ্ধে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন’ এমন বয়ান তার নিজের ঘরোয়া রাজনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হচ্ছে। তাই ট্রাম্প নিজেই নিয়ন্ত্রণ নিতে বাধ্য হন এবং সম্প্রতি এক মন্তব্যে তা স্পষ্ট করে বলেন, নেতানিয়াহু একজন ভালো মানুষ এবং ট্রাম্প যা বলবেন তিনি ঠিক তা-ই করবেন। গাজা, ইরান বা লেবানন সবখানেই দেখা গেছে নেতানিয়াহু যখনই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে চেয়েছেন, ট্রাম্প তখনই সেখানে ‘টাইম আউট’ বা বিরতি টেনে দিয়েছেন।

নেতানিয়াহুর সাবেক সহকর্মীরা বলছেন, তিনি (নেতানিয়াহু) কখনোই জানেন না কখন থামতে হয় এবং লোকসান মেনে নিয়ে সরে আসতে হয়। তার সমালোচকদের প্রধান অভিযোগ হলো, নেতানিয়াহু সামরিক বা কৌশলগত সাফল্যগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক বা স্ট্র্যাটেজিক লাভে রূপান্তর করতে ব্যর্থ। আর এ কারণেই ইরানের শাসনব্যবস্থা এখনো বহাল তবিয়তে আছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি অমীমাংসিত এবং হিজবুল্লাহ বা হামাসের মতো প্রক্সি সংগঠনগুলো এখনো সক্রিয় রয়ে গেছে। এই যুদ্ধ নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকেও সংকটে ফেলেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর নিজের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করতে তিনি ইরান অভিযানকে তার রাজনৈতিক ‘লেগেসি’ বা কীর্তির মূল স্তম্ভ বানাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক জনমত জরিপ বলছে, প্রায় ৪৫ শতাংশ ইসরায়েলি মনে করেন ইরানের সঙ্গে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে এবং প্রায় অর্ধেক নাগরিক বিশ্বাস করেন এই যুদ্ধে ইসরায়েল জিততে পারবে না।

ক্ষতিপূরণ হিসেবে ট্রাম্প হয়তো সৌদি আরবের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য অব্রাহাম অ্যাকর্ডস সম্প্রসারণের চেষ্টা করছেন, তবে নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থী জোটের অনড় অবস্থানের কারণে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের শর্ত মেনে সৌদি আরবের সঙ্গে এমন চুক্তি হওয়া সুদূরপরাহত। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি নেতানিয়াহুর তিন দশকের রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর এক বড় আঘাত। যিনি নিজেকে সব সময় ‘মিস্টার ইরান’ বা ইরানের বিরুদ্ধে একমাত্র কঠোর রক্ষাকর্তা হিসেবে জাহির করে এসেছেন, তাকে এখন এমন একটি চুক্তি মেনে নিতে হচ্ছে যা কেবল তার আজীবনের ইরান-নীতিকেই ধূলিসাৎ করছে না, বরং তার চিরশত্রু তেহরান প্রশাসনকেই একপ্রকার বৈধতা এনে দিচ্ছে।

সূত্র: সিএনএন

NB
আরও পড়ুন