জাম্বুরা দিয়ে ফুটবল খেলার অভিজ্ঞতা আজকের তরুণদের ভাগ্যে জোটেনি। কোরবানির গরুর মূত্রথলি ফুলিয়ে তৈরি করা বলের কথাও অনেকের অজানা। মধ্যযুগীয় ইংল্যান্ডে ফুটবলের শিকড়—সে সময় বল বানানো হতো পশুর চামড়ার ভেতরে শ্যাওলা বা কর্কের গুঁড়ো ভরে। কিংবা শুকনো শূকরের মূত্রথলি চামড়া দিয়ে মুড়ে। বলগুলো পুরোপুরি গোল হতো না, আকারেও ছিল নানারকম। উনবিংশ শতাব্দীতে ফুটবল নিয়মতান্ত্রিক রূপ পেলেও বলের আকার-ওজনের সুনির্দিষ্ট নিয়ম ছিল না। পরে পরিধি ঠিক হয় ৬৮-৭০ সেন্টিমিটার এবং ওজন ৪১০-৪৫০ গ্রাম। মজার ব্যাপার—এই মাপ আজও অপরিবর্তিত।
ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিবর্তিত হয়েছে এর অবিচ্ছেদ্য অংশ—ফুটবল। বলগুলিতে এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন, যা মূলত ফুটবলের একেকটি নতুন যুগের প্রতিফলন। ১৯৩০ সালের সেই ভারী, হাতেসেলাই করা চামড়ার বল থেকে শুরু করে আজকের বলগুলো হয়ে উঠেছে উচ্চপ্রযুক্তিসম্পন্ন, কৃত্রিম ও টেকসই উপাদানে নির্মিত। এই বিবর্তনের পথে উল্লেখযোগ্য উদ্ভাবন হলো—১৯৭০ সালে টেলিভিশনে স্পষ্ট দেখার সুবিধার্থে প্রবর্তিত ‘অ্যাডিডাস টেলস্টার’, ২০০৬ সালে সেলাইবিহীন বল তৈরিতে ‘থার্মাল বন্ডিং’ প্রযুক্তি এবং বর্তমানে রেফারির নিখুঁত সিদ্ধান্তে সহায়তার জন্য এআই-চালিত ডেটা প্রযুক্তি।
ভারী চামড়ার যুগ (১৯৩০-১৯৬৬)
অমসৃণ, অনিশ্চিত আর শারীরিক সক্ষমতার চরম পরীক্ষা—বিশ্বকাপ ফুটবলের শুরুর দিকের বলগুলো ছিল ঠিক এমনই। ১৯৩০ সালে ব্যবহৃত ‘টি-মডেল’-এর মতো প্রথম দিকের বলগুলো তৈরি হতো গরুর ভারী চামড়া দিয়ে। ভেতরের ব্লাডার আটকাতে ব্যবহার হতো তুলোর মোটা ফিতে বা লেস। বৃষ্টির দিনে চামড়ার বল পানি শুষে নিয়ে ওজনে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যেত। ফলে সেই ভেজা ও ভারী বল হেড করতে গিয়ে প্রায়ই ‘কনকাশন’ বা মারাত্মক চোট পেতেন ফুটবলাররা।

তবে বিবর্তনের ধারায় ১৯৬২ সালের 'মিস্টার ক্র্যাক' বলটি ছিল বড় উদ্ভাবন। এটিই প্রথম বল যাতে ল্যাটেক্স ভালভ ব্যবহার করা হয়, যা বলের গোলাকৃতি দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখতে সাহায্য করত।
এই যুগের বলগুলো:
১৯৩০ (উরুগুয়ে): তিয়েন্তো (ফাইনালের প্রথমার্ধ) ও টি-মডেল (দ্বিতীয়ার্ধ)
১৯৩৪ (ইতালি): ফেদেরালে ১০২
১৯৩৮ (ফ্রান্স): অ্যালেন
১৯৫০ (ব্রাজিল): সুপারবল ডুপ্লো টি (বাইরে ফিতে বা লেস ছাড়া প্রথম ফুটবল)
১৯৫৪ (সুইজারল্যান্ড): সুইস ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন
১৯৫৮ (সুইডেন): টপ স্টার
১৯৬২ (চিলি): মিস্টার ক্র্যাক
১৯৬৬ (ইংল্যান্ড): চ্যালেঞ্জ ৪-স্টার
টেলস্টার ও দৃশ্যমানতার বিপ্লব (১৯৭০-১৯৮২)
১৯৭০ সাল ফুটবল ইতিহাসের বাঁকবদল। সেবারই প্রথম অফিসিয়াল বল সরবরাহের দায়িত্ব পায় অ্যাডিডাস। এর আগ পর্যন্ত বিশ্বকাপের আয়োজক দেশই বল তৈরির দায়িত্ব পেত।অ্যাডিডাস বাজারে আনে বিখ্যাত 'টেলস্টার'—৩২টি প্যানেলে তৈরি সাদা-কালো চিরচেনা বল। ‘টেলিভিশন স্টার’ থেকেই এর নামকরণ। সাদা-কালো টেলিভিশনের পর্দায় বলের গতিবিধি স্পষ্ট দেখাতেই এই নকশা। বল তখনও চামড়ার ছিল, তবে তাতে ব্যবহার হয় ‘ডিউরালাস্ট’ কোটিং, যা পানি নিরোধক হিসেবে কাজ করত।

১৯৭৪ সালের 'টেলস্টার ডিউরালাস্ট'-এ যুক্ত হয় পলিইউরেথেন কোটিং, ফলে কাদা বা পানিতে বল ভিজে ভারী হতো না। ১৯৭৮ সালের 'ট্যাঙ্গো' বলের নকশায় আসে ২০টি প্যানেলের ‘ট্রায়াড’ ডিজাইন, যা পরবর্তী ২০ বছর টেমপ্লেটের কাজ করে।
এই যুগের বলগুলো:
১৯৭০ (মেক্সিকো): টেলস্টার
১৯৭৪ (পশ্চিম জার্মানি): টেলস্টার ডিউরালাস্ট
১৯৭৮ (আর্জেন্টিনা): ট্যাঙ্গো
১৯৮২ (স্পেন): ট্যাঙ্গো এসপানা
সিন্থেটিক যুগ (১৯৮৬-২০০২)
১৯৮৬ সালের ‘আজতেকা’ বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম সম্পূর্ণ সিন্থেটিক ম্যাচ বল। চামড়া বাদ দিয়ে পলিইউরেথেন ব্যবহারে বল পানি নিরোধক হয় এবং গোলাকৃতি দীর্ঘস্থায়ী হয়। ১৯৯৪-এর 'কুয়েস্ট্রা' বলের পলিস্টাইরিন ফোমের স্তর স্পর্শে বলকে নরম ও গতিতে বাড়িয়ে দেয়। এই যুগেই ফুটবলের ‘সাদা-কালো’ শাসনের অবসান ঘটে।
১৯৯৮ সালের ‘ত্রিকোলোর’ প্রথম রঙিন ম্যাচ বল—ফ্রান্সের পতাকার আদলে লাল, সাদা ও নীল নকশা। ২০০২-এর 'ফিভারনোভা' এশিয়ান সংস্কৃতির অনুপ্রেরণায় বর্ণিল ত্রিকোণাকার নকশায় পুরনো ধারণা ভেঙে দেয়।
এই যুগের বলগুলো:
১৯৮৬ (মেক্সিকো): আজতেকা
১৯৯০ (ইতালি): এত্রুস্কো ইউনিকো
১৯৯৪ (যুক্তরাষ্ট্র): কুয়েস্ট্রা
১৯৯৮ (ফ্রান্স): ত্রিকোলোর
২০০২ (দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান): ফিভারনোভা
ডিজিটাল ও অ্যারোডাইনামিক যুগ (২০০৬-বর্তমান)
২০০৬ সালের ‘টিমজিস্ট’-এ প্রথম ‘থার্মাল বন্ডিং’ প্রযুক্তি আসে, যা সেলাইবিহীন মসৃণ পৃষ্ঠ তৈরি করে। ২০১৪-এর 'ব্রাজুকা' এবং ২০১৮-এর 'টেলস্টার ১৮'-এ প্যানেল সংখ্যা ৩২ থেকে কমিয়ে ৬ করা হয়, যা উড্ডয়ন স্থিতিশীলতা বাড়ায়।
২০২২ সালের ‘আল রিহলা’ ও ২০২৬ সালের ‘ট্রিওন্ডা’—উভয় বলেই ৫০০ হার্টজ আইএমইউ সেন্সর রয়েছে। এই চিপ প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার বলের স্পর্শ ট্র্যাক করে ভিএআর-এ রিয়েল-টাইম ডেটা পাঠায়, যা অফসাইডের মতো সিদ্ধান্ত প্রায় নিখুঁত করে।

এই যুগের বলগুলো:
২০০৬ (জার্মানি): টিমজিস্ট
২০১০ (দক্ষিণ আফ্রিকা): জাবুলানি
২০১৪ (ব্রাজিল): ব্রাজুকা
২০১৮ (রাশিয়া): টেলস্টার ১৮
২০২২ (কাতার): আল রিহলা
২০২৬ (যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা): ট্রিওন্ডা
বর্তমান বলের ডিজাইনে প্যানেল কমে এসেছে চারটিতে। বিজ্ঞানীরা বলের গায়ে খাঁজকাটা টেক্সচার দিয়ে বাতাসের খামখেয়ালিপনা সামাল দিয়েছেন। পদার্থবিদ জন এরিক গফের ভাষায়, ‘খেলোয়াড়েরা চান বল যেন অপ্রত্যাশিত আচরণ না করে।’

জাম্বুরার দিন শেষ হয়েছে সত্যি, কিন্তু নিখুঁত বল বানানোর লড়াই এখনও চলছে। আর প্রযুক্তির হাত ধরে সেই বল ছুটে চলেছে নতুন নতুন গোলপোস্টের দিকে।
ব্রাজিল ভক্তদের জন্য স্বস্তির খবর
মেসির শেষ সুযোগ, সেরা সময়ে এমবাপ্পে