হাইতি আর গ্যাংস্টারদের ফুটবল উন্মাদনা

আপডেট : ১৩ জুন ২০২৬, ০৫:৫৯ পিএম

দুই দশক আগে ব্রাজিলের এক প্রীতি ম্যাচের জন্য থমকে গিয়েছিল হাইতির রাজধানী পোর্ট-অব-প্রিন্স। গুলির শব্দ থেমেছিল, রাস্তায় নেমেছিল হাজারো মানুষ। এবার আবারও ফুটবল সেই দেশটিকে নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে। তবে এবার দর্শক হিসেবে নয়, বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেদের দলকে নিয়েই উচ্ছ্বসিত হাইতির মানুষ।

রাজনৈতিক অস্থিরতা, গ্যাং সহিংসতা এবং দীর্ঘ মানবিক সংকটের মধ্যেও বিশ্বকাপ ঘিরে দেশটিতে তৈরি হয়েছে উৎসবের আবহ। গ্রুপ পর্বে ব্রাজিল, স্কটল্যান্ড ও মরক্কোর সঙ্গে একই গ্রুপে পড়েছে হাইতি। বিশ্বকাপ শুরুর আগে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে টাঙানো হয়েছে জাতীয় পতাকা, পরিষ্কার করা হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। বিদ্যুতের তীব্র সংকট থাকা সত্ত্বেও খেলা দেখার জন্য নানা বিকল্প ব্যবস্থাও করছেন সমর্থকরা।

হাইতির ইতিহাসে এটিই মাত্র দ্বিতীয় বিশ্বকাপ। ১৯৭৪ সালের পর এবারই আবার ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরে খেলছে ক্যারিবীয় দেশটি।

হাইতির সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা ডুকেন্স নাজঁ বলেন, জাতীয় দলের জার্সি গায়ে তোলা তাদের কাছে শুধুই একটি ম্যাচ নয়, বরং দেশের ইতিহাস ও পরিচয় বহনের দায়িত্ব।

তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বের প্রথম স্বাধীন কৃষ্ণাঙ্গ রাষ্ট্র। আমাদের ইতিহাস আছে, দায়িত্বও আছে। মাঠে নামলে আমরা শুধু নিজেদের জন্য খেলি না।’

দেশটির বর্তমান বাস্তবতা অবশ্য কঠিন। গ্যাং সহিংসতার কারণে গত পাঁচ বছর ধরে নিজেদের মাটিতে কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে পারেনি হাইতি। জাতীয় স্টেডিয়ামও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। ফলে ‘হোম ম্যাচ’ খেলতে হচ্ছে প্রায় ৫০০ মাইল দূরের কারাকাও-এ।

জাতীয় দলের বেশিরভাগ খেলোয়াড়ই বিদেশে জন্ম নেওয়া বা বিদেশি লিগে খেলা। ২৬ সদস্যের স্কোয়াডের ফুটবলাররা ১৫টি দেশের ২৫টি ক্লাবের প্রতিনিধিত্ব করছেন। এমন বাস্তবতায়ও দলটিকে এক সুতোয় গেঁথেছেন ফরাসি কোচ সেবাস্তিয়ান মিগনে।

বিশ্বকাপে জায়গা পাওয়ার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে উদযাপনের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে গ্যাং সদস্য ও সাধারণ মানুষকে একসঙ্গে আনন্দ করতে দেখা যায়। সেই স্মৃতি মনে করে নাজঁ বলেন, ফুটবল এমন এক শক্তি, যা মানুষকে সাময়িক হলেও বিভাজনের ঊর্ধ্বে নিয়ে যেতে পারে।

তেহরানের মতোই পোর্ট-অব-প্রিন্সেও এখন ফুটবলকে ঘিরে আশার আলো দেখছেন অনেকেই। হাইতির ক্রীড়া সাংবাদিক পিয়েরে রিচার্ড মিদি বলেন, ‘গ্যাং নেতারাও ফুটবল ভালোবাসে। বিশ্বকাপ নিশ্চিত হওয়ার পর তাদেরও রাস্তায় নেমে উদযাপন করতে দেখা গেছে।’

বিশ্বকাপের দ্বিতীয় ম্যাচে আবারও ব্রাজিলের মুখোমুখি হবে হাইতি। একসময় যে দলটিকে নিজেদের দল ভেবে সমর্থন দিত হাইতির মানুষ, এবার সেই ব্রাজিলের বিপক্ষেই মাঠে নামবে তাদের জাতীয় দল।

ডুকেন্স নাজঁ'র বিশ্বাস, সময় বদলেছে। এখন হাইতির মানুষের গর্ব করার মতো নিজস্ব একটি দল আছে।

তার ভাষায়, ‘মানুষ ব্রাজিলকে পছন্দ করতেই পারে। কিন্তু এখন তাদের নিজের একটি বিশ্বকাপ দল আছে। সেই দলকে নিয়েই গর্ব করার সময় এসেছে।’

গ্যাং সহিংসতা, দারিদ্র্য আর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার অন্ধকারের মধ্যেও তাই হাইতির কাছে বিশ্বকাপ শুধু ফুটবল নয়; এটি একতা, আশা এবং নতুন ভবিষ্যতের প্রতীক। সূত্র: বিবিসি

AS
আরও পড়ুন