খেলা শেষের শেষ বাঁশিটি বাজার সাথে সাথেই মাঠজুড়ে যখন কেপ ভার্দের ফুটবলারদের বন্য উল্লাস, ঠিক তখনই মাঠের সবুজ ঘাসে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন দলটির গোলরক্ষক ভোজিনিয়া। দু'হাতে মুখ ঢেকে অঝোরে কাঁদতে থাকা এই গোলরক্ষককে জড়িয়ে ধরে সতীর্থরা যখন সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন, তখন পুরো ফুটবল বিশ্ব দেখছিল এক অনন্য মানবিক উপাখ্যান।
২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম ফেবারিট স্পেনকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে দেওয়ার মূল কারিগর ৪০ বছর ১২ দিন বয়সী এই ফুটবলার। তবে এই অশ্রু শুধু আনন্দের ছিল না, এর পেছনে লুকিয়ে ছিল আজীবন লড়াই আর প্রিয়জনদের গ্যালারিতে না পাওয়ার এক তীব্র আকুতি।
ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে নিজের ভেতরের কষ্টটা আর চেপে রাখতে পারেননি ভোজিনিয়া। তিনি জানান, শৈশবে যাদের হাত ধরে বড় হয়েছিলেন, সেই দাদা-দাদি কয়েক বছর আগেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন। জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনের রাতে তাদের উপস্থিতি খুব বেশি মনে পড়ছিল তার।
একই সাথে মায়ের জন্য এক বুক কষ্ট চেপে ভোজিনিয়া বলেন, “আমি চেয়েছিলাম মা গ্যালারিতে বসে আমার জীবনের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি দেখুক। কিন্তু ভিসার জন্য যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন ছিল, দরিদ্রতার কারণে আমরা সময়মতো তা জোগাড় করতে পারিনি।”
মাঠে স্পেনের পেদ্রি, রদ্রি কিংবা লাপোর্তেদের মতো বিশ্বসেরা ও কোটি ইউরো মূল্যের তারকাদের একের পর এক আক্রমণ একাই নস্যাৎ করে দিয়েছেন ভোজিনিয়া। পুরো ম্যাচে স্পেনের অন্তত ৭টি নিশ্চিত গোলের সুযোগ রুখে দেন তিনি। অথচ পর্তুগিজ দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব চাভেসের হয়ে খেলা এই গোলরক্ষকের বাজারমূল্য মাত্র ৫০ হাজার ইউরো! এই অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সের সুবাদে অভিষেক ম্যাচেই কেপ ভার্দের ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক বিশ্বকাপ ফুটবলার হিসেবে ম্যাচসেরার পুরস্কার জিতে নেন তিনি।
ভোজিনিয়ার আজকের এই অবস্থানে আসার গল্পটা মোটেও সহজ ছিল না। কেপ ভার্দের মিন্দেলো দ্বীপে বড় হওয়ার সময় স্রেফ উচ্চতা কম হওয়ার অজুহাতে ভালো খেলেও বারবার দল থেকে বাদ পড়েছেন। ফলে ২৫ বছর বয়সে গিয়ে বেশ দেরিতে তার পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু হয়। একসময় হতাশায় ফুটবল ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও, বিশ্বকাপে খেলার অদম্য স্বপ্ন তাকে থামতে দেয়নি।
স্পেনকে রুখে দিয়ে কেপ ভার্দে যে এক পয়েন্ট অর্জন করেছে, তা যেমন ইতিহাসে লেখা থাকবে, তেমনি ভোজিনিয়ার এই অশ্রুসিক্ত মুখটি প্রমাণ করে দিল— ফুটবল শুধু ট্রফি, পরিসংখ্যান বা বাজারমূল্যের খেলা নয়; এটি ত্যাগ, পরিবার এবং অসম্ভবকে সম্ভব করার এক জীবন্ত রূপকথা।
৬৮ বছর পর বিশ্বকাপে এক দিনে চার ড্র
রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের পর ইরান–নিউজিল্যান্ডের ড্র