বিশ্বের সবচেয়ে বড় কাঁঠাল আমদানিকারক কেন চীন?

বাংলাদেশ থেকে কেন কাঁঠাল আমদানি করতে চায় চীন

আপডেট : ২৮ জুন ২০২৬, ০১:১৩ পিএম

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক সফরে চীনের সঙ্গে কাঁঠাল রপ্তানির বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছে বাংলাদেশ। এরপর থেকেই বিষয়টি নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে বাংলাদেশ থেকে কাঁঠাল আমদানিতে চীনের আগ্রহ অবশ্য নতুন নয়।

২০২৫ সালের মে মাসে চীন যখন বাংলাদেশ থেকে প্রথমবারের মতো কাঁচা আম আমদানি শুরু করেছিল তখনই কাঁঠাল ও পেয়ারার মতো ফল আমদানির আগ্রহের কথাও জানিয়েছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন, যা বাংলাদেশের বিভিন্ন পণ্য চীনে রপ্তানির বিষয়ে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে বলেই মনে করা হচ্ছে।

মাহদী আমিন জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে মোট ১৭টি মেমোরেন্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং বা এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়েছে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে। সেখানে অবকাঠামো, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল ইকোনমিসহ নানা বিষয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে কাঁঠাল নেওয়ার বিষয়টিও রয়েছে।

এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ থেকে চীনে কাঁঠাল রপ্তানির প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের পর্যায়ে পৌঁছেছে বলেই মনে করেন কৃষি অর্থনীতিবিদ এবং কৃষি পণ্য রপ্তানিখাত সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, কৃষিনির্ভর দেশ হলেও কৃষিপণ্য রপ্তানিতে খুব বেশি এগোতে পারেনি বাংলাদেশ।

চীনে কাঁঠাল বা কাঁঠালের তৈরি পণ্য রপ্তানির সুযোগ তৈরি হলে সেটি দেশের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে বলেও মনে করেন তারা।

এছাড়া কাঁঠাল রপ্তানির এই সুযোগ দেশের অন্যান্য কৃষি পণ্যের জন্যও নতুন বাজার তৈরিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলেই মনে করেন কৃষিপণ্য রপ্তানিখাত সংশ্লিষ্টরা।

অবশ্য কাঁঠাল বা কাঁঠালজাত খাদ্যদ্রব্য রপ্তানিতে পণ্যের মান, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং প্যাকেজিংয়ের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা না থাকায় বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের টোটাল কৃষি খাতের রপ্তানি এখনো তেমন ভালো নয়। আমরা যতটুকু রপ্তানি করি তার বেশিভাগই এথনিক মার্কেটে। কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে কোয়ালিটি মেইনটেইন না হওয়ায় ইউরোপিয়ান মার্কেটে এখনো আমরা তেমন ঢুকতে পারিনি।

প্রসঙ্গত, এথনিক মার্কেট বলতে এমন বাজারকে বোঝায় যা নির্দিষ্ট জাতি, গোষ্ঠী বা সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় কাঁঠাল আমদানিকারক চীন

কাঁঠাল মূলত এশিয়ার ফল হলেও বিশ্বজুড়ে এর শত কোটি ডলারের বাজার রয়েছে। বিশ্বব্যাপী কাঁঠাল রপ্তানি ২০১২ সালে যেখানে ২০০ কোটি মার্কিন ডলার ছিল, সেটা ২০২৩ সাল নাগাদ বেড়ে ৩৭০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।

ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, চীন ও ইকুয়েডর বিশ্বব্যাপী রপ্তানির ৬০ শতাংশের সঙ্গে জড়িত। শুধু ভিয়েতনামই বিশ্বব্যাপী কাঁঠাল বাজারের ২৫ শতাংশ দখল করে আছে।

এদিকে, চীন হলো কাঁঠালের সবচেয়ে বড় ভোক্তা বা আমদানিকারক। তারাও তাদের চাহিদার বড় অংশ পাশের দেশ ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড থেকেই পূরণ করে।

এদিকে, বাংলাদেশ হলো কাঁঠাল উৎপাদনকারী প্রধান দেশগুলোর অন্যতম। যদিও বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের হার কম।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈশ্বিক কাঁঠাল রপ্তানিতে বাংলাদেশের অংশ মাত্র ০ দশমিক ৩ শতাংশ।

যুক্তরাজ্য, ইতালি, কানাডা ও ফ্রান্স হলো প্রধান রপ্তানি গন্তব্য, যেখানে বাংলাদেশের কাঁঠাল রপ্তানির প্রায় ৮৫ শতাংশ যায়। এর সিংহভাগ (৭৬ শতাংশ) যায় যুক্তরাজ্যে।

ফলে চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে কাঁঠাল নিয়ে বাণিজ্যের একটি বড় সুযোগ রয়েছে।

অর্থনৈতিক সম্ভবনা কতটা?

বাংলাদেশে কাঁঠালের ব্যাপক উৎপাদন হলেও গ্রাহক পর্যায়ে এর জনপ্রিয়তা সীমিত। এছাড়া, স্থানীয়ভাবে এই ফল দিয়ে বিভিন্ন ধরনের পণ্য তৈরির ব্যবস্থা বা প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ তেমন উদ্যোগ না থাকায় উৎপাদিত কাঁঠালের বেশিরভাগই নষ্ট হয়।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ফল গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বাংলাদেশে আট থেকে ১০ লাখ মেট্রিক টন কাঁঠাল উৎপাদন হয়। কিন্তু অভ্যন্তরীণ চাহিদা কম থাকা এবং রপ্তানির সুযোগ তৈরি না হওয়ায় প্রতিবছর এর ৪৫ শতাংশেরও বেশি নষ্ট হয়।

ফল গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশে উৎপাদিত ফলের মধ্যে আম প্রথম, কলা দ্বিতীয় এবং তৃতীয় কাঁঠাল।’

কাঁঠালের বাণিজ্যিক গুরুত্ব থাকায় এর নতুন জাত উদ্ভাবন এবং এই ফল থেকে নানা ধরনের খাদ্যদ্রব্য তৈরির গবেষণা করেছেন বাংলাদেশের কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের কৃষিবিদরা।

কাঁঠাল ব্যবহার করে গবেষণাগারে ভেজিটেবল মিট, চিপস, আচার, জেলি, আইসক্রিম, কেকসহ বিভিন্ন ধরনের খাদ্যদ্রব্য তৈরি করছেন গবেষকরা। এমনকি কয়েক বছর আগে উদ্ভাবিত ‘কাঁঠালসত্ত্ব’ ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।

‘এখন পর্যন্ত কাঠালের ছয়টি জাত কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে উদ্ভাবন করা হয়েছে। বিশ্বে কাঁঠাল উৎপাদনে দ্বিতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ। ফলে এর রপ্তানির ক্ষেত্রে সম্ভাবনা রয়েছে,’ বলেন শফিকুল ইসলাম।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাঁঠাল দিয়ে তৈরি খাবারের জনপ্রিয়তা থাকায় এই পণ্যের ভালো সম্ভাবনা দেখছেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা।

তারা বলছেন, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপিন্স, ভিয়েতনামসহ দক্ষিণ এশিয়ার বেশ কিছু দেশে কাঁঠাল দিয়ে তৈরি নানা ধরনের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যদ্রব্যের জনপ্রিয়তা রয়েছে।

এছাড়া কৃষি অর্থনীতিতে এখনো পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশ কাঁঠালের মাধ্যমে অন্যান্য কৃষি পণ্যের জন্যও নতুন রপ্তানি বাজার তৈরি করতে পারে।

চীনের সঙ্গে কাঁঠাল রপ্তানির সমঝোতাকে বাংলাদেশের সার্বিক কৃষি অর্থনীতির জন্য বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ হিসেবেই দেখছেন কৃষি পণ্য রপ্তানিখাত সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘এর মাধ্যমে একটা বিজনেস চ্যানেলও তৈরি হবে, আমরা তো কিছু ফ্রুট রপ্তানি করি- এটি কৃষকদের জন্যও ভালো।’

রপ্তানির ক্ষেত্রে যেসব চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য না থাকার বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। দেশের মোট রপ্তানি পণ্যের বড় অংশই আসে পোশাক খাত থেকে।

অথচ কৃষি নির্ভর বাংলাদেশে কৃষি অর্থনীতির বড় সুযোগ থাকলেও নানা কারণে সেটি কখনই খুব একটা এগোতে পারেনি। এক্ষেত্রে নীতিগত ও আইনগত কিছু জটিলতার কারণে এ খাত এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি বলেই মনে করেন কৃষি অর্থনীতিবিদ এবং রপ্তানি খাত সংশ্লিষ্টরা।

মূলত কৃষি পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে এর উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাত করা পর্যন্ত পুরোটাই গুরুত্বপূর্ণ।

কাঁঠাল কিংবা কাঁঠালজাত খাদ্যদ্রব্য রপ্তানির ক্ষেত্রে এখানেই সবথেকে বড় বাধা দেখছেন বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-বেজড প্রোডাক্টট প্রডিউসারস অ্যান্ড মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ রুহুল আমিন।

তিনি বলেন, ‘কাঁঠাল দিয়ে তৈরি পণ্য কয়েকটি দেশে রপ্তানি হচ্ছে, কিন্তু চীন কীভাবে নেবে সেটি হলো প্রশ্ন। কারণ কাঁঠাল সংরক্ষণ করা এবং পরিবহনের ক্ষেত্রে কিছু ঝুঁকি আছে।’

এক্ষেত্রে চীন যদি বিনিয়োগ করে বা প্রক্রিয়াজতকরণের ক্ষেত্রে কারিগরি সহায়তা দেয় তাহলে বিষয়টি সহজ হবে বলেও মনে করেন তিনি।

কাঁঠাল থেকে খাদ্যদ্রব্য (যেমন- চিপস্, আচার, জেলি) তৈরি এবং প্রক্রিয়াজাত করার একটি উদ্যোগ অতীতে তাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে নেওয়া হলেও নানা জটিলতায় সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি।

‘বাংলাদেশেই কারখানা করে কাঁঠাল থেকে চিপস বা অন্য খাদ্যদ্রব্য তৈরির পদক্ষেপ আমরা নিয়েছিলাম। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গেও রপ্তানির বিষয়ে আমাদের কথা হয়েছিল। কিন্তু শেষমেষ এটা আর হয়নি,’ বলেন তিনি।

কেবল চীন নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশেও বাংলাদেশ থেকে কাঁঠাল দিয়ে তৈরি খাদ্যদ্রব্য রপ্তানির সুযোগ রয়েছে বলেও মনে করেন মি. রুহুল আমিন।

কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কৃষিপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে এর মান এবং প্রসেসিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই মার্কেটে ঢোকার আগে এ বিষয়ে প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ তাদের।

কৃষিপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষেত্রে সরকারের বিনিয়োগ আরও বাড়ানোর কথা বলেছেন কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম। অবশ্য চীনের সঙ্গে কাঁঠালের বিষয়ে হওয়া সমঝোতা এই পণ্যের উৎপাদন এবং রপ্তানির সুযোগ বাড়িয়েছে বলেও মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘চীন যখন আমাদের সঙ্গে কাঁঠাল আমদানির চুক্তিতে যাবে তখন তার প্রসেসের ক্ষেত্রে তারা নিশ্চয়ই টেকনিক্যাল হেল্পও করবে। এছাড়া এই সুযোগে আমরাও এমন কিছু টেকনোলজিও শিখতে পারবো যা দিয়ে আমাদের লোকাল মার্কেটেও সেগুলো কাজে লাগাতে পারবো।’

তবে স্থানীয় চাহিদার বিষয়টিও মাথায় রাখতে বলছেন এই কৃষি অর্থনীতিবিদ। ‘আমরা যখন সুযোগ পাই, তিনগুণ দাম পাই- তখন সবই দেশের বাইরে পাঠানোর চেষ্টা করি। দেশিয় চাহিদা এবং নিউট্রিশনকেও গুরুত্ব দিতে হবে,’ বলেন তিনি।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

AM/SN
আরও পড়ুন