সাগরে নিখোঁজ ৫৩০ রোহিঙ্গার ভাগ্যে কী ঘটেছে?

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২৬, ১২:২৯ পিএম

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে সমুদ্রপথে পালিয়ে যাওয়া অন্তত ৫৩০ রোহিঙ্গা আশ্রয়প্রার্থীর কোনো খোঁজ মিলছে না। গত ২৯ জুন দুটি নৌকায় তারা যাত্রা শুরু করেন। প্রায় তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও তাদের অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

মানবাধিকার সংগঠন “আরাকান প্রজেক্ট”-এর পরিচালক ক্রিস লেয়ারের মতে, দুটি নৌকাই ২৯ জুন রাখাইনের সিন তেত মাও গ্রাম থেকে ছেড়ে যায়। একটি সকালে এবং অন্যটি দিনের পরে যাত্রা শুরু করে। নৌকাগুলোর গন্তব্য ছিল মিয়ানমারের দক্ষিণ উপকূল। সেখান থেকে যাত্রীদের স্থলপথে থাইল্যান্ড হয়ে মালয়েশিয়ায় নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। সাধারণত যাত্রার এক সপ্তাহ থেকে ১০ দিনের মধ্যে পরিবারগুলোর সঙ্গে তাদের যোগাযোগ হয়। কিন্তু প্রায় তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও কোনো বার্তা পাওয়া যায়নি।

ধারণা করা হচ্ছে, বৈরী আবহাওয়ার কারণে নৌকা দুটি ডুবে গেছে এবং এতে প্রাণহানির আশঙ্কাই বেশি। রাখাইনে বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ায় সমুদ্র উত্তাল রয়েছে। সাধারণত পুরোনো মাছ ধরার ট্রলারকে অতিরিক্ত যাত্রী বহনের উপযোগী করে এসব যাত্রায় ব্যবহার করা হয়। নৌকাগুলো প্রায়ই অচল বা অনির্ভরযোগ্য ইঞ্জিনে চলাচল করে, ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি থাকে। নিখোঁজদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক নারী ও শিশু ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের উপকূলে সমুদ্র থেকে ভেসে আসা এক রোহিঙ্গা নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া ইরাবতী বদ্বীপ ও মোন রাজ্যের উপকূলবর্তী সাগরে মাছ ধরার সময় জেলেরা আরও কয়েকটি মরদেহ দেখতে পান। এসব তথ্যের ভিত্তিতে লেওয়ার ধারণা, একটি নৌকা যাত্রার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এবং অন্যটি কয়েক দিন পর ডুবে যায়।

বর্তমানে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের শরণার্থী শিবিরগুলোতে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছেন। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় সেখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ প্রায় নেই। একই সঙ্গে অপরাধী চক্রের তৎপরতাও বেড়েছে। শিবিরের বাইরে চলাচলেও তাদের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে।

রাখাইনে এখনও প্রায় ছয় লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছেন। এর মধ্যে প্রায় এক-চতুর্থাংশ অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতদের (আইডিপি) শিবিরে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। বাকিরা সংঘাতপূর্ণ এলাকায় অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করছেন।

অন্যদিকে রাখাইন জাতিগোষ্ঠীভিত্তিক সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মির বিরুদ্ধেও রোহিঙ্গাদের ওপর গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। ফলে অনেক রোহিঙ্গার কাছে অন্য দেশে পালিয়ে যাওয়াই একমাত্র বিকল্প হয়ে উঠেছে।

মালয়েশিয়ায় ইতোমধ্যে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করায় দেশটি আশ্রয়প্রত্যাশীদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় গন্তব্য। এই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াজুড়ে মানবপাচারকারীদের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে।

পাচারকারীরা সাধারণত অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করে নৌকায় তুলে মালয়েশিয়ায় পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। এ জন্য প্রতিজনের পরিবারের কাছ থেকে প্রায় তিন হাজার মার্কিন ডলার আদায় করা হয়। নির্ধারিত অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে ভুক্তভোগীদের আটকে রেখে নির্যাতন চালানো হয়। এমনকি নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে পরিবারকে অর্থ দিতে চাপ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

২০১৫ সালে থাইল্যান্ড সরকার মানবপাচারের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করে পাচারকারীদের ব্যবহৃত স্থলপথ ও অস্থায়ী ট্রানজিট শিবির বন্ধ করে দেয়। ওই সময় এসব শিবিরে গণকবরের সন্ধান মেলার পর আন্তর্জাতিক চাপ আরও বেড়ে যায়। এরপর অনেক পাচারকারী ইন্দোনেশিয়ার আচেহ উপকূলের রুট ব্যবহার শুরু করে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইন্দোনেশিয়ায় রোহিঙ্গাবিরোধী প্রচারণা বাড়ায় সেই পথও আগের মতো কার্যকর নেই।

ক্রিস লেওয়ার ভাষ্য, বর্তমানে পাচারকারীরা আবারও থাইল্যান্ডকেই প্রধান ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করছে। বড় জাহাজে করে রাখাইন বা বাংলাদেশের টেকনাফ উপকূল থেকে রোহিঙ্গাদের তুলে নেওয়া হয়। পরে স্যাটেলাইট ফোনের মাধ্যমে সমন্বয় করে স্থানীয় জেলেদের সহায়তায় তাদের দক্ষিণ থাইল্যান্ড বা ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা উপকূলে পৌঁছে দেওয়া হয়। সেখান থেকে অর্থ পরিশোধ নিশ্চিত হওয়ার পর গোপনে মালয়েশিয়ায় নেওয়া হয়।

গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১০ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমার ও বাংলাদেশ থেকে সমুদ্রপথে পালিয়েছেন। আগের বছরের তুলনায় এ সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। রাখাইন ও বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে ক্রমাবনতিশীল জীবনযাত্রার কারণেই এই প্রবণতা বেড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ অভিবাসনপথ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। তবে এ অঞ্চলের কোনো দেশই নতুন করে রোহিঙ্গাদের গ্রহণে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রাই এখনও তাদের অনেকের একমাত্র ভরসা হয়ে রয়েছে।

NM/YA
আরও পড়ুন