নিষেধাজ্ঞার পরও কেন ভেঙে পড়েনি ইরানের অর্থনীতি?

আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২৬, ১০:১১ এএম

দীর্ঘদিনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও সাম্প্রতিক যুদ্ধের চাপেও ইরানের অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। বরং বছরের পর বছর নিষেধাজ্ঞার কারণে গড়ে ওঠা নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক কাঠামো এখন যুদ্ধের ধাক্কা সামলাতে দেশটিকে কিছুটা সক্ষম করে তুলেছে। তবে এর বড় মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও দারিদ্র্য বৃদ্ধির মাধ্যমে।

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে এ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, গত কয়েক মাস ধরে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকলেও এর প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে তুলনামূলক সীমিত। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২৬ সালের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস মাত্র ৩ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ করেছে। অথচ একই সময়ে ইরানের অর্থনীতির জন্য আইএমএফ ৫ দশমিক ৪ শতাংশ সংকোচনের পূর্বাভাস দিয়েছে।

দেশটির অর্থনীতিতে সংকটের চিত্র অবশ্য স্পষ্ট। জুনে ভোক্তা মূল্য এক বছর আগের তুলনায় ৮৮ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। খাদ্য, পানীয় ও তামাকের দাম বেড়েছে ১৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ। গরুর মাংস ও মুরগির মতো পণ্যের দাম বৃদ্ধির হার প্রায় ১৭৮ শতাংশে পৌঁছেছে। এ সময় ইরানি মুদ্রা রিয়ালের দরও প্রতি ডলারে প্রায় ২০ লাখে নেমে যায়।

তবে এসব চাপ সত্ত্বেও ইরানে বড় ধরনের ব্যাংকিং সংকট, সরকারি ঋণখেলাপি বা বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের আকস্মিক পতন দেখা যায়নি। সরকারি হিসাবে বেকারত্বের হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং বেতন ও পেনশন পরিশোধও অব্যাহত রয়েছে।

কেন ভেঙে পড়েনি ইরান?

বিশ্লেষণে এর অন্যতম কারণ হিসেবে ইরানের অর্থনীতির দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতাকে তুলে ধরা হয়েছে। দেশটিতে বিদেশি বিনিয়োগ ও বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ খুবই কম। ফলে নিষেধাজ্ঞা বা যুদ্ধের সময় বিদেশি মূলধন ব্যাপকভাবে প্রত্যাহারের সুযোগও সীমিত।

ইরানের শেয়ারবাজার যুদ্ধ শুরুর পর প্রায় ৮০ দিন বন্ধ ছিল। মে মাসে পুনরায় চালুর পর তেহরান স্টক এক্সচেঞ্জের সূচক জুলাইয়ের শুরুতে ৫ কোটি পয়েন্টেরও ওপরে উঠে রেকর্ড গড়ে। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এটিকে বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রতিফলন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বৈদেশিক মুদ্রার ওপর নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগের সীমিত বিকল্পের কারণে দেশীয় সঞ্চয়কারীদের অর্থ শেয়ারবাজারেই থেকে গেছে।

যুদ্ধের সময় সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণও অর্থনীতিকে সচল রাখতে ভূমিকা রাখছে। আসালুয়ে ও মাহশাহরের পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সে কাঁচামাল সরবরাহ ব্যাহত হলে সরকার রপ্তানি বন্ধ করে অভ্যন্তরীণ শিল্পে সরবরাহ নিশ্চিত করে। উন্মুক্ত বাজারে যে সিদ্ধান্ত নিতে দীর্ঘ সময় লাগত, ইরানের কেন্দ্রীভূত অর্থনৈতিক কাঠামোয় তা দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে।

নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই তৈরি হয়েছে বিকল্প ব্যবস্থা

বছরের পর বছর নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান বিকল্প বাণিজ্যিক পথ ও সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। যুদ্ধের আগেই দেশটি প্রতিদিন প্রায় ১৪ থেকে ১৮ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করছিল। এর বড় অংশ যাচ্ছিল চীনের শানডং প্রদেশের স্বাধীন শোধনাগারগুলোতে।

ইরাক, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে স্থলপথ এবং রাশিয়া ও চীনের দিকে রেল যোগাযোগও নিষেধাজ্ঞার সময়ে গড়ে উঠেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার অভিজ্ঞতা যুদ্ধের সময় ইরানকে কিছু বিকল্প পথ দিয়েছে।

ধাক্কা সামলাচ্ছে অর্থনীতি, মূল্য দিচ্ছে জনগণ

তবে অর্থনীতি টিকে থাকা মানেই পরিস্থিতি ভালো এমন নয়। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরান মূলত সংকটের চাপ অর্থনীতি থেকে সরিয়ে সরাসরি জনগণের ওপর স্থানান্তর করছে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও রিয়ালের অবমূল্যায়নের কারণে পণ্য বাজারে থাকলেও সেগুলো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। দেশটির মাসিক ন্যূনতম মজুরি খোলা বাজারের বিনিময় হারে এখন প্রায় ৮৭ ডলারের সমান। একই সময়ে ইরানের রাষ্ট্রীয় পেনশন তহবিল-সংশ্লিষ্ট একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর দারিদ্র্যের হার প্রায় ৩০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৫ শতাংশ হতে পারে।

অন্যদিকে, দেশটির জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতও চাপের মধ্যে রয়েছে। গ্যাস উৎপাদন যুদ্ধ-পূর্ব দৈনিক ৬৫ কোটি ঘনমিটার থেকে প্রায় ২৩ কোটি ঘনমিটার কমেছে। বিদ্যুৎ সরবরাহেও রেশনিং করতে হচ্ছে।

বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে দীর্ঘদিন ধরে মুদ্রার অবমূল্যায়ন, ডলার রেশনিং ও অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ পিছিয়ে দেওয়ার ফলে ইরানের উৎপাদন সক্ষমতার ভিত্তিই ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে।

অর্থাৎ, নিষেধাজ্ঞা ইরানকে ধ্বংস করতে না পারলেও দেশটির অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করেছে। দীর্ঘ ১৫ বছরের চাপ দেশটিকে এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তুলতে বাধ্য করেছে, যা সংকট সহ্য করতে তুলনামূলকভাবে সক্ষম কিন্তু একই কারণে স্বাভাবিক সময়ে দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করাও তার জন্য কঠিন।

এএম
আরও পড়ুন