নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে মরিয়া হয়ে উঠেছেন হাজারো মানুষ। কাঠমান্ডুর একটি হাসপাতালের দেয়ালে নিখোঁজ ব্যক্তি ও শনাক্ত না হওয়া মরদেহের ছবি টানিয়ে রাখা হয়েছে। সেই ‘নিখোঁজদের দেয়াল’ এখন প্রিয়জনের কোনো খবর পাওয়ার আশায় অপেক্ষমাণ পরিবারগুলোর কাছে শেষ ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছে।
গত ২৬ আগস্ট হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ধসের পর সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকা বিপর্যস্ত হয়। বন্যার পানির প্রবল স্রোতে গ্রাম, সড়ক, সেতু ও বিভিন্ন অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যায়। দুর্গম ও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে এখনো অনেক জায়গায় উদ্ধারকারীরা পৌঁছাতে পারছেন না।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় টিচিং হাসপাতালে শত শত ছবি টানিয়ে একটি দেয়াল তৈরি করা হয়েছে। সেখানে নিখোঁজ ব্যক্তিদের ছবি যেমন রয়েছে, তেমনি উদ্ধার হওয়া কিন্তু এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি-এমন মরদেহের ছবিও রাখা হয়েছে। প্রতিদিন স্বজনেরা সেখানে এসে ছবিগুলো খুঁজছেন।
সাতি সিগদেল নামের এক নারী প্রতিদিন ওই দেয়ালের সামনে এসে তাঁর নিখোঁজ কাজিন সুইটি পাইথানের ছবি খুঁজছেন। স্বজনের কোনো সন্ধান মিলবে- এই আশায় তিনি প্রতিদিন হাসপাতালে আসছেন। তবে সময় যত গড়াচ্ছে, জীবিত অবস্থায় নিখোঁজদের ফিরে পাওয়ার আশা ততই ক্ষীণ হয়ে আসছে।
দুর্যোগের ব্যাপকতায় নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা এত বেশি যে অনেক পরিবার নিশ্চিত হতে পারছে না তাঁদের স্বজনেরা বেঁচে আছেন, নাকি নিহত হয়েছেন। হাসপাতালের দেয়ালে লাগানো পোস্টার ও ছবিতে অনেক সময় ব্যক্তির চেহারার পাশাপাশি শনাক্ত করার মতো বিশেষ বৈশিষ্ট্য, যেমন শরীরে উল্কি বা অন্যান্য চিহ্নের কথাও উল্লেখ করা হচ্ছে।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, ভয়াবহ এই দুর্যোগে ১ হাজার ২০০-এর বেশি মানুষ নিহত এবং ৪ হাজার ২০০-এর বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাগুলোর একটি হলো বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। বন্যা ও ভূমিধসে একাধিক প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সেখানে শত শত শ্রমিক আটকা পড়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। রয়টার্স জানিয়েছে, প্রায় ৯০০ মানুষ জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের বিভিন্ন স্থানে আটকা থাকতে পারেন। দুর্গম ভূখণ্ড ও যোগাযোগব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় উদ্ধার অভিযান অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
উদ্ধারকাজের পাশাপাশি মরদেহ শনাক্ত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিপুলসংখ্যক মরদেহ উদ্ধার হওয়ায় হাসপাতাল ও মর্গগুলোর ওপর চাপ বেড়েছে। অনেক পরিবার তাই হাসপাতালের দেয়ালে ছবি খুঁজছেন, আবার কেউ কেউ ডিএনএ নমুনা দিয়ে নিখোঁজ স্বজনকে শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন।
এই অনিশ্চয়তার মধ্যে কিছু পরিবার ধর্মীয় রীতির আশ্রয়ও নিচ্ছে। স্বজনের মরদেহ না পেলেও কেউ কেউ কাঠমান্ডুর পশুপতিনাথ মন্দিরে প্রতীকী মরদেহ হিসেবে কুশপুত্তলিকা দাহ করছেন। সাধারণত মৃত ব্যক্তির শেষকৃত্যে ব্যবহৃত এই রীতি নিখোঁজ স্বজনের মৃত্যু মেনে নেওয়ার এক বেদনাদায়ক প্রতীক হয়ে উঠেছে।
তবু হাসপাতালের সেই দেয়ালের সামনে প্রতিদিন মানুষের ভিড় থামছে না। কেউ হাতে ছবি নিয়ে আসছেন, কেউ অন্যের পোস্টার থেকে নিজের স্বজনের মুখ খুঁজছেন। কারও চোখে শেষ আশার আলো, কারও চোখে অপেক্ষার ক্লান্তি।
নেপালের এই ‘নিখোঁজদের দেয়াল’ তাই শুধু কয়েকশ ছবি ও পোস্টারের সমষ্টি নয়। এটি এক ভয়াবহ দুর্যোগে স্বজন হারানো মানুষের অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা ও শেষ আশার প্রতিচ্ছবি। উদ্ধার অভিযান যতই এগিয়ে যাচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে—অনেক পরিবারের জন্য প্রিয়জনের সন্ধান পাওয়াই এখন সবচেয়ে বড় লড়াই।
হঠাৎই উধাও রহস্যময় ভাসমান দ্বীপ
আজও তিনি মহানায়ক
‘জিরো পয়েন্ট থেকে সদরঘাট পর্যন্ত রাস্তায় বসতে পারবেন না হকার’