ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলার মধ্যেই হরমুজ প্রণালিতে একদিনে প্রায় ৬০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। একই সময়ে সামরিক পাহারায় ৪০টি বাণিজ্যিক জাহাজকে প্রণালি দিয়ে নিরাপদে পার করে দেওয়া হয়েছে। এসব জাহাজে ছিল প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল তেল।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবারের (১ সেপ্টেম্বর) এই অভিযান হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধ শুরুর পর মার্কিন বাহিনীর সবচেয়ে বড় সমন্বিত সামরিক ও জাহাজ পাহারা অভিযানে পরিণত হয়েছে। অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র আকাশ, সমুদ্র ও মহাকাশভিত্তিক বিভিন্ন সামরিক সক্ষমতা ব্যবহার করে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে সিএনএন জানায়, বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে পাহারা দেওয়ার পাশাপাশি ইরানের হামলার সক্ষমতা কমাতে প্রণালির আশপাশে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার, সামুদ্রিক সামরিক সরঞ্জাম, মাইন পাতা ও যোগাযোগব্যবস্থার মতো প্রায় ৬০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়। এ সময় ইরানের ছোড়া একাধিক ড্রোন হামলা প্রতিহত করার পাশাপাশি জাহাজবিরোধী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও নিষ্ক্রিয় করা হয়।
যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন করা হতো। তবে যুদ্ধের কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জুলাই থেকে মার্কিন অবরোধের কারণে ইরান কোনো তেল রপ্তানি করতে পারেনি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, সাম্প্রতিক হামলায় ইরানের জাহাজ শনাক্ত করার সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মার্কিন হামলায় ইরানের রাডার ব্যবস্থা ধ্বংস হওয়ায় দেশটি এখন প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজগুলো আগের মতো শনাক্ত করতে পারছে না।
মার্কিন প্রশাসন হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি করলেও এ বিষয়ে জ্বালানি খাতের কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রণালিতে কয়েক দিন বেশি জাহাজ চলাচল করলেই সেখানে নিয়মিত ও নিরাপদ নৌযাত্রা নিশ্চিত হয়েছে, এমন দাবি করা যায় না।
জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো প্রতিটি যাত্রার ক্ষেত্রে আলাদাভাবে ঝুঁকি বিবেচনা করছে। প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচলের ভাড়াও বেড়ে গেছে। কিছু হিসাব অনুযায়ী, একটি তেলবাহী জাহাজের দৈনিক ভাড়া ৫ লাখ ডলারেরও বেশি হয়েছে। এর সঙ্গে উচ্চ বিমা ব্যয়ও যুক্ত হওয়ায় হরমুজ দিয়ে পণ্য পরিবহনের খরচ আরও বেড়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তারা মনে করছেন, ইরান হামলার সক্ষমতা পুনর্গঠন করতে পারায় হরমুজের আশপাশে হামলা অব্যাহত রাখতে হবে। একজন কর্মকর্তা এই কৌশলকে ঘাস কাটার মতো ধারাবাহিক অভিযান হিসেবে বর্ণনা করেছেন, অর্থাৎ ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করার বদলে তা বারবার দুর্বল করে রাখা।
হরমুজ প্রণালিতে সামরিক অভিযান জোরদারের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে নৌ-অবরোধও বজায় রেখেছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এর লক্ষ্য হলো প্রণালিকে ইরানের জন্য কৌশলগত চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সক্ষমতা কমিয়ে আনা।
তবে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক করতে সময় লাগবে বলে মনে করছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্র আগামী মাসের মধ্যে প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য পরিষ্কার করা নৌপথ আরও প্রশস্ত করার পরিকল্পনা করছে। এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে তেল পরিবহনের পরিমাণ বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার প্রণালি দিয়ে যাওয়া ৪০টি বাণিজ্যিক জাহাজের বেশির ভাগই নিজেদের অবস্থান গোপন রাখতে স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বন্ধ রেখেছিল। ফলে প্রকাশ্যে যে পরিমাণ জাহাজ চলাচলের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, বাস্তবে এর চেয়ে বেশি জাহাজ প্রণালি ব্যবহার করে থাকতে পারে।
তবে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসসহ অন্যান্য জ্বালানি বহনকারী জাহাজগুলো এখনো বেশি সতর্কতা অবলম্বন করছে। কারণ হামলা, মাইন বা ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে এ ধরনের জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হলে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সামরিক কৌশলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর হামলার বিষয়টি আপাতত পিছিয়ে গেছে। মার্কিন সামরিক কমান্ডকে হরমুজ প্রণালি এবং ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধ রাখার সক্ষমতার ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এর ফলে ছয় মাসের বেশি সময় ধরে চলা ইরান যুদ্ধ নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র একদিকে হরমুজে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করতে ধারাবাহিক হামলা চালাচ্ছে। তবে এসব পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত তেহরানকে নতি স্বীকারে বাধ্য করতে পারবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। সূত্র: সিএনএন
বিয়ের অনুষ্ঠানে আঘাত হানা বোমাটি যুক্তরাষ্ট্রের: সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা
হুথিদের তিন ড্রোন ভূপাতিত করলো ইয়েমেনি সেনাবাহিনী
ইরানের প্রতি সমর্থনে চীনের সীমাবদ্ধতা
কুয়েত-আমিরাতে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলা
ইরান যুদ্ধের চাপে গভীর সংকটে মার্কিন সামরিক বাহিনী