বিশ্বের প্রচলিত মানচিত্রে মহাদেশগুলোর প্রকৃত আয়তন অনেক সময় ঠিকভাবে ফুটে ওঠে না। বিশেষ করে আফ্রিকার তুলনায় গ্রিনল্যান্ডকে অস্বাভাবিক বড় দেখানোর বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে মানচিত্রবিদদের আলোচনায় রয়েছে। এবার জাতিসংঘও মানচিত্রে এই আয়তনগত বিভ্রান্তি কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ‘করেক্ট দ্য ম্যাপ’ উদ্যোগের মাধ্যমে এমন মানচিত্র ব্যবহারের প্রতি উৎসাহ দিয়েছে, যা মহাদেশগুলোর প্রকৃত আয়তন তুলনামূলকভাবে সঠিকভাবে তুলে ধরে। এ ক্ষেত্রে আলোচনায় এসেছে ইকুয়াল আর্থ (Equal Earth) প্রজেকশন। তবে এই মানচিত্রও নিখুঁত নয়—কারণ গোলাকার পৃথিবীকে সমতল কাগজে দেখাতে গেলে কোনো না কোনো বৈশিষ্ট্যে বিকৃতি থাকবেই।
মার্কেটর মানচিত্র: নেভিগেশনে অসাধারণ, আয়তনে বিভ্রান্তিকর
বর্তমানে সবচেয়ে পরিচিত বিশ্ব মানচিত্রগুলোর একটি হলো মার্কেটর প্রজেকশন। ১৫৬৯ সালে ফ্লেমিশ মানচিত্রবিদ জেরার্ডাস মার্কেটর এটি তৈরি করেন।

এর মূল উদ্দেশ্য ছিল সমুদ্রপথে নাবিকদের দিকনির্দেশনা দেওয়া। কম্পাসের নির্দিষ্ট দিক অনুসরণ করে যাত্রা করলে মানচিত্রে সেই পথকে সরলরেখা হিসেবে দেখানো—মার্কেটর প্রজেকশনের সবচেয়ে বড় সুবিধা। এ কারণে নৌ-নেভিগেশনে এটি অত্যন্ত কার্যকর।কিন্তু এর বড় সমস্যা আয়তনে। বিষুবরেখা থেকে যত উত্তর বা দক্ষিণ মেরুর দিকে যাওয়া যায়, মানচিত্রে অঞ্চলগুলোর আকার তত বেশি প্রসারিত হয়। ফলে গ্রিনল্যান্ডকে আফ্রিকার তুলনায় অনেক বড় দেখায়, যদিও বাস্তবে আফ্রিকা গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে প্রায় ১৪ গুণ বড়।
জাতিসংঘের ভূ-তথ্যবিষয়ক উপকরণও বলছে, মেরু অঞ্চলের কাছাকাছি ভূমির আয়তন বিভিন্ন প্রজেকশনে অস্বাভাবিক বড় দেখাতে পারে।
তবে মার্কেটরকে পুরোপুরি ‘ভুল’ বলা ঠিক নয়। এর উদ্দেশ্য ছিল আয়তন দেখানো নয়, বরং দিক ও কোণ সংরক্ষণ করে নেভিগেশনে সহায়তা করা। সেই কাজটি এটি অত্যন্ত ভালোভাবেই করে।
ইকুয়াল আর্থ: আয়তন দেখাতে বেশি নির্ভুল
মার্কেটরের আয়তনগত সমস্যার সমাধানের অন্যতম প্রচেষ্টা হলো ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশন। ২০১৮ সালে একদল মানচিত্রবিদ এটি তৈরি করেন।

এই প্রজেকশনের লক্ষ্য হলো বিশ্বের বিভিন্ন স্থলভাগের প্রকৃত আয়তনের তুলনা আরও বাস্তবসম্মতভাবে তুলে ধরা। ফলে আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা বা এশিয়ার মতো বিশাল মহাদেশগুলোকে তুলনামূলকভাবে তাদের প্রকৃত আকারে দেখা যায়।
তবে এর বিনিময়ে কিছু সুবিধা ছাড়তে হয়। মার্কেটরের মতো এখানে সরলরেখায় কম্পাসের নির্দিষ্ট দিক অনুসরণ করা যায় না। একইভাবে মানচিত্রে দুটি স্থানের মধ্যকার প্রকৃত দূরত্বও সরাসরি মাপা যায় না।
কারণ গোলাকার পৃথিবীর সব বৈশিষ্ট্য—আয়তন, আকৃতি, দূরত্ব ও দিক—একটি সমতল মানচিত্রে একই সঙ্গে নিখুঁতভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। জাতিসংঘের নথিতেও বলা হয়েছে, কোনো একক প্রজেকশন সব উদ্দেশ্যে সমানভাবে কার্যকর হতে পারে না।
পিটার্স মানচিত্র: আয়তন ঠিক, আকৃতি বিকৃত
আরেকটি আলোচিত মানচিত্র হলো পিটার্স প্রজেকশন। জার্মান ইতিহাসবিদ আরনো পিটার্স ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে এটি জনপ্রিয় করেন। এর ভিত্তি ছিল ১৮৫৫ সালে স্কটিশ মানচিত্রবিদ জেমস গল বর্ণিত একটি প্রজেকশন।
পিটার্স মানচিত্রের লক্ষ্য ছিল ভূমির আয়তনকে তুলনামূলকভাবে সঠিক রাখা। ফলে আফ্রিকা ও গ্রিনল্যান্ডের প্রকৃত আয়তনের পার্থক্য অনেক ভালোভাবে বোঝা যায়।

কিন্তু এর সমস্যা হলো আকৃতি। আয়তন ঠিক রাখতে গিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থলভাগকে টেনে বা সংকুচিত করে দেখাতে হয়। ফলে অনেক দেশ ও মহাদেশের প্রকৃত আকৃতি বিকৃত হয়ে যায়।
এ কারণে পিটার্স মানচিত্র আয়তনের তুলনা বোঝার জন্য উপযোগী হলেও নেভিগেশনের জন্য ভালো নয়।
আজিমুথাল ইকুইডিস্ট্যান্ট: কেন্দ্র থেকে দূরত্ব ঠিক
বিশ্বকে দেখানোর আরেকটি পদ্ধতি হলো আজিমুথাল ইকুইডিস্ট্যান্ট প্রজেকশন। এতে একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রবিন্দু থেকে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের দূরত্ব তুলনামূলকভাবে সঠিকভাবে দেখানো যায়।
জাতিসংঘের পতাকার মানচিত্রটি এর একটি পরিচিত উদাহরণ। এতে উত্তর মেরুকে কেন্দ্র করে পৃথিবীকে দেখানো হয়েছে। জাতিসংঘের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, তাদের প্রতীকের বিশ্ব মানচিত্রটি উত্তর মেরুকেন্দ্রিক আজিমুথাল ইকুইডিস্ট্যান্ট প্রজেকশন ব্যবহার করে তৈরি।
এই প্রজেকশন বিশেষ করে কেন্দ্র থেকে বিভিন্ন স্থানের দিক ও দূরত্ব বোঝানোর ক্ষেত্রে কার্যকর।
দক্ষিণকে ওপরে রাখলেও মানচিত্র ভুল হয় না
আরেকটি মজার বিষয় হলো মানচিত্রের ‘উপর’ ও ‘নিচ’। আমরা সাধারণত উত্তরকে ওপরে এবং দক্ষিণকে নিচে দেখতে অভ্যস্ত। কিন্তু পৃথিবীর মহাকাশে এমন কোনো নির্দিষ্ট ‘উপর’ বা ‘নিচ’ নেই।

তাই সাউথ-আপ বা দক্ষিণমুখী মানচিত্রে অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকাকে ওপরে এবং ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকাকে নিচের দিকে দেখানো হয়। এটি পৃথিবীর ভৌগোলিক বাস্তবতা বদলায় না—শুধু মানচিত্রের দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়।
তাহলে কোন মানচিত্র সবচেয়ে সঠিক?
আসলে ‘সবচেয়ে সঠিক’ একটি বিশ্ব মানচিত্র নেই। কোন মানচিত্র ভালো, তা নির্ভর করে সেটি কী কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।
নেভিগেশনের জন্য মার্কেটর কার্যকর। মহাদেশের প্রকৃত আয়তন তুলনার জন্য ইকুয়াল-আর্থ বা অন্যান্য equal-area প্রজেকশন বেশি উপযোগী।
কেন্দ্র থেকে দূরত্ব ও দিক বোঝাতে আজিমুথাল ইকুইডিস্ট্যান্ট কার্যকর। আয়তন তুলনার বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে পিটার্স প্রজেকশনও গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ কোনো মানচিত্রই পৃথিবীর পুরো সত্য একসঙ্গে তুলে ধরতে পারে না। গোলাকার পৃথিবীকে সমতল কাগজে নামিয়ে আনলেই কিছু না কিছু বিকৃতি তৈরি হবে। জাতিসংঘের ভূ-তথ্যবিষয়ক নির্দেশিকাতেও বলা হয়েছে, কোনো প্রজেকশনই একই সঙ্গে পৃথিবীর সব বৈশিষ্ট্য—আয়তন, আকৃতি, দূরত্ব ও দিক—নিখুঁতভাবে সংরক্ষণ করতে পারে না।
তাই মানচিত্রকে শুধু ‘সঠিক’ বা ‘ভুল’ হিসেবে দেখার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—কোন মানচিত্র কোন কাজের জন্য তৈরি এবং সেটি কী বিষয়টিকে সবচেয়ে ভালোভাবে তুলে ধরছে।
সূত্র: বিবিসি