হাম উপসর্গে হাজার ছাড়িয়েছে শিশুর মৃত্যু

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০২ পিএম

দেশে হাম পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে এ বছর শিশুমৃত্যু এক হাজার ছাড়িয়েছে।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত এ রোগে ও এর উপসর্গে মারা গেছে ১ হাজার ২ শিশু। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ১০০ জনের, আর হামের উপসর্গে মারা গেছে ৯০২ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ১১৯ শিশু। নতুন করে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ৬৯ জনের। এ নিয়ে চলতি বছর দেশে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৪৮৪।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিয়মিত টিকাদানের হার কমে যাওয়া এবং সময়মতো প্রয়োজনীয় টিকা সংগ্রহ ও বিতরণে ঘাটতিই বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম বড় কারণ। বছরের শুরুতে সংক্রমণ দেখা দিলেও তা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে দেরি হয়েছে বলেও তাঁদের অভিযোগ।

মার্চ থেকে দেশে হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এপ্রিল ও মে মাসে মাসব্যাপী গণটিকাদান কর্মসূচি চালানো হয়। তবে ওই কর্মসূচিতেও বিপুলসংখ্যক শিশু টিকার বাইরে থেকে যায়।

চলতি বছরের সংক্রমণের সঙ্গে আগের কয়েক বছরের চিত্রের বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। ২০২৫ সালে দেশে হাম শনাক্ত হয়েছিল ১৩২ জনের। ২০২৪ সালে ২৪৭, ২০২৩ সালে ২৮২ এবং ২০২২ সালে ৩১১ জনের হাম শনাক্ত হয়েছিল। সেই তুলনায় চলতি বছরের সংক্রমণকে নজিরবিহীন বলছেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা।

জনস্বাস্থ্যবিদ তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তুলনায় এবার বাংলাদেশেই হামের সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি হয়েছে। এত ব্যাপক সংক্রমণ ও মৃত্যু দেশের ইতিহাসে আগে দেখা যায়নি।

কমেছে টিকাদানের হার

একসময় নিয়মিত টিকাদান ও জাতীয় পর্যায়ের বিশেষ কর্মসূচির কারণে হাম নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের সাফল্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। ২০০৬ সালের জাতীয় হাম টিকাদান কর্মসূচিতে নির্ধারিত ৩ কোটি ৪২ লাখ শিশুর লক্ষ্যমাত্রার শতভাগই টিকার আওতায় এসেছিল। ২০১০ সালের ফলোআপ ক্যাম্পেইনেও ১ কোটি ৮১ লাখ শিশুর লক্ষ্যমাত্রার শতভাগ অর্জিত হয়।

২০১৪ সালের হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচিতেও ৯ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী ৫ কোটি ২৭ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সে সময় কভারেজ ১০০ শতাংশেরও বেশি ছিল।

তবে ২০২০-২১ সালের পর বড় ধরনের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি আর হয়নি। পাশাপাশি নিয়মিত টিকাদানের আওতাও কমতে থাকে। ২০২৫ সালে টিকাদানের হার ৫৯ শতাংশে নেমে আসে। বিভিন্ন এলাকায় টিকার সংকটের খবরও পাওয়া যায়।

ইউনিসেফের বাংলাদেশে ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া গত ৫ মে জানান, ২০২৫ সালে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার টিকা সংগ্রহের প্রচলিত পদ্ধতিতে পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর ইউনিসেফ একাধিকবার উদ্বেগ জানিয়েছিল। তাদের আশঙ্কা ছিল, এতে টিকা সরবরাহে বিলম্ব হতে পারে এবং সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়তে পারে।

বিশেষ কর্মসূচিতেও বাদ লাখো শিশু

হামের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ার পর গত এপ্রিলে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে সরকার। কিন্তু হিসাবের ব্যবধানের কারণে বিপুলসংখ্যক শিশু এ কর্মসূচির বাইরে থেকে গেছে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন।

এই বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ শিশুকে হামের টিকা দেওয়ার হিসাব করা হলেও জুনের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনে একই বয়সী প্রায় ২ কোটি ২৬ লাখ শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অর্থাৎ প্রায় ৪৬ লাখ শিশুর টিকাদান নিশ্চিত হয়নি।

জনস্বাস্থ্যবিদ তাজুল ইসলাম এ বারীর মতে, টিকাদান কর্মসূচি চলার পরও এত ব্যাপক সংক্রমণ ও মৃত্যু অত্যন্ত উদ্বেগজনক। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ৬ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী সব শিশুকে দ্রুত টিকার আওতায় আনার ওপর জোর দেন তিনি।

এম সি এইচ
আরও পড়ুন