হরমুজ বন্ধ হলে বাংলাদেশে কী হবে?

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৪৩ এএম

পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মাঝখানে অবস্থিত মাত্র কয়েক দশ কিলোমিটার প্রশস্ত জলপথ-হরমুজ প্রণালি। আয়তনে ছোট হলেও বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এর গুরুত্ব বিশাল। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি প্রবেশদ্বার হিসেবে এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল, পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) পরিবহন হয়।

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ায় হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল ইতোমধ্যে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কমে গেছে। ৯ সেপ্টেম্বর মাত্র ছয়টি কমোডিটি জাহাজ এই জলপথ অতিক্রম করেছে, যেখানে ১০ দিনের গড় ছিল প্রায় ১২টি। এর আগে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় ১২৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করত।

এ অবস্থায় যদি হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, বাংলাদেশের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

তেলের বাজারে প্রথম ধাক্কা

হরমুজ বন্ধ হওয়ার সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়বে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। ২০২৪ সালে এই প্রণালি দিয়ে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবহন হয়েছে, যা বিশ্বের মোট পেট্রোলিয়াম তরল ব্যবহারের প্রায় ২০ শতাংশের সমান। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধেও প্রবাহ ছিল প্রায় ২০.৯ মিলিয়ন ব্যারেল প্রতিদিন।

হরমুজ বন্ধ হলে অবশ্য পুরো ২০ মিলিয়ন ব্যারেল সরবরাহ একসঙ্গে হারিয়ে যাবে—এমন নয়। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কিছু বিকল্প পাইপলাইন রয়েছে। কিন্তু এসব বিকল্প পথের সক্ষমতা হরমুজের সমপর্যায়ের নয়। EIA-এর হিসাবে সৌদি ও আমিরাতের বিকল্প পাইপলাইন দিয়ে আনুমানিক ৪.৭ মিলিয়ন ব্যারেল প্রতিদিন পর্যন্ত তেল সরিয়ে নেওয়া সম্ভব।

ফলে বাজারে সরবরাহ ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হবে। এর প্রভাব ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে। ৯ সেপ্টেম্বর ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০১ ডলারের ওপরে উঠে যায়। বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ হলো—আমদানি করা জ্বালানির ব্যয় বাড়বে।

পেট্রোল-ডিজেলের দাম বাড়ার ঝুঁকি

বাংলাদেশ জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে শুধু পেট্রোল বা অকটেনের দামই বাড়ে না; ডিজেল, জেট ফুয়েল, পরিবহন খরচ এবং শিল্পের উৎপাদন ব্যয়েও তার প্রভাব পড়ে।

ডিজেলের দাম বাড়লে ট্রাক, বাস, নৌযান ও কৃষিযন্ত্রের পরিচালন ব্যয় বাড়বে। পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়লে তার প্রভাব পড়বে বাজারে। অর্থাৎ হরমুজ সংকটের প্রথম পর্যায়ের অভিঘাত হতে পারে জ্বালানি → পরিবহন → পণ্য পরিবহন → বাজারদর—এই চেইনে।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হবে যদি সংকট দীর্ঘস্থায়ী হয়। স্বল্পমেয়াদি সংকট সরকার মজুত, বিকল্প উৎস ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সামাল দিতে পারে। কিন্তু কয়েক মাস ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উচ্চ থাকলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়বে।

বাংলাদেশের জন্য আরও বড় ঝুঁকি LNG

তেলের পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য হরমুজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো LNG।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প ও গ্যাসভিত্তিক অর্থনীতিতে LNG গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রাথমিক জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬০–৬৫ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে আসে; দেশীয় গ্যাসের পাশাপাশি আমদানি করা LNG দিয়ে ঘাটতি পূরণ করা হয়। আর এখানেই হরমুজ বাংলাদেশের জন্য বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ।

কারণ কাতার বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান LNG সরবরাহকারী। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের LNG আমদানির প্রায় ৬০ শতাংশ কাতার থেকে এসেছিল বলে S&P Global-এর তথ্য বলছে।

অন্যদিকে হরমুজ দিয়ে বিশ্বের মোট LNG বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যায়। মূলত কাতার থেকেই এই LNG আসে। অর্থাৎ হরমুজ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বাংলাদেশের LNG সরবরাহে সরাসরি চাপ তৈরি হতে পারে।

এরই মধ্যে কাতারের LNG নিয়ে চাপ

বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই হরমুজ সংকটের প্রভাব অনুভব করছে। ২০২৬ সালে কাতারএনার্জি থেকে বাংলাদেশের নির্ধারিত LNG সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে যাওয়ার কথা জানিয়েছে পেট্রোবাংলা। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ কাতার থেকে প্রায় ৪.১৫ মিলিয়ন টন LNG পেয়েছিল। কিন্তু চলমান সংঘাতের কারণে কাতারের নির্ধারিত অনেক চালান আটকে গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ স্পট মার্কেট থেকেও অতিরিক্ত LNG কিনছে।

অর্থাৎ হরমুজ পুরোপুরি বন্ধ হলে বাংলাদেশকে আরও বেশি দামে বিকল্প LNG কিনতে হতে পারে। আর LNG-এর দাম বাড়লে গ্যাসের সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হবে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে কী হবে?

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের বড় ভূমিকা রয়েছে। LNG সরবরাহ কমে গেলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ কমানোর প্রয়োজন হতে পারে।

এর ফল হতে পারে— শিল্পে গ্যাসের চাপ বাড়া, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি বাড়া, শিল্প উৎপাদনের খরচ বৃদ্ধি; সার কারখানা ও অন্যান্য গ্যাসনির্ভর শিল্পে চাপ তৈরি হওয়া।

তবে এর মাত্রা নির্ভর করবে হরমুজ কতদিন বন্ধ থাকে, বাংলাদেশ কত দ্রুত বিকল্প LNG সংগ্রহ করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে LNG-এর দাম কতটা বাড়ে তার ওপর।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে স্পট মার্কেট, দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে LNG সংগ্রহের চেষ্টা করছে। আগস্ট ২০২৬-এ সরকার অতিরিক্ত পাঁচটি LNG কার্গো সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছিল।

বাড়বে আমদানি ব্যয়

হরমুজ বন্ধ হলে শুধু জ্বালানির দাম নয়, পরিবহন ব্যয়ও বাড়বে। যেসব জাহাজ বিকল্প পথে চলবে, তাদের বেশি সময় সমুদ্রে থাকতে হবে। একই সঙ্গে যুদ্ধঝুঁকি, বীমা ও জাহাজভাড়া বাড়বে। ইতোমধ্যে হরমুজ এলাকায় যুদ্ধঝুঁকি ও বীমা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে; কিছু ক্ষেত্রে একটি কার্গোর মূল্যের কয়েক শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত বীমা খরচের কথা বলা হচ্ছে।

এই অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত আমদানিকারকের ওপর পড়ে। আর আমদানিকারক সেই ব্যয় পণ্যের দামের সঙ্গে যোগ করলে দেশের ভোক্তাকেই বেশি দাম দিতে হয়।

খাদ্যবাজারেও প্রভাব পড়তে পারে

বাংলাদেশে খাদ্যপণ্যের দাম সরাসরি তেলের দামের সঙ্গে যুক্ত। জ্বালানি ব্যয় বাড়লে— কৃষি উৎপাদন → পরিবহন → পাইকারি বাজার → খুচরা বাজার।

প্রতিটি ধাপে খরচ বাড়তে পারে। সেচের ডিজেল, কৃষিপণ্য পরিবহন, মাছ ও মাংস পরিবহন, কোল্ড স্টোরেজ—সব ক্ষেত্রেই জ্বালানি ব্যয়ের প্রভাব রয়েছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে হরমুজ বন্ধ হলেই বাংলাদেশে সব পণ্যের দাম একই হারে বেড়ে যাবে। সরকারের বাজার ব্যবস্থাপনা, মজুত, ভর্তুকি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি বড় ভূমিকা রাখবে।

ডলারের ওপর বাড়তি চাপ

হরমুজ সংকট বাংলাদেশের আরেকটি বড় দুর্বল জায়গায় চাপ তৈরি করতে পারে—বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে।

তেল ও LNG আমদানি করতে বাংলাদেশকে বেশি ডলার ব্যয় করতে হলে আমদানি বিল বাড়বে। একই পরিমাণ জ্বালানি কিনতে বেশি অর্থ প্রয়োজন হবে।

ফলে— জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়বে → ডলারের চাহিদা বাড়বে → বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ পড়বে → আমদানি ব্যয় বাড়বে। এর প্রভাব টাকার বিনিময় হার ও সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতেও পড়তে পারে।

তবে সবকিছু অন্ধকার নয়

হরমুজ বন্ধ হলেও বিশ্ববাজার একেবারে অচল হয়ে যাবে না। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিকল্প পাইপলাইন রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন দেশ কৌশলগত মজুত ব্যবহার করতে পারে এবং উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে পারে।

কিন্তু সমস্যা হলো—এই বিকল্পগুলো হরমুজের পুরো সক্ষমতার সমান নয়। তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সংকটের স্থায়িত্ব।

হরমুজ কয়েক দিন বন্ধ থাকলে আতঙ্ক ও মূল্যবৃদ্ধি হতে পারে। কয়েক সপ্তাহ বন্ধ থাকলে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় চাপ তৈরি হবে। আর কয়েক মাস বন্ধ থাকলে তা বিশ্ব অর্থনীতির পাশাপাশি বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রা, বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতের জন্য বড় সংকটে পরিণত হতে পারে।

বাংলাদেশের করণীয় কী?

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো আতঙ্কে না গিয়ে কয়েকটি প্রস্তুতি জোরদার করা।

প্রথমত, জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, কাতারনির্ভর LNG সরবরাহের পাশাপাশি ওমান, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য উৎস থেকে বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, স্পট মার্কেটে LNG কেনার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে, যাতে হঠাৎ উচ্চমূল্যের বাজারে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় না হয়।

চতুর্থত, বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ওপর চাপ কমাতে কয়লা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অন্যান্য উৎসের ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে হবে।

পঞ্চমত, মূল্যস্ফীতির সম্ভাব্য চাপ মোকাবিলায় খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।

শেষ কথা

হরমুজ প্রণালি বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে। কিন্তু এর দরজা বন্ধ হলে সেই ধাক্কা বাংলাদেশের রান্নাঘর, গণপরিবহন, কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতি শুধু সরাসরি হরমুজ দিয়ে আসা তেলের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং বিশ্ববাজারের দাম, LNG সরবরাহ, জাহাজভাড়া, বীমা, ডলার এবং আমদানি ব্যয়ের মাধ্যমে হরমুজ সংকটের প্রভাব দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু পর্যাপ্ত তেল বা গ্যাস কেনার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িত বিকল্প সরবরাহকারী, মজুত সক্ষমতা, বৈদেশিক মুদ্রা, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা।

হরমুজ বন্ধ হলে বাংলাদেশের সামনে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হবে—বিশ্বের জ্বালানি সংকটের ধাক্কা কতটা কমিয়ে নিজের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা যায়।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত