মক্কার মিনায় হজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা—জামারাতে শয়তানকে প্রতীকী পাথর নিক্ষেপ। কোটি কোটি মুসলমানের কাছে এটি ধর্মীয় ইবাদতের অংশ। কিন্তু কয়েক দশক আগেও এই আনুষ্ঠানিকতা ছিল ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ। সরু পথ, বিপুল মানুষের চাপ এবং একই জায়গায় বিপরীতমুখী মানুষের চলাচলের কারণে প্রায়ই সৃষ্টি হতো বিশৃঙ্খলা। কখনো কখনো সেই বিশৃঙ্খলা রূপ নিত ভয়াবহ পদদলনে।
এই সমস্যার একটি বৈজ্ঞানিক সমাধানের চিন্তা করেছিলেন বাংলাদেশের এক প্রকৌশলী—মোহাম্মদ ইব্রাহিম। তাঁর প্রস্তাবিত পরিকল্পনার মূল ধারণা ছিল সহজ, কিন্তু কার্যকর—হাজিদের চলাচলকে নিয়ন্ত্রিত ও একমুখী করা, যাতে একই সময়ে বিপরীত দিক থেকে আসা মানুষের স্রোত একে অপরের মুখোমুখি না হয়।
আজ জামারাত কমপ্লেক্সের বিশাল বহুতল কাঠামো, প্রশস্ত চলাচলের পথ এবং নিয়ন্ত্রিত জনস্রোত দেখে সেই সময়ের পরিস্থিতি কল্পনা করা কঠিন। কিন্তু এই পরিবর্তনের পেছনের গল্পে বাংলাদেশের এই প্রকৌশলীর নাম বারবার উঠে আসে।
১৯৯৪-এর হজ বদলে দিল তাঁর চিন্তা
বিভিন্ন বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোহাম্মদ ইব্রাহিম ১৯৯৪ সালে স্ত্রীকে নিয়ে হজ পালন করতে সৌদি আরব যান। সেই বছর জামারাতে পাথর নিক্ষেপের সময় পদদলিত হয়ে ২৭০ জন হাজি নিহত হন। ঘটনাটি তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
তিনি একজন প্রকৌশলী ছিলেন। তাই অন্য অনেকের মতো শুধু দুর্ঘটনাটিকে দুর্ভাগ্য হিসেবে দেখেননি; বরং সমস্যাটিকে তিনি দেখেছিলেন নকশা, জনস্রোত ও ব্যবস্থাপনার একটি প্রকৌশলগত সমস্যা হিসেবে।
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, তখন জামারাতে পাথর নিক্ষেপের জন্য মানুষের চলাচলে কার্যকর কোনো একমুখী ব্যবস্থা ছিল না। ফলে বিভিন্ন দিক থেকে মানুষ একই স্থানে এসে জড়ো হতেন। বিপুল মানুষের চাপের মধ্যে কেউ পড়ে গেলে মুহূর্তেই তার ওপর আরও অনেকে পড়ে যেতেন। এই জায়গাতেই ইব্রাহিমের চিন্তার পরিবর্তন।
দেশে ফিরে তৈরি করলেন পরিকল্পনা
হজ থেকে বাংলাদেশে ফিরে ইব্রাহিম জামারাতের সমস্যা নিয়ে কাজ শুরু করেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁর পরিকল্পনাকে একমুখী বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার চার ধাপের প্রকল্প হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এর অন্যতম মূল ধারণা ছিল জামারাতের প্রতিটি স্তম্ভকে এমনভাবে ঘিরে ও সংযুক্ত করা, যাতে হাজিদের জন্য পৃথক চলাচলের পথ তৈরি হয় এবং মানুষের স্রোত নির্দিষ্ট দিকে পরিচালিত করা যায়।
অর্থাৎ সমস্যার সমাধান হিসেবে তিনি মানুষের চলাচলের গতিপথকে পুনর্বিন্যাস করার কথা ভেবেছিলেন। এটি ছিল মূলত crowd-flow management—বিপুলসংখ্যক মানুষকে কীভাবে একই জায়গায় নিরাপদে চলাচল করানো যায়, সেই প্রকৌশলগত চিন্তা।
সৌদি সরকারের কাছে কীভাবে গেল তাঁর পরিকল্পনা?
বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমের একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইব্রাহিম তাঁর প্রকল্পটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে জমা দেন। পরে ঢাকায় সৌদি দূতাবাসের মাধ্যমে পরিকল্পনাটি সৌদি সরকারের কাছে পাঠানো হয়।
প্রতিবেদনগুলোতে আরও দাবি করা হয়েছে, সৌদি কর্তৃপক্ষ তাঁর পরিকল্পনাকে গ্রহণ করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-যাচাইয়ের বিষয় আছে। সৌদি সরকারের সরকারি নথি বা প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক ইতিহাসে ইব্রাহিমের প্রস্তাব গ্রহণের বিস্তারিত দলিল অনলাইনে সহজে পাওয়া যায়নি। ফলে ‘পুরো জামারাত কমপ্লেক্স তাঁর নকশায় তৈরি’—এমন সরল দাবি না করে বলা বেশি নির্ভুল যে, তাঁর প্রস্তাবিত একমুখী চলাচল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা জামারাতের উন্নয়ন-ভাবনার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বাংলাদেশি বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আজকের জামারাত কেন এত আলাদা?
বর্তমান জামারাত কমপ্লেক্স বহুস্তরবিশিষ্ট একটি বিশাল অবকাঠামো। হাজিরা নির্দিষ্ট পথ ধরে জামারাতে পৌঁছান, পাথর নিক্ষেপ করেন এবং নিয়ন্ত্রিত পথ ধরে সরে যান।
এই ব্যবস্থার লক্ষ্য শুধু মানুষের চলাচল সহজ করা নয়—একই জায়গায় বিপরীতমুখী মানুষের চাপ কমানো এবং জনস্রোতকে ভাগ করে দেওয়া। এখানে প্রকৌশল, স্থাপত্য, পরিবহন পরিকল্পনা এবং crowd management—সবকিছু একসঙ্গে কাজ করে।
১৯৯৪ সালের সেই দুর্ঘটনার পর একজন বাংলাদেশি প্রকৌশলী যে সমস্যাটিকে মানুষের চলাচলের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছিলেন, তাঁর সেই চিন্তার সঙ্গে পরবর্তী উন্নত ব্যবস্থার মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তবে বর্তমান জামারাত কমপ্লেক্সকে এককভাবে তাঁর ব্যক্তিগত নকশার ফল বলা ইতিহাসগতভাবে অতিরঞ্জিত হতে পারে।
‘ইঞ্জিনিয়ার ইব্রাহিম ফ্রম বাংলাদেশ’
মোহাম্মদ ইব্রাহিমকে নিয়ে প্রচলিত আরও একটি তথ্য হলো, মিনায় প্রকল্প এলাকার পাশে তাঁর পরিচয় ‘Engineer Ibrahim from Bangladesh’ বা ‘মোহান্দেস ইব্রাহিম মিনাল বাংলাদেশ’ হিসেবে প্রদর্শিত হয়েছিল। জাগো নিউজসহ কয়েকটি প্রতিবেদনে এমন তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এই দাবিরও স্বাধীন সৌদি সরকারি নথি বা বর্তমান স্থাপনার আনুষ্ঠানিক তথ্য দিয়ে নিশ্চিত প্রমাণ সহজে পাওয়া যায়নি। তাই এটি ফিচারে ‘বিভিন্ন প্রতিবেদনে এমন উল্লেখ রয়েছে’ হিসেবে উপস্থাপন করাই নিরাপদ।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে জাপান
প্রকাশিত জীবনীমূলক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোহাম্মদ ইব্রাহিম ১৯৪১ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার বাবুপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন স্কুলশিক্ষক। ১৯৬২ সালে তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পুরকৌশলে ভর্তি হন। পরে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে প্রকৌশল ডিগ্রি লাভ করেন এবং উচ্চশিক্ষার জন্য জাপানে যান।
পেশাজীবনে তিনি বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন—বিসিআইসির প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে অবসর নেন বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর লেখা ‘How to Build a Nice Home’ বইটির কথাও বিভিন্ন জীবনীমূলক প্রতিবেদনে পাওয়া যায়।
‘মুহিব্বুল খায়ের’ উপাধির দাবিটি কতটা নিশ্চিত?
মোহাম্মদ ইব্রাহিমকে ঘিরে সবচেয়ে প্রচলিত গল্পগুলোর একটি হলো—তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তৎকালীন সৌদি বাদশাহ ফাহাদ তাঁকে ‘মুহিব্বুল খায়ের’, অর্থাৎ ‘কল্যাণকামী’ উপাধি দিয়েছিলেন।
বাংলাদেশের কয়েকটি সংবাদমাধ্যম ও অনলাইন প্রকাশনায় এই তথ্য রয়েছে। কিন্তু তথ্য-যাচাইয়ের দৃষ্টিতে এটিও সতর্কতার সঙ্গে লেখা প্রয়োজন। অনলাইনে পাওয়া উৎসগুলোর বড় অংশ একই ধরনের বর্ণনা পুনরাবৃত্তি করছে; স্বাধীন সৌদি সরকারি নথি, রাজকীয় আদেশ বা পুরস্কারের প্রামাণ্য দলিল পাওয়া যায়নি। তাই এটিকে নিশ্চিত সরকারি স্বীকৃতি হিসেবে না লিখে ‘বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে’ বলা অধিক দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা।
‘পদদলিত হওয়া থামিয়ে দিয়েছিলেন’—কথাটি কি ঠিক?
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে প্রচারিত হয়—‘যে বাঙালি প্রকৌশলী হজে পদদলিত হওয়া থামিয়ে দিয়েছিলেন।’
শিরোনামটি আকর্ষণীয় হলেও ইতিহাসের বিচারে এটি কিছুটা অতিরঞ্জিত। কারণ জামারাতে পরবর্তী সময়েও দুর্ঘটনা ঘটেছে। সবচেয়ে বড় উদাহরণ ২০১৫ সালের মিনার ভয়াবহ পদদলন, যাতে বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রাণ হারান। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও সংবাদমাধ্যমের হিসাবে ওই ঘটনায় মৃতের সংখ্যা নিয়ে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।
অতএব, ইব্রাহিম ‘হজের পদদলন চিরতরে বন্ধ করে দিয়েছিলেন’—এমন দাবি সঠিক নয়। বরং তাঁর কৃতিত্বকে এভাবে বলা বেশি যুক্তিসঙ্গত: তিনি জামারাতে বিপুল মানুষের চলাচলকে নিরাপদ করার জন্য একমুখী ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা সামনে এনেছিলেন। এটি তাঁর প্রকৌশলগত চিন্তার মূল্যকে কমায় না; বরং তাঁকে ঘিরে প্রচলিত গল্পকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে।
একজন প্রকৌশলীর সবচেয়ে বড় পরিচয়
মোহাম্মদ ইব্রাহিমের গল্পের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক দিক সম্ভবত তাঁর পদবি বা পুরস্কার নয়। তিনি হজে গিয়ে একটি সমস্যা দেখেছিলেন। তারপর সেই সমস্যাকে শুধু ধর্মীয় আবেগের জায়গা থেকে না দেখে প্রকৌশলগত সমস্যা হিসেবে বিশ্লেষণ করেছিলেন।
প্রশ্ন করেছিলেন—মানুষ যদি একই জায়গায় বিপরীত দিক থেকে না আসে, যদি চলাচলের পথ আলাদা করা যায়, যদি জনস্রোতকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তাহলে কি প্রাণহানি কমানো সম্ভব?
এই প্রশ্ন থেকেই তৈরি হয়েছিল একটি পরিকল্পনা। আজকের দিনে পৃথিবীর অন্যতম বড় জনসমাগম ব্যবস্থাপনার উদাহরণ হিসেবে জামারাত কমপ্লেক্সকে দেখা হয়। আর বাংলাদেশের ইতিহাসে মোহাম্মদ ইব্রাহিমের নাম স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারে এই কারণে যে, তিনি বহু মানুষের একটি ভয়াবহ নিরাপত্তা সমস্যাকে নতুন চোখে দেখার সাহস করেছিলেন।
তিনি হয়তো হজের সব পদদলন বন্ধ করেননি। কিন্তু একটি ভয়াবহ সমস্যার সমাধানে তাঁর প্রকৌশলগত চিন্তা যে আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছিল—বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমে তার যথেষ্ট দলিল রয়েছে।
২০১৭ সালের ৮ জুলাই তাঁর মৃত্যুর খবরও বিভিন্ন বাংলাদেশি উৎসে প্রকাশিত হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক প্রকৌশলীর চিন্তা তাই আজও মিনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক অনন্য গল্প—একজন মানুষ কীভাবে নিজের পেশাগত জ্ঞানকে ব্যবহার করে লাখো মানুষের নিরাপত্তার কথা ভাবতে পারেন, তার একটি উদাহরণ।
মোহাম্মদ ইব্রাহিমের প্রকৃত উত্তরাধিকার হয়তো কোনো ফলক বা উপাধি নয়; বরং একটি সহজ প্রকৌশলগত শিক্ষা—বড় সমস্যার সমাধান কখনো কখনো শুরু হয় একজন মানুষের ‘কেন এমন হচ্ছে?’ প্রশ্ন থেকে।
আইফোন প্রেমীদের জন্য অ্যাপলের নতুন সব চমক
ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘ হওয়ার দায় পুতিন-জেলেনস্কির ওপর দিলো ট্রাম্প
৯০ বছরের পুরোনো গণিতের সমস্যা সমাধান করলো ওপেন এআই?