সর্বনাশা মোবাইল অ্যাপ!

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৬ এএম

অনলাইনে জুয়ার অ্যাপে আকর্ষণীয় অফার দেখে অ্যাকাউন্ট খুলেছিলেন ‘রাকিব’ (ছদ্মনাম)। ফ্রি সাড়ে ৩ হাজার টাকা ডিপোজিটের প্রলোভনে একটি অ্যাপ নামিয়ে শুরু করেন প্লেন ওড়ানো, কার্ড খেলা কিংবা ক্যাসিনোর মতো বিভিন্ন অনলাইন গেম। তখন তিনি হয়তো ভাবেননি, বিনোদন কিংবা দ্রুত অর্থ লাভের আশায় দেওয়া ব্যক্তিগত তথ্য একসময় সাইবার অপরাধীদের কাছে বিক্রির পণ্যে পরিণত হতে পারে।

রাকিবের মতো প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার বাংলাদেশি অনলাইন জুয়া ও ক্যাসিনো ব্যবহারকারীর তথ্য ডার্ক ওয়েবে বিক্রির জন্য তোলা হয়েছে বলে দাবি করেছে সাইবার অপরাধীদের একটি চক্র। তথ্যের মধ্যে রয়েছে ব্যবহারকারীর নাম, মোবাইল নম্বর, ইমেইল, জন্মতারিখ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট, প্লেয়ার আইডি, ইউজারনেম, কেওয়াইসি যাচাইয়ের অবস্থা, সর্বশেষ ডিপোজিট এবং অ্যাকাউন্টের ঝুঁকি-সংক্রান্ত তথ্য।

ডার্ক ওয়েবে ‘Neffex78’ এবং টেলিগ্রামভিত্তিক ‘Neffex THe BlackHat’ নামের একটি চ্যানেলে এসব তথ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। একই ডাটাসেট নিয়ে ‘Dark Web Intelligence’ নামের একটি এক্স অ্যাকাউন্ট থেকেও প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার ব্যবহারকারীর রেকর্ড থাকার দাবি করা হয়েছে।

স্যাম্পল ডাটায় মিলেছে বাংলাদেশিদের তথ্য

বিক্রির বিজ্ঞাপনের সঙ্গে দেওয়া স্যাম্পল ফাইল পরীক্ষা করে একাধিক বাংলাদেশির ইমেইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টের তথ্যের সঙ্গে মিল পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বাস্তব তথ্যের সঙ্গে স্যাম্পল ডাটার তথ্য যাচাই করে মিল পাওয়ায় বিষয়টি শুধু ডার্ক ওয়েবে দেওয়া কোনো মনগড়া বিজ্ঞাপন নয় বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপনে দাবি করা হয়েছে, ডাটাবেজটি ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের বাংলাদেশি অনলাইন জুয়া ও ক্যাসিনো ব্যবহারকারীদের তথ্য নিয়ে তৈরি। এতে আইডি, মার্চেন্ট, ইউজারনেম, প্লেয়ার আইডি, ভিআইপি লেভেল, অ্যাফিলিয়েট কোড, অ্যাফিলিয়েট ইউজারনেম, রেফারেল ইউজারনেম, এজেন্ট ইউজারনেম, নাম, কারেন্সি, গ্রুপ, ট্যাগ ম্যানেজমেন্ট, রিমার্ক ও স্ট্যাটাসসহ বিভিন্ন তথ্য থাকার কথা বলা হয়েছে।

এর পাশাপাশি মোবাইল নম্বর, ইমেইল, জন্মতারিখ, রেফারেল সাইট, ফিঙ্গারপ্রিন্ট এবং রেজিস্ট্রেশন-সংক্রান্ত তথ্যও রয়েছে বলে দাবি করেছে চক্রটি।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—ডাটাবেজে লাস্ট ডিপোজিট, কেওয়াইসি ভেরিফিকেশন স্ট্যাটাস, কেওয়াইসি রিমার্ক এবং ব্যবহারকারীর ঝুঁকি-সংক্রান্ত তথ্য থাকার দাবি করা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু পরিচয় বা যোগাযোগের তথ্য নয়, ব্যবহারকারীর জুয়া অ্যাকাউন্ট ও আর্থিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত তথ্যও এতে থাকতে পারে।

দাম ৭৮০ ডলার, লেনদেনে ক্রিপ্টোকারেন্সি

হ্যাকারদের বিজ্ঞাপন অনুযায়ী, পুরো ডাটাসেটের দাম চাওয়া হয়েছে ৭৮০ মার্কিন ডলার। ডাটাগুলো TXT ও TLS ফরম্যাটে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থ পরিশোধের মাধ্যম হিসেবে বিটকয়েন ও মনেরোর কথা উল্লেখ রয়েছে।

ডাটাবেজের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণের জন্য কয়েকটি স্যাম্পল ফাইলের লিংকও প্রকাশ করা হয়েছে। সেসব স্যাম্পল থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই করে একাধিক বাংলাদেশির ইমেইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টের সঙ্গে মিল পাওয়া গেছে।

ফলে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশি অনলাইন জুয়া ব্যবহারকারীদের এসব তথ্য কীভাবে সাইবার অপরাধীদের হাতে গেল?

তথ্যগুলো কোনো জুয়া প্ল্যাটফর্ম থেকে সরাসরি ফাঁস হয়েছে, নাকি এজেন্ট, অ্যাফিলিয়েট নেটওয়ার্ক কিংবা অন্য কোনো পক্ষের মাধ্যমে ডাটাগুলো বাইরে গেছে—তা এখনো নিশ্চিত নয়।

কোন কোন অ্যাপ থেকে তথ্য ফাঁসের আশঙ্কা

হ্যাকারদের দেওয়া জুয়ার অ্যাপসংক্রান্ত ছবিতে সাইবারলট, বোনানজা, বিগ বাক্স ব্যান্ডিট, ক্রিসমাস, লাকি, বুক অফ গডস, হোয়াইট র্যাবিট, বোনানজা মেগাওয়েজ, চকলেটস, টেম্পল অব ট্রেজার, হলি ডাইভার, কিং অব ক্যাটস, গোল্ডেন গ্যালন, মনোপলি মেগাওয়েজ, কুইন অব রিচেস, হু ওয়ান্টস টু বি আ মিলিয়নিয়ার: মিস্ট্রি বক্স, ট্রিগার হ্যাপি, কুইন অব এমবারস, বার্গারস, বিগ বক্স, মনোপলি, হু ওয়ান্টস টু বি আ মিলিয়নিয়ার এবং অ্যাটলান্টিস মেগাওয়েজের নাম দেখা গেছে।

ধারণা করা হচ্ছে, এসব অ্যাপ বা সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সংগ্রহ করা কোনো পর্যায়ের তথ্য থেকেই ডাটাবেজটি তৈরি হয়ে থাকতে পারে। তবে কোন অ্যাপ বা প্রতিষ্ঠানের সিস্টেম থেকে তথ্য ফাঁস হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

বড় ঝুঁকিতে ব্যবহারকারীরা

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ফাঁস হওয়া তথ্য অপরাধীদের হাতে গেলে ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে লক্ষ্যভিত্তিক প্রতারণার সুযোগ তৈরি হয়।

মোবাইল নম্বর, ইমেইল, জন্মতারিখ, আইপি ঠিকানা, ডিভাইসের তথ্য ও কেওয়াইসি রেকর্ড একসঙ্গে থাকলে অপরাধীরা পরিচয় চুরি, ফিশিং, অ্যাকাউন্ট দখল, আর্থিক প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইল কিংবা সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করতে পারে।

সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা বলেন, তিনি তথ্যগুলো যাচাই করে বাস্তব তথ্যের সঙ্গে মিল পেয়েছেন। ফলে বিষয়টিকে আর শুধু ডার্ক ওয়েবে দেওয়া কোনো দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। এটি একটি গুরুতর তথ্য ফাঁসের ঘটনা।

তিনি বলেন, ফাঁস হওয়া তথ্য ব্যবহার করে অপরাধীরা পরিচয় চুরি, ফিশিং, অ্যাকাউন্ট দখল, আর্থিক প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইল এবং সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করতে পারে। তবে এ পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

কী করবেন ব্যবহারকারীরা

তানভীর হাসান জোহা পরামর্শ দিয়েছেন, যারা অনলাইন জুয়া বা সন্দেহজনক কোনো প্ল্যাটফর্মে মোবাইল নম্বর, ইমেইল, পরিচয়পত্র কিংবা আর্থিক তথ্য দিয়েছেন, তারা দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ অনলাইন অ্যাকাউন্টগুলোর পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করবেন।

প্রতিটি অ্যাকাউন্টে আলাদা পাসওয়ার্ড ব্যবহারের পাশাপাশি দুই স্তরের নিরাপত্তা বা টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন (2FA) চালু করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার লেনদেন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। অপরিচিত ফোনকল, লিংক, অ্যাপ, লোভনীয় অফার কিংবা ভয় দেখিয়ে টাকা চাওয়ার ঘটনায় সাড়া না দেওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন তিনি।

একই সঙ্গে OTP, PIN বা কোনো ধরনের যাচাইকরণ কোড কাউকে দেওয়া যাবে না।

কেউ প্রতারণা বা ব্ল্যাকমেইলের শিকার হলে টাকা না দিয়ে ফোন নম্বর, লিংক, স্ক্রিনশট ও লেনদেনের তথ্য সংরক্ষণ করে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে আসছে বিষয়টি

ডাটাবেজ ফাঁসের বিষয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ এবং র‌্যাবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা এ বিষয়ে আগে কোনো তথ্য পাওয়ার কথা জানায়নি।

তবে ডিএমপির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ জানিয়েছে, বিষয়টি তারা খতিয়ে দেখবে। র‌্যাব জানিয়েছে, তাদের সাইবার টিম নিয়মিত এ ধরনের বিষয় নিয়ে কাজ করে। সরকারের পক্ষ থেকে দায়িত্ব দেওয়া হলে তারা প্রয়োজনীয় তদন্ত করে থাকে।

এই পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্ম বা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে তথ্য ফাঁসের উৎস শনাক্ত করা এবং সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবহারকারীদের দ্রুত সতর্ক করা জরুরি হয়ে উঠেছে।

কারণ, ডার্ক ওয়েবে কোনো ব্যক্তির তথ্য বিক্রির তালিকায় উঠে আসা মানেই শুধু ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ঝুঁকি নয়—সঠিক তথ্য অপরাধীদের হাতে গেলে তা পরবর্তী ধাপে ফিশিং, পরিচয় জালিয়াতি, অ্যাকাউন্ট দখল ও আর্থিক প্রতারণার হাতিয়ারেও পরিণত হতে পারে।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন