কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বদলে দিচ্ছে মার্কিন রাজনীতি

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৪২ পিএম

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিদের একের পর এক সতর্কবার্তা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন এক মোড় তৈরি করছে। মানবজাতির নিয়ন্ত্রণের বাইরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চলে যাওয়ার আশঙ্কা নিয়ে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নেতারা উদ্বেগ জানালেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রিপাবলিকান নেতৃত্ব এখনো এ প্রযুক্তির গতি কমানোর পক্ষে অবস্থান নেয়নি। বরং চীনের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিযোগিতাকে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে।

রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) ট্রাম্প বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে নেতিবাচক শক্তিগুলো এমন কিছু ঘটনার আশঙ্কা তৈরি করছে, যা আদতে ঘটবে না। প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসনও জরুরি আইন প্রণয়নের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে বলেন, প্রযুক্তি খাতের নেতারা চাইলে উন্নয়নের গতি কমাতে পারেন, তবে কংগ্রেসের তাড়াহুড়ো করে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয়।

রিপাবলিকানদের এই অবস্থানের বিপরীতে ডেমোক্র্যাটদের একটি অংশ দ্রুত সরকারি নিয়ন্ত্রণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাসহ কয়েকজন ডেমোক্র্যাট নেতা সতর্ক করে বলেছেন, সরকারের বাধ্যতামূলক নিয়ন্ত্রণ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এমন এক বিপজ্জনক সীমা অতিক্রম করতে পারে, যার পরিণতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠছে। এর অবকাঠামোর জন্য তৈরি বিশাল তথ্যকেন্দ্রগুলোর বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ বাড়ছে। এসব কেন্দ্র বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবহার করায় বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে এগুলোর নির্মাণ সাময়িক বন্ধ রাখার দাবিও জোরালো হচ্ছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কর্মসংস্থান হারানোর ভয়, বাড়তে থাকা বিদ্যুৎ বিল এবং প্রযুক্তি খাতের অল্পসংখ্যক ধনকুবেরের হাতে বিপুল ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার আশঙ্কা। চলতি মাসে এনবিসি নিউজের এক জরিপে ৭০ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে তাদের আগ্রহের চেয়ে উদ্বেগ বেশি। ফলে প্রযুক্তিটি এখন শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, জীবনযাত্রার ব্যয় ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও এর রাজনৈতিক যোগ তৈরি হয়েছে।

গত এক সপ্তাহে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই শনিবার প্রযুক্তিটির উন্নয়নের গতি কমানোর আহ্বান জানান। ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানও তাঁর সঙ্গে একমত হয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরে স্বাধীন মূল্যায়নকারী নিয়োগের প্রস্তাব দেন। এক্সএআইয়ের প্রধান ইলন মাস্ক এবং গুগলের ডিপমাইন্ডের চেয়ারম্যান ডেমিস হাসাবিসও আমোদেইয়ের বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানান।

এর আগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষক জ্যাকব কক্সন সতর্ক করে বলেছিলেন, প্রযুক্তি নির্মাণে যুক্ত ব্যক্তিরাই মনে করেন, এই দশকের শেষ নাগাদ এটি মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তবে সমালোচকদের কেউ কেউ এসব আশঙ্কাকে অতিরঞ্জিত বলে মনে করছেন। তাদের মতে, প্রযুক্তি খাতের বড় ব্যক্তিরা নিজেদের পণ্যের গুরুত্ব বাড়াতেও এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা বলতে পারেন।

ট্রাম্প প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণমুক্ত বাজারনীতিও বিতর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে। ট্রাম্প নিজেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়ন ধীর করার বিরোধিতা করছেন। তাঁর যুক্তি, যুক্তরাষ্ট্র এ ক্ষেত্রে চীনের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে এবং গতি কমালে সামরিক ও প্রযুক্তিগত সুবিধা প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের হাতে চলে যেতে পারে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের পরিচালক কেভিন হ্যাসেটও সতর্ক করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র পিছিয়ে পড়লে এমন কোনো ক্ষতিকর পক্ষ উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হাতে পেতে পারে, যা জৈব অস্ত্র তৈরির মতো কাজে তা ব্যবহার করবে।

তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বিদলীয় উদ্বেগও বাড়ছে। রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজ বলেছেন, এ ক্ষেত্রে আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। স্বাধীন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স অতিবুদ্ধিমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ এবং কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ না হওয়া পর্যন্ত উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ সাময়িক স্থগিত রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন। রিপাবলিকান সিনেটর জশ হাওলিও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার স্বয়ংক্রিয় কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত শুরু করেছেন।

ডেমোক্র্যাটরা অবশ্য বিষয়টিকে মধ্যবর্তী নির্বাচনের জন্য বড় রাজনৈতিক সুযোগ হিসেবে দেখছে। প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফরিস কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়নের গতি কমাতে কংগ্রেসকে সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সিনেটর রুবেন গ্যালেগো বলেছেন, পারমাণবিক অস্ত্র নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে তা ব্যবহার করতে পারে না, কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে এমন সক্ষমতা তৈরি হতে পারে।

ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিতর্ক এখন প্রযুক্তির সীমা ছাড়িয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও জাতীয় ভবিষ্যতের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচন ও ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে এই উদ্বেগ আরও বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির গতিপথও বদলে যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি দাঁড়াচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে নিয়ন্ত্রণ করবে মানুষ, নাকি একসময় মানুষকেই নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে যন্ত্র? সূত্র: সিএনএন

এএস
আরও পড়ুন