বিশ্বের আর্থিক মানচিত্রে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকিং খাতের অবস্থান আলাদা। একসময় ‘সুইস ব্যাংক’ বললেই সামনে আসত গোপনীয়তা, অজ্ঞাতপরিচয় আমানত এবং বিপুল সম্পদের নিরাপদ আশ্রয়ের ধারণা। কিন্তু সময় বদলেছে। আন্তর্জাতিক কর-স্বচ্ছতা, মানি লন্ডারিংবিরোধী আইন এবং কঠোর গ্রাহক যাচাইয়ের কারণে সেই পুরোনো সুইস ব্যাংকিং ব্যবস্থা এখন অনেকটাই বদলে গেছে।
আজকের সুইস ব্যাংকিংয়ের মূল শক্তি শুধু গোপনীয়তা নয়; বরং সম্পদ ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, আর্থিক স্থিতিশীলতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং আইনি কাঠামো।
তাহলে সুইস ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলতে কত টাকা লাগে? বিদেশি নাগরিকদের কী শর্ত পূরণ করতে হয়? ব্যাংক কীভাবে অর্থের উৎস যাচাই করে? আমানতকারী দেউলিয়া হয়ে গেলে কত টাকা সুরক্ষিত থাকে? আর সুইস ব্যাংকে টাকা রাখলে সেই তথ্য কি নিজ দেশের সরকারের কাছ থেকে গোপন রাখা সম্ভব?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই ভাঙতে হয় ‘সুইস ব্যাংক মানেই গোপন টাকা’—এই পুরোনো ধারণা।
সর্বনিম্ন কত টাকা লাগে?
সুইস ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য একটি নির্দিষ্ট সর্বনিম্ন আমানত সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। ব্যাংক, অ্যাকাউন্টের ধরন, গ্রাহকের বসবাসের দেশ, ব্যাংকের ব্যবসায়িক মডেল এবং গ্রাহকের ঝুঁকি-প্রোফাইল অনুযায়ী শর্ত পরিবর্তিত হয়।
সাধারণ খুচরা ব্যাংকিং, ডিজিটাল ব্যাংকিং, বিনিয়োগ অ্যাকাউন্ট এবং প্রাইভেট ব্যাংকিং—সবগুলোর প্রবেশ-শর্ত এক নয়।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অনেক ব্যাংক বড় অঙ্কের সম্পদ থাকা গ্রাহকদের লক্ষ্য করে। ফলে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে কয়েক লাখ সুইস ফ্রাংকের সম্পদ দিয়ে সেবা পাওয়া গেলেও শীর্ষ পর্যায়ের প্রাইভেট ব্যাংকিংয়ে কয়েক মিলিয়ন ফ্রাংকের সম্পদ প্রত্যাশিত হতে পারে।
তাই ‘সুইস ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলতে অন্তত ১০ লাখ বা ৫০ লাখ ফ্রাংক লাগবেই’—এমন কোনো একক সুইস আইন নেই।
বাস্তবে কত টাকা প্রয়োজন হবে, সেটি ব্যাংক ও সেবার ধরন নির্ধারণ করে।
বিদেশি গ্রাহকের জন্য শর্ত কেন কঠোর?
সুইজারল্যান্ডের বাইরে বসবাসকারী কোনো গ্রাহকের ক্ষেত্রে ব্যাংকের ঝুঁকি যাচাই তুলনামূলক জটিল হতে পারে। গ্রাহক কোন দেশে থাকেন, তার অর্থের উৎস কী, কর-নিবাস কোথায়, তিনি কোন ধরনের ব্যবসা করেন এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বা মানি লন্ডারিংয়ের ঝুঁকি আছে কি না—এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়।
ফলে একটি ব্যাংক কোনো নির্দিষ্ট অঙ্কের ন্যূনতম সম্পদ ঘোষণা করলেও বাস্তবে গ্রাহক গ্রহণের সিদ্ধান্ত শুধু ওই অঙ্কের ওপর নির্ভর করে না।
বিশেষ করে উচ্চঝুঁকির গ্রাহক, রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা জটিল আন্তর্জাতিক সম্পদ কাঠামোর ক্ষেত্রে যাচাই আরও গভীর হতে পারে।
সুইজারল্যান্ড বর্তমানে Automatic Exchange of Information বা AEOI ব্যবস্থার অংশ। এই ব্যবস্থার আইনি ভিত্তি ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি কার্যকর হয় এবং বর্তমানে সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে ১০০টিরও বেশি রাষ্ট্র ও অঞ্চলের তথ্য বিনিময় ব্যবস্থা রয়েছে।
এর ফলে যোগ্য বিদেশি কর-নিবাসীদের আর্থিক হিসাবসংক্রান্ত নির্দিষ্ট তথ্য সংশ্লিষ্ট দেশের কর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিনিময় হতে পারে।
২০২৬ সালেও সুইজারল্যান্ড AEOI কাঠামো আরও হালনাগাদ করছে এবং অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময় ব্যবস্থার বাস্তবায়ন নিয়মিত পর্যালোচনা করছে।
তাই পুরোনো দিনের মতো ‘সুইস ব্যাংকে টাকা রাখলে কেউ জানতে পারবে না’—এই ধারণা এখন আর বাস্তব নয়।
নাম্বারযুক্ত অ্যাকাউন্ট কি এখনো আছে?
‘Numbered Account’ নিয়ে সুইস ব্যাংককে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নানা গল্প প্রচলিত।
বাস্তবে নাম্বারযুক্ত অ্যাকাউন্ট মানে গ্রাহকের পরিচয় সম্পূর্ণ অজানা থাকা নয়। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ রেকর্ডে প্রকৃত গ্রাহকের পরিচয় সংরক্ষিত থাকে এবং প্রযোজ্য আইন ও আন্তর্জাতিক কর-তথ্য বিনিময় ব্যবস্থার আওতায় সেই তথ্য রিপোর্টিংয়ের বাইরে থাকে না।
অর্থাৎ নাম্বারযুক্ত অ্যাকাউন্ট আর বেনামী অ্যাকাউন্ট—দুটি এক বিষয় নয়।
PEP হলে কী হয়?
রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা Politically Exposed Person (PEP) হলে ব্যাংকের যাচাই আরও কঠোর হতে পারে।
কারণ উচ্চপদস্থ রাজনৈতিক ব্যক্তি, সরকারি কর্মকর্তা কিংবা তাদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ও পরিবারের সদস্যদের ক্ষেত্রে অবৈধ অর্থ, ঘুষ বা ক্ষমতার অপব্যবহারজনিত অর্থের ঝুঁকি বেশি বিবেচনা করা হয়।
তাই PEP গ্রাহকের ক্ষেত্রে ব্যাংক অতিরিক্ত নথি, অর্থের উৎস এবং সম্পদের উৎস যাচাই করতে পারে।
তবে ‘PEP হলেই ৫০ লাখ বা ২ কোটি ৫০ লাখ ফ্রাংক বাধ্যতামূলক’—এমন কোনো সর্বজনীন সুইস ব্যাংকিং নিয়ম নেই। ব্যাংক নিজস্ব ঝুঁকি-ভিত্তিক নীতি অনুযায়ী গ্রাহক গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়।
দুর্গাপূজায় সরকারি ছুটি কবে?
এমি অ্যাওয়ার্ডসে ইতিহাস গড়লেন ম্যাথিউ রিস
গাজার হাসপাতালে ডিজেল সরবরাহ বন্ধ করছে ডব্লিউএইচও