ইসরায়েলের দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে স্থাপিত বসতিগুলো থেকে পণ্য আমদানি ঠেকাতে ইউরোপের একাধিক দেশ নিষেধাজ্ঞার পথে হাঁটছে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—ইসরায়েলি বসতিতে উৎপাদিত পণ্যকে সাধারণ ইসরায়েলি পণ্য থেকে আলাদা করে শনাক্ত করা কতটা সম্ভব এবং সীমান্তে তা কার্যকরভাবে ঠেকানো যাবে কীভাবে?
নেদারল্যান্ডস এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। দেশটির সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ২২ সেপ্টেম্বর থেকে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি থেকে উৎপাদিত পণ্য আমদানি, কেনাবেচা এবং এসব পণ্যের বাণিজ্য সহজ করে এমন মধ্যস্থতামূলক সেবাও নিষিদ্ধ হবে। নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টাও অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
‘ইসরায়েল’ লেখা থাকলেই কি পণ্যটি ইসরায়েলের?
সমস্যার বড় জায়গাটি এখানেই।
আমস্টারডামের সুপারমার্কেটে বিক্রি হওয়া কোনো খেজুরের প্যাকেটে যদি উৎপত্তিস্থল হিসেবে শুধু ‘Israel’ লেখা থাকে, তাহলে সেটি ইসরায়েলের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ভূখণ্ডে উৎপাদিত, নাকি অধিকৃত পশ্চিম তীরের কোনো বসতিতে উৎপাদিত—তা সহজে বোঝার উপায় নাও থাকতে পারে।
আল-জাজিরার প্রতিবেদনে এমন খেজুরের চালানের উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গবেষকদের হাতে পাওয়া কাস্টমস নথিতে গত ছয় মাসে অধিকৃত ভূখণ্ড থেকে নেদারল্যান্ডসে নয়টি খেজুরের চালান প্রবেশের তথ্য পাওয়া গেছে; এর বেশির ভাগের লেবেলে উৎপত্তিস্থল হিসেবে ইসরায়েলের নাম ছিল।
ফলে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে শুধু সীমান্তে পণ্য পরীক্ষা করাই যথেষ্ট নয়। উৎপাদনস্থল, সরবরাহকারী, রপ্তানিকারক, কাস্টমস নথি এবং পণ্যের লেবেল—সবকিছুর মধ্যে সামঞ্জস্য যাচাই করতে হবে।
কেন এত গুরুত্ব বসতি-পণ্যে?
ইসরায়েলি বসতি নিয়ে ইউরোপের অবস্থান গত কয়েক বছরে আরও কঠোর হয়েছে। ২০২৪ সালের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (ICJ) পরামর্শমূলক মতামতে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের অব্যাহত উপস্থিতিকে আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বলা হয়েছিল। ইউরোপের বিভিন্ন সরকার তাদের বাণিজ্যিক নীতির ক্ষেত্রে সেই আইনি অবস্থানকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছে।
৮ সেপ্টেম্বর কানাডা, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সসহ মোট ১২টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা যৌথ বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে অবৈধ বলে বিবেচিত ইসরায়েলি বসতিগুলোর সঙ্গে পণ্য বাণিজ্যে জাতীয় বা ইউরোপীয় বিধিনিষেধ আরোপের অভিপ্রায় ঘোষণা করেন।
এর মধ্যে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডা নতুন জাতীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে আয়ারল্যান্ড, স্পেন, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে ও বেলজিয়াম ইতোমধ্যে বসতি-পণ্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।
ইউরোপের ঐক্যবদ্ধ নিষেধাজ্ঞা কি আসছে?
এখন পর্যন্ত পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়নি। সদস্য দেশগুলোর অবস্থানেও পার্থক্য রয়েছে।
তবে একাধিক দেশের সমন্বিত উদ্যোগ ইউরোপীয় পর্যায়ে চাপ বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডার সাম্প্রতিক ঘোষণা এই বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।
আল-জাজিরার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইসরায়েল-ইইউ বাণিজ্য মোট পরিমাণে বড় হলেও বসতি থেকে আসা পণ্য তার তুলনায় খুবই ছোট অংশ। ফলে অর্থনৈতিক প্রভাবের চেয়ে এসব নিষেধাজ্ঞার রাজনৈতিক ও প্রতীকী গুরুত্ব বেশি হতে পারে।
নেদারল্যান্ডসের সামনে কঠিন পরীক্ষা
নেদারল্যান্ডসের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞাটি শুধু আমদানিতে সীমাবদ্ধ নয়। সরকারি কাস্টমস নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বসতি থেকে আসা পণ্য আমদানি, নেদারল্যান্ডসে কেনাবেচা এবং এসব পণ্যের বাণিজ্য সম্ভব করে এমন মধ্যস্থতামূলক সেবাও নিষিদ্ধ হবে।
এর অর্থ হলো, কোনো কোম্পানি যদি পণ্যটির প্রকৃত উৎপাদনস্থল গোপন করে সেটিকে ইসরায়েলি পণ্য হিসেবে বাজারজাত করে, তাহলে কর্তৃপক্ষকে সরবরাহ শৃঙ্খলের বিভিন্ন স্তরে তদন্ত করতে হবে।
এখানেই বাস্তব প্রয়োগের জটিলতা।
একটি পণ্যের গায়ে ‘Israel’ লেখা থাকলেই তার প্রকৃত উৎপাদনস্থল নিশ্চিত করা যায় না। আবার প্রতিটি চালানের খামার, কারখানা বা বসতির অবস্থান যাচাই করাও কাস্টমসের জন্য সময়সাপেক্ষ হতে পারে।
শুধু পণ্য নয়, সেবাও প্রশ্নের মুখে
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর একটি অংশ বলছে, নিষেধাজ্ঞা শুধু বসতিতে উৎপাদিত পণ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে তা যথেষ্ট নয়।
তাদের যুক্তি হলো—বসতি-ভিত্তিক পর্যটন, অনলাইন বুকিং, নির্মাণ, আর্থিক সেবা ও অন্যান্য বাণিজ্যিক কার্যক্রমও বসতি অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
এ কারণে কিছু সংগঠন বসতি-সংশ্লিষ্ট সেবার ওপরও নিষেধাজ্ঞার দাবি তুলেছে। তবে কোন সেবা সরাসরি বসতি অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং কোনটি সাধারণ ইসরায়েলি অর্থনীতির অংশ—এটি নির্ধারণ করাও আইনগত ও প্রশাসনিকভাবে জটিল।
যুক্তরাজ্যের নতুন ব্যবস্থায় বসতি থেকে পণ্য আমদানির পাশাপাশি বসতি সম্প্রসারণে সহায়তাকারী কিছু সেবাকেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া
ইসরায়েল এসব পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডার ঘোষণার পর ইসরায়েল যুক্তরাজ্যের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধের ঘোষণা এবং কিছু ব্রিটিশ নাগরিকের ওপর প্রবেশ-নিষেধাজ্ঞার কথা জানিয়েছে।
অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট ইউরোপীয় সরকারগুলোর বক্তব্য হলো, বসতি-পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা ইসরায়েলের সঙ্গে সামগ্রিক বাণিজ্য বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নয়; বরং অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বসতি স্থাপন ও সম্প্রসারণের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা কমানোর পদক্ষেপ।
সামনে আসল প্রশ্ন—নিষেধাজ্ঞা কতটা কার্যকর হবে?
ইউরোপের জন্য এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা আইন পাস করা নয়, আইন প্রয়োগ করা।
বসতি-পণ্যের প্রকৃত উৎস শনাক্ত করতে হলে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে কাস্টমস তথ্য বিনিময়, উৎপাদনস্থলের নির্ভরযোগ্য তথ্য, সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতা এবং কোম্পানিগুলোর নথিপত্র যাচাইয়ের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
নইলে একটি পণ্য বসতিতে উৎপাদিত হলেও যদি কাগজপত্রে শুধু ‘Israel’ লেখা থাকে, সেটি নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে কি না—সেই প্রশ্ন থেকেই যাবে।
আর এ কারণেই ইউরোপের বর্তমান উদ্যোগ শুধু ইসরায়েলি বসতি-পণ্য নিষিদ্ধ করার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি একই সঙ্গে বাণিজ্যিক ট্রেসেবিলিটি, কাস্টমস নজরদারি এবং আন্তর্জাতিক আইন বাস্তবায়নের একটি বড় পরীক্ষা।
২২ সেপ্টেম্বর নেদারল্যান্ডসের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার পর বাস্তবে কতটি চালান আটকানো হয়, কতটি প্রতিষ্ঠানকে তদন্তের আওতায় আনা হয় এবং পণ্যের উৎপত্তি শনাক্ত করতে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়—সেদিকেই এখন নজর থাকবে।