সংসদের তিন অধিবেশনে ব্যয় ৭০৩ কোটি টাকা

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:১৩ পিএম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম তিন অধিবেশনে ৬০ কার্যদিবস অধিবেশন পরিচালনায় ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭০৩ কোটি টাকা। হিসাব অনুযায়ী, এক মিনিট সংসদ অধিবেশন চললে সরকারের ব্যয় হয় গড়ে ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৮২৫ টাকা। অর্থাৎ প্রতি সেকেন্ডে ব্যয় হয় প্রায় ৫ হাজার ৯৪৭ টাকা।

তবে সংসদের মূল কাজ আইন প্রণয়নে সময় ব্যয়ের চিত্র ভিন্ন। প্রথম তিন অধিবেশনে বিভিন্ন বিল পাস, প্রশ্নোত্তর ও অন্যান্য কার্যক্রম চললেও আইন প্রণয়নে তুলনামূলক কম সময় ব্যয় হয়েছে। এর বিপরীতে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা, বাজেটের সাধারণ আলোচনা এবং বিভিন্ন বিতর্কে উল্লেখযোগ্য সময় ব্যয় হয়েছে।

দেশের স্থানীয় এক পত্রিকার প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ‘পার্লামেন্ট ওয়াচ’ গবেষণায় একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম ২২টি অধিবেশনে প্রতি মিনিটে গড় পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ লাখ ৭২ হাজার ৩৬৪ টাকা। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির প্রভাব সমন্বয় করলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৮২৫ টাকা। সে হিসাবে বর্তমানে সংসদে প্রতি সেকেন্ডে ব্যয় হচ্ছে ৫ হাজার ৯৪৭ টাকা।

৬০ কার্যদিবসে ব্যয় ৭০৩ কোটি টাকা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয় ১২ মার্চ এবং শেষ হয় ৩০ এপ্রিল। এ অধিবেশনে সংসদ বসে ২৫ কার্যদিবস।

দ্বিতীয় বা বাজেট অধিবেশন চলে ৭ জুন থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত। এ অধিবেশনে কার্যদিবস ছিল ২৬টি। তৃতীয় অধিবেশন শুরু হয় ২৭ আগস্ট এবং শেষ হয় ১০ সেপ্টেম্বর। এ অধিবেশনে সংসদ বসে নয় কার্যদিবস।

সব মিলিয়ে প্রথম তিন অধিবেশনে সংসদ বসেছে ৬০ কার্যদিবস। সংসদ সচিবালয়ে অধিবেশন কত ঘণ্টা চলেছে, তার সম্মিলিত হিসাব না থাকলেও অধিবেশন শুরু ও শেষের সময় এবং বিভিন্ন বিরতি বিবেচনায় গড় মেয়াদ প্রায় ৫ ঘণ্টা ৪৭ মিনিট।

এই হিসাবে প্রথম তিন অধিবেশনে মোট ৩২৮ ঘণ্টা ২০ মিনিট বা ১৯ হাজার ৭০০ মিনিট অধিবেশন চলেছে। প্রতি মিনিটে ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৮২৫ টাকা ব্যয় ধরে মোট ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৭০২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।

রাষ্ট্রপতির ভাষণের আলোচনায় ব্যয় ৮৬ কোটি টাকা

চলতি বছরের ১২ মার্চ জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বর্ষ শুরুর ভাষণের ওপর ৪০ ঘণ্টা ১৪ মিনিট আলোচনা হয়। এতে অংশ নেন ২৮০ জন সংসদ সদস্য। প্রতি মিনিটের ব্যয়ের হিসাবে শুধু এই আলোচনাতেই সরকারের খরচ হয়েছে প্রায় ৮৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা।

রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়ার সময় জামায়াত-এনসিপি জোটের সদস্যরা সংসদে বিক্ষোভ করে ভাষণ বর্জন করেন। পরে ভাষণের ওপর সাধারণ আলোচনার জন্য ৫০ ঘণ্টা সময় বরাদ্দের প্রস্তাবও তাদের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়।

বাজেট আলোচনায় ব্যয় ১০৪ কোটি টাকা

দ্বিতীয় অধিবেশনে বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা হয় ৪৮ ঘণ্টা ৫১ মিনিট। এতে অংশ নেন ৩১৬ জন সংসদ সদস্য। মোট ২ হাজার ৯৩১ মিনিটের এ আলোচনায় সরকারের ব্যয় হয়েছে প্রায় ১০৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।

তবে সংসদের সব ব্যয়কে অপ্রয়োজনীয় বলা যায় না। প্রশ্নোত্তর, আইন প্রণয়ন, সংসদীয় কমিটির কাজ, নোটিশের নিষ্পত্তি, প্রশাসনিক কার্যক্রম ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সংসদ রাষ্ট্র পরিচালনায় ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে দীর্ঘ বিতর্ক, ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক আক্রমণ এবং অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্যের কারণেও অধিবেশনের সময় ব্যয় হয়।

আইন প্রণয়নে তুলনামূলক কম সময়

ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে ৯৪টি বিল পাস এবং ১৩৩টি অধ্যাদেশ উত্থাপন করা হয়। প্রধানমন্ত্রীকে করা ৯৩টি প্রশ্নের মধ্যে ৩৫টির উত্তর দেওয়া হয়। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের জন্য পাওয়া ২ হাজার ৫০৯টি প্রশ্নের মধ্যে ১ হাজার ৭৭৮টির উত্তর দেওয়া হয়।

বাজেট অধিবেশনে ১০টি সরকারি বিল পাস হয়। তৃতীয় অধিবেশনের নয় কার্যদিবসে পাস হয়েছে ছয়টি বিল। একই অধিবেশনে বিভিন্ন সংসদীয় কমিটি গঠন ও পুনর্গঠন করা হয়।

তবে তৃতীয় অধিবেশনে মাত্র নয় কার্যদিবসে ছয়টি বিল উত্থাপন ও পাসের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালও বিল দ্রুত সংসদে পাঠানোর বিষয়ে নির্বাহী বিভাগের সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর সংসদ সদস্যদের বিল ভালোভাবে পড়ার সুযোগ দিতে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া প্রয়োজন।

সময়ের সঙ্গে বাড়ছে পরিচালন ব্যয়

সময়ের সঙ্গে সংসদ পরিচালনার ব্যয়ও বেড়েছে। টিআইবির বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, অষ্টম জাতীয় সংসদে প্রতি মিনিটে ব্যয় ছিল প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। নবম সংসদের আটটি অধিবেশনে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৭৮ হাজার টাকা।

দশম সংসদের ১৪তম থেকে ১৮তম অধিবেশনে প্রতি মিনিটে গড় ব্যয় ছিল ১ লাখ ৬৩ হাজার ৬৮৬ টাকা। একাদশ সংসদের প্রথম ২২ অধিবেশনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭২ হাজার ৩৬৪ টাকা।

২০২৬-২৭ অর্থবছরে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের মোট প্রস্তাবিত বাজেট ২৯০ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এর মধ্যে পরিচালন খাতে ২৮৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা এবং উন্নয়ন খাতে ৭০ লাখ টাকা রাখা হয়েছে।

সংসদ ভবনের রক্ষণাবেক্ষণেও বড় ব্যয়

বিশ্বখ্যাত স্থপতি লুই আই কানের নকশায় নির্মিত জাতীয় সংসদ ভবনের রক্ষণাবেক্ষণেও প্রতিবছর বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। বিশেষ প্রকল্পসহ কোনো কোনো বছর ভবনের ভৌত ও তড়িৎ-যান্ত্রিক রক্ষণাবেক্ষণে ৫০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে।

এর সঙ্গে নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ, অগ্নিনিরাপত্তা, সম্প্রচার, গণপূর্তের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব ও অতিরিক্ত সময়ের পারিশ্রমিকসহ নানা ব্যয় যুক্ত হয়।

সংসদবিষয়ক গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ বলেন, আইন প্রণয়নে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া প্রয়োজন। বিলের প্রতিটি ধারা ভালোভাবে পর্যালোচনা এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ থাকলে আরও কার্যকর ও টেকসই আইন প্রণয়ন সম্ভব।

জাতীয় সংসদের অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক কামরুল ইসলাম বলেন, সংসদের বার্ষিক বাজেটকে শুধু অধিবেশনভিত্তিক ব্যয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না। নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ, সম্প্রচার, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সেবার ব্যয়ও বিবেচনায় নিতে হবে। তবে কোন দপ্তরে কত টাকা এবং কোন অধিবেশনে কত ব্যয় হচ্ছে, তার সমন্বিত হিসাব এখনো হয়নি।

এএম
আরও পড়ুন