‘হাইব্রিড হামলা’র আশঙ্কায় ইউরোপ, রাশিয়াকে ঘিরে কেন বাড়ছে উদ্বেগ

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:১৭ পিএম

ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব এখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই—এমন আশঙ্কায় ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নিরাপত্তা প্রস্তুতি জোরদার করা হচ্ছে। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পাশাপাশি সাইবার আক্রমণ, নাশকতা, তথ্যযুদ্ধ এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলার মতো সম্ভাব্য কর্মকাণ্ডকে ‘হাইব্রিড হুমকি’ হিসেবে দেখছে ইউরোপীয় দেশগুলো। বিশেষ করে রাশিয়াকে ঘিরে সাম্প্রতিক গোয়েন্দা তথ্য ও একাধিক সতর্কবার্তার পর উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

১৭ সেপ্টেম্বর পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক বলেন, গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী আগামী কয়েক মাসে ইউক্রেনকে সমর্থনকারী দেশগুলোর বিরুদ্ধে রাশিয়ার ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকি রয়েছে। পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তবর্তী এক বা একাধিক ন্যাটো দেশের ভূখণ্ডে হামলার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না বলে সতর্ক করেন তিনি।

টাস্কের মতে, এ ধরনের কোনো হামলার লক্ষ্য শুধু সামরিক ক্ষয়ক্ষতি নয়; ন্যাটোর সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থায় ফাটল ধরানো এবং সম্মিলিত প্রতিক্রিয়ার সক্ষমতা দুর্বল করাও হতে পারে।

পোল্যান্ডের পর একই ধরনের সতর্কতা দেয় লিথুয়ানিয়া। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী কেস্তুতিস বুদরিস জানান, পোল্যান্ডসহ মিত্র দেশগুলোর মতো লিথুয়ানিয়ার কাছেও একই ধরনের গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে। সম্ভাব্য ‘ফলস-ফ্ল্যাগ’ অভিযান নিয়েও মিত্রদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।

হাইব্রিড যুদ্ধ বলতে কী বোঝায়

সরাসরি সামরিক সংঘাতের বাইরে কোনো দেশের ওপর চাপ সৃষ্টি বা অস্থিতিশীলতা তৈরির বিভিন্ন পদ্ধতির সমন্বয়কে সাধারণভাবে ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’ বলা হয়। এর মধ্যে সাইবার হামলা, নাশকতা, ড্রোন হামলা, ভুয়া তথ্য ছড়ানো, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে বিঘ্ন সৃষ্টি কিংবা সরবরাহব্যবস্থাকে দুর্বল করার মতো কর্মকাণ্ড থাকতে পারে।

ইউরোপের আশঙ্কার বড় কারণ হলো—এ ধরনের কর্মকাণ্ড সব সময় সরাসরি যুদ্ধের ঘোষণা বা সামরিক হামলার মতো দৃশ্যমান নাও হতে পারে। ফলে কোনো ঘটনা ঘটলে তার উৎস শনাক্ত করা এবং এর জবাব কীভাবে দেওয়া হবে, সেটিও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ১৮ সেপ্টেম্বর বলেন, ফ্রান্সসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে রাশিয়ার হাইব্রিড হুমকি বেড়েছে। এরপর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা শিল্পের সংবেদনশীল স্থাপনাগুলোকে ড্রোন ও সাইবার হামলা থেকে সুরক্ষায় অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাবও সম্ভাব্য নাশকতা ও ড্রোন হামলার মতো পরিস্থিতির জন্য জনগণকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে একই সঙ্গে আতঙ্কিত না হয়ে পরিস্থিতি শান্তভাবে মোকাবিলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

বেসামরিক প্রস্তুতিও বাড়ছে

নিরাপত্তা উদ্বেগের প্রভাব সামরিক ক্ষেত্রের বাইরেও পড়েছে। সম্ভাব্য বড় ধরনের সংকটে জরুরি পরিষেবা কীভাবে সচল রাখা যায়, তা নিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ পরিকল্পনা করছে।

জার্মানিতে যুদ্ধ বা ব্যাপক হতাহতের পরিস্থিতিতে হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা ও প্রস্তুতি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। লিথুয়ানিয়া বড় ধরনের সামরিক জরুরি অবস্থা বা সংকটের সময় সাধারণ মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা তৈরি করেছে।

ন্যাটো সদস্য নয়—এমন সুইজারল্যান্ডও নতুন নিরাপত্তা কৌশলে ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ, হাইব্রিড হুমকি এবং গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ ও অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীলতাকে বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বেসামরিক নাগরিক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সুরক্ষা বাড়ানোর পাশাপাশি ড্রোন ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধির কথাও এতে রয়েছে।

ন্যাটোর অবস্থান কী

রাশিয়া ন্যাটোর কোনো সদস্য দেশে আসন্ন সামরিক হামলা চালাতে যাচ্ছে—এমন ঘোষণা দেয়নি জোটটি। তবে ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে রাশিয়ার সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডকে ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। মিত্রদেশগুলোর আকাশসীমায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রবেশ এবং ইউরোপীয় অবকাঠামো ঘিরে সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জোটটি।

ফলে ইউরোপের বর্তমান প্রস্তুতির মূল লক্ষ্য সরাসরি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হওয়া নয়; বরং সম্ভাব্য হামলা, নাশকতা বা সাইবার আক্রমণের ক্ষেত্রে প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানো এবং জরুরি পরিষেবা সচল রাখার সক্ষমতা তৈরি করা।

সব মিলিয়ে, ইউরোপে রাশিয়ার বড় ধরনের সরাসরি হামলা আসন্ন—এমন কোনো নিশ্চিত ঘোষণা নেই। তবে ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে প্রচলিত যুদ্ধের বাইরের ঝুঁকি, বিশেষ করে ড্রোন হামলা, সাইবার আক্রমণ ও নাশকতা নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর সতর্কতা যে আগের চেয়ে বেড়েছে, সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোতে তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

এমএ
আরও পড়ুন