অস্ত্রভাণ্ডার কমে যাওয়ার খবর প্রত্যাখ্যান ট্রাম্পের

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:১৭ পিএম

ইরানের সঙ্গে প্রায় সাত মাস ধরে চলা যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারে ঘাটতি দেখা দিয়েছে, এমন প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ব্যবহারের চেয়েও বেশি গোলাবারুদ রয়েছে এবং বর্তমানে অস্ত্রের মজুত আরও দ্রুত বাড়ানো হচ্ছে।

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডার কমে যাওয়ার খবর যারা ছড়াচ্ছে, তারা ‘কাপুরুষ ও বিশ্বাসঘাতক’। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ রয়েছে এবং তা এমন মাত্রায় উৎপাদন ও মজুত করা হচ্ছে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যত গোলাবারুদ রয়েছে, আমরা যতটা ব্যবহার করতে পারি তার চেয়েও বেশি। এখন আমরা সেই মজুত অভূতপূর্ব মাত্রায় বাড়াচ্ছি।

অস্ত্রের মজুত নিয়ে প্রশ্ন উঠছে কেন?
ট্রাম্পের বক্তব্যের বিপরীতে সাম্প্রতিক কয়েকটি মার্কিন সরকারি ও প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট কিছু অস্ত্রের মজুত এবং দ্রুত পুনঃসরবরাহের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের ইন্সপেক্টর জেনারেলের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ইরানবিরোধী সামরিক অভিযানে ফেব্রুয়ারি থেকে জুনের শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ২২ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের গোলাবারুদ ব্যবহার করেছে। প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট কিছু অস্ত্রের মজুতে ঘাটতি এবং উৎপাদন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া সম্প্রতি প্রকাশিত এক মার্কিন সামরিক হিসাব অনুযায়ী, ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইরান যুদ্ধের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের (সিবিও) হিসাব অনুযায়ী, ১ আগস্ট পর্যন্ত যুদ্ধের ব্যয় ছিল প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলার এবং যুদ্ধ চলতে থাকলে প্রতি মাসে আরও প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে।

বিশেষ উদ্বেগ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায়
অস্ত্রের ঘাটতি নিয়ে আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং আকাশ প্রতিরক্ষায় ব্যবহৃত ইন্টারসেপ্টর। আগস্টে সিবিএস নিউজ জানিয়েছিল, ইরান যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘপাল্লার নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্রের বড় অংশ ব্যবহার করেছে। একই সময়ে Patriot ও THAAD-এর মতো আকাশ প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টরও দ্রুত ব্যবহৃত হয়েছে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করতে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টরের মজুত দ্রুত কমছে। একটি সাম্প্রতিক হামলায় প্রায় ২০টি ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে ৭০টির মতো Patriot এবং এক ডজনের বেশি THAAD ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব তথ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক অস্ত্রভাণ্ডার ‘শেষ হয়ে যাচ্ছে’ এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। বরং নির্দিষ্ট কিছু উচ্চমূল্যের ও দ্রুত ব্যবহৃত অস্ত্রের মজুত পুনরায় পূরণ করতে সময় ও উৎপাদন সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ট্রাম্পের বক্তব্য বনাম সরকারি হিসাব
অস্ত্রের মজুত নিয়ে ট্রাম্প এর আগেও একই ধরনের দাবি করেছেন। আগস্টে তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ রয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আরও অস্ত্র উৎপাদন ও সরবরাহ করা হচ্ছে। একই সময় মার্কিন কর্মকর্তারা নির্দিষ্ট কয়েক ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ইন্টারসেপ্টরের সীমিত মজুতের কথা জানিয়েছিলেন।

সেপ্টেম্বরের শুরুতেও ট্রাম্প অস্ত্রভাণ্ডার নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনকে ‘বিশ্বাসঘাতকতামূলক’ বলে আক্রমণ করেছিলেন। অন্যদিকে সামরিক পর্যবেক্ষণ ও সরকারি নথিতে বলা হয়েছে, যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সামাল দিতে কিছু অস্ত্রের উৎপাদন বাড়ানো প্রয়োজন হচ্ছে। অর্থাৎ, বিতর্কটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মোট কত অস্ত্র রয়েছে তা নিয়ে নয়; বরং কোন ধরনের অস্ত্র কত দ্রুত ব্যবহার হচ্ছে এবং শিল্পখাত সেই অস্ত্র কত দ্রুত পুনরায় তৈরি করতে পারছে তা নিয়ে।

যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, চাপও বাড়ছে
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অস্ত্রের মজুত, প্রতিরক্ষা বাজেট এবং সামরিক শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে আলোচনা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রকে একই সঙ্গে নিজেদের ঘাঁটি, যুদ্ধজাহাজ ও মিত্রদের প্রতিরক্ষায় ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করতে হচ্ছে। এদিকে যুদ্ধের আর্থিক ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে। ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মার্কিন সামরিক হিসাবের ৪৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের ব্যয় দেখাচ্ছে যে সংঘাতটি শুধু সামরিক ঝুঁকি নয়, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় আর্থিক ও লজিস্টিক চাপও তৈরি করেছে।

তবে ট্রাম্পের সর্বশেষ বক্তব্য স্পষ্ট করে যে- তার প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে দুর্বলতার ধারণা প্রতিষ্ঠিত হতে দিতে চায় না। বিপরীতে, বিভিন্ন সরকারি ও গবেষণা প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার কথা উঠে এলেও সেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের পুরো অস্ত্রভাণ্ডার ফুরিয়ে যাওয়ার প্রমাণ নয়। ফলে বর্তমান বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হলো- যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মোট কত অস্ত্র আছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের হারে প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও ইন্টারসেপ্টর কত দ্রুত পুনরায় উৎপাদন করা সম্ভব।

জেএম
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত