বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা দিন দিন বাড়ছে। এই জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে চরম ঠান্ডার মহাদেশ অ্যান্টার্কটিকায় নানা জাতের গাছপালা কীভাবে যুগের পর যুগ টিকে থাকছে, তা নিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার বিস্তারিত তথ্য সম্প্রতি সামনে এসেছে।
বরফে ঢাকা অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের নিজস্ব ফুল ফোটে এমন গাছ রয়েছে মাত্র দুটি— একটি হলো 'অ্যান্টার্কটিক হেয়ারগ্রাস' এবং অপরটি 'অ্যান্টার্কটিক পার্লওয়ার্ট'। টানা ৭ বছর ধরে বিশেষ এক পরীক্ষামূলক প্রক্রিয়ার (ওপেন টপ চেম্বার বা কৃত্রিম উষ্ণায়ন কক্ষ) মাধ্যমে এই দুটি গাছের ওপর গবেষণা চালিয়েছেন চিলি ও স্পেনের একদল গবেষক। বিজ্ঞান বিষয়ক খ্যাতনামা সাময়িকী 'ফিজিওলজিয়া প্ল্যান্টারাম'-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, একই তাপমাত্রা বৃদ্ধির পরিস্থিতিতে এই দুটি গাছ বেঁচে থাকার জন্য সম্পূর্ণ বিপরীত দুটি শারীরিক প্রতিক্রিয়া ও পদ্ধতি বেছে নিয়েছে।
এই দীর্ঘমেয়াদি গবেষণাটি চালিয়েছেন চিলির 'ইনস্টিটিউট অব ইকোলজি অ্যান্ড বায়োডাইভারসিটি' (আইইবি)-র গবেষক ড. প্যাট্রিসিয়া সায়েজ ও ড. লোহেনগ্রিন কাভিয়েরেস এবং তাদের সহযোগী গবেষক দল।
দুই পদ্ধতি, কিন্তু লক্ষ্য এক
টানা ৭ বছর কৃত্রিমভাবে তাপমাত্রা বাড়িয়ে রাখার পর গবেষকরা দেখতে পান, 'অ্যান্টার্কটিক হেয়ারগ্রাস' গাছটি তার পাতার ভেতরে পানির প্রবাহ এবং খাদ্য তৈরির প্রক্রিয়া বা সালোকসংশ্লেশনের গতি কমিয়ে দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করেছেন পানি ও শক্তি বাঁচিয়ে রেখে নিরাপদে টিকে থাকার এক ধরনের 'রক্ষণশীল পদ্ধতি' হিসেবে।
ঠিক উল্টো চিত্র দেখা গেছে 'অ্যান্টার্কটিক পার্লওয়ার্ট' গাছটির ক্ষেত্রে। অতিরিক্ত উত্তাপে এই গাছটি তার শরীরের ভেতরে পানির প্রবাহ, খাদ্য তৈরির ক্ষমতা, কোষের নমনীয়তা এবং বাতাস থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণের হার বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। উপরন্তু, গাছটির শারীরিক গঠন গদি বা কুশনের মতো হওয়ায় তা পরিবেশ থেকে অতিরিক্ত তাপ ধরে রাখতে ও নিজের শরীর উষ্ণ রাখতে সাহায্য করে।
গবেষক ড. প্যাট্রিসিয়া সায়েজ ব্যাখ্যা করে বলেন, এই গবেষণার ফলে স্পষ্ট যে, গাছের শরীরে পানির চলাচল এবং খাদ্য তৈরির প্রক্রিয়ার মধ্যে সঠিক সমন্বয়ই অ্যান্টার্কটিকার কঠিন পরিবেশে এদের বেঁচে থাকার মূল চাবিকাঠি। তবে সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, একই চ্যালেঞ্জ দুই গাছ দুইভাবে মোকাবেলা করেছে— একটি গাছ জোর দিয়েছে নিজের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার ওপর, আর অন্য গাছ জোর দিয়েছে দ্রুত পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতার ওপর।
গবেষক ড. কাভিয়েরেসের মতে, তাপমাত্রা বাড়া সত্ত্বেও সাম্প্রতিক দশকগুলোতে কীভাবে এই দুটি গাছ অ্যান্টার্কটিকায় বিলুপ্ত না হয়ে বরং ছড়িয়ে পড়ছে, তা এই আবিষ্কারের মাধ্যমেই বোঝা সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার কোনো একক বা নির্দিষ্ট 'সঠিক নিয়ম' নেই। এই দুটি গাছ মূলত টিকে থাকার দুটি চরম কৌশল নির্দেশ করে। আর এই কৌশলের বৈচিত্র্যই পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন ও বরফাবৃত পরিবেশেও ওদের একসঙ্গে সফলভাবে টিকে থাকার পেছনের রহস্য।
অনন্য ও ব্যতিক্রমী এক গবেষণা
অ্যান্টার্কটিকার কিংস জর্জ দ্বীপে অবস্থিত পোল্যান্ডের গবেষণাকেন্দ্র 'হেনরিক আর্টোভস্কি'-র কাছে ২০১২ সালে প্রথম এই পরীক্ষার জায়গাগুলো তৈরি করা হয়েছিল। এটিই বিশ্বের প্রথম কোনো মাঠপর্যায়ের গবেষণা, যেখানে অ্যান্টার্কটিকার গাছ দুটির পাতার পানির সঞ্চালন, কাণ্ডের গঠন এবং খাদ্য তৈরির ক্ষমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি উত্তাপের প্রভাব একই সঙ্গে পরীক্ষা করা হয়েছে। এর ফলে কেবল গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধিই নয়, বরং বরফ জমা ও গলার মতো বাস্তবিক পরিবেশগত পরিবর্তনগুলোর ওপর গাছের প্রতিক্রিয়া নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে।
গবেষক সায়েজ আরও যোগ করেন, গাছের পানি চলাচল ব্যবস্থা এবং খাদ্য উৎপাদনের সমন্বয়ই অ্যান্টার্কটিকায় এদের বাঁচিয়ে রাখে। একটি গাছ বেছে নিয়েছে নিরাপত্তা, অন্যটি বেছে নিয়েছে দ্রুত রূপান্তর। এই পার্থক্য গবেষকদের বুঝতে সাহায্য করছে যে আগামী দিনে জলবায়ু বদলে গেলে অ্যান্টার্কটিকার গাছপালা কেমন আচরণ করতে পারে।
ড. কাভিয়েরেস জানান, এই দুটি গাছ অ্যান্টার্কটিকায় বহু বছর ধরে পাশাপাশি সহাবস্থান করছে। আমাদের এই গবেষণা বুঝিয়ে দিল যে তারা পরিবেশের খাবার বা উপাদানের জন্য একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে না, কারণ উষ্ণায়নে তাদের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন। এই মিল-অমিল বোঝার মাধ্যমেই আগামী দশকগুলোতে অ্যান্টার্কটিকার প্রাকৃতিক সবুজ পরিবেশ কেমন রূপ নেবে, তা আমরা আগে থেকেই অনুমান করতে পারব।
চীনে নতুন প্রজাতির ডাইনোসরের কঙ্কাল উদ্ধার
বিশ্বের সবচেয়ে নিখুঁত 'পারমাণবিক ঘড়ি' তৈরি করলেন বিজ্ঞানীরা