ইয়েমেন যুদ্ধে নতুন ধরনের ক্রুজ মিসাইল ব্যবহার করছে হুথিরা?

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২৮ এএম

ইয়েমেনের যুদ্ধে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতায় নতুন কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না, তা নিয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার দাবি করেছে, ইরানের তৈরি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরিবর্তন করে হুথিরা এমন এক ধরনের ‘লোইটারিং ক্রুজ মিসাইল’ তৈরি করেছে, যা আকাশে কিছু সময় অবস্থান করে তাপের উৎস অনুসরণ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে পারে। তবে এই দাবির স্বাধীন ও চূড়ান্ত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

ইয়েমেনি সরকারের সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাজেদ আল-নাজিলি দাবি করেছেন, হুথিরা ইরানি আকাশ প্রতিরক্ষা অস্ত্রকে পরিবর্তন করে এসব ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রগুলো প্রায় ২৫ মিনিট পর্যন্ত আকাশে অবস্থান করতে পারে এবং তাপ অনুসরণকারী ব্যবস্থা ব্যবহার করে লক্ষ্য শনাক্ত করে। এতে সামরিক ও বেসামরিক উড়োজাহাজের মধ্যে পার্থক্য করার সক্ষমতা না থাকায় দক্ষিণ লোহিত সাগর ও ইয়েমেনের আকাশপথে বেসামরিক বিমান চলাচলের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।

ইতালির ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল স্টাডিজের গবেষক এলিওনোরা আরদেমাগনি বলেছেন, হুথিরা সত্যিই কোনো ইরানি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরিবর্তন করেছে—এমন চূড়ান্ত প্রমাণ নেই। তবে বিষয়টি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়ার মতো অবস্থাও নেই। তাঁর মতে, দীর্ঘদিনের যুদ্ধের মধ্যেও হুথিরা অস্ত্র ব্যবস্থায় পরিবর্তন ও উদ্ভাবনের সক্ষমতা দেখিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, হুথিরা সাধারণত ইরান থেকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত ক্ষেপণাস্ত্র পাওয়ার পরিবর্তে বিভিন্ন উপাদান পেয়ে ইয়েমেনেই সেগুলো সংযোজন বা পরিবর্তন করে থাকে। ফলে অস্ত্র সংযোজন ও পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব কারিগরি সক্ষমতা তৈরি হয়েছে বলে গবেষকদের ধারণা।

আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের জুনে ইয়েমেনের সরকারপন্থী ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্স হুথিদের জন্য পাঠানো ৭৫০ টন অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের একটি চালান আটক করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, ওই চালানে ক্রুজ, জাহাজবিধ্বংসী ও বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্তরও ছিল।

লোইটারিং ধরনের অস্ত্র সাধারণ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে ভিন্নভাবে কাজ করতে পারে। এগুলো নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আকাশে অবস্থান করে লক্ষ্য খুঁজে নেওয়ার সুযোগ পায়। ইয়েমেনি সামরিক বিশ্লেষক মোহাম্মদ আল-কুমাইমের দাবি, হুথিদের নতুন ব্যবস্থাটি তাপীয় বা তড়িৎ-তাপীয় বিকিরণ অনুসরণ করে আকাশে থাকা লক্ষ্যবস্তুর গতিপথ শনাক্ত করতে পারে।

ইয়েমেনি সামরিক বিশেষজ্ঞ আলি আল-ধাহাবের মতে, এ ধরনের অস্ত্র আকাশে চলমান যেকোনো বস্তুর জন্য দীর্ঘস্থায়ী ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে এসব মূল্যায়নও মূলত ইয়েমেনি পক্ষের বক্তব্য ও বিশেষজ্ঞ মতামতের ওপর নির্ভরশীল; অস্ত্রটির প্রকৃত নকশা ও সক্ষমতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।

হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হওয়ার সময়েই সৌদি আরবের বিরুদ্ধে তাদের হামলা বেড়েছে। ২৪ সেপ্টেম্বর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছিল, হুথিদের ছোড়া ছয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তায়েফ ও লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ইয়ানবুর দিকে যাওয়ার পথে প্রতিহত করা হয়েছে।

এর কয়েক ঘণ্টা পর হুথিরা দাবি করে, তারা রিয়াদের একটি ‘সংবেদনশীল স্থাপনা’ এবং ইয়ানবুতে সৌদি আরামকোর স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। হুথি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি জানান, এসব অভিযানে ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ রিয়াদের ওই হামলার দাবি নিশ্চিত করেনি এবং হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির খবরও দেয়নি।

ইয়ানবু সৌদি আরবের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ লোহিত সাগরের এই বন্দর দিয়ে দেশটির তেল রপ্তানির একটি বড় অংশ পরিচালিত হয়। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে ইয়ানবু ও ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন সৌদি তেল রপ্তানির বিকল্প পথ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে ইয়ানবুকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা হলে তার প্রভাব শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন