ইরানের তেল বাণিজ্যে ক্রিপ্টোর ব্যবহার বাড়ার আশঙ্কা

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০২:১৯ পিএম

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চাপ আরও বাড়লে ইরান তেল বিক্রি ও বিভিন্ন পণ্য কেনাবেচায় ক্রিপ্টোকারেন্সি, বিশেষ করে মার্কিন ডলারের সঙ্গে মূল্য স্থির রাখা স্টেবলকয়েনের ব্যবহার আরও বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন এক মার্কিন বিশ্লেষক।

ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের (এফডিডি) ব্লকচেইন ও ক্রিপ্টো বিশ্লেষক ম্যাক্স মেইজলিশের বরাত দিয়ে ইরান ইন্টারন্যাশনাল এ তথ্য জানিয়েছে। তাঁর মতে, নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ইরানি তেল বিক্রি থেকে অর্থ লেনদেন এবং চীন থেকে বিভিন্ন পণ্য কেনার ক্ষেত্রে স্টেবলকয়েন তেহরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।

মেইজলিশ বলেন, ইরানি সরকার বিভিন্ন ধরনের ক্রিপ্টোকারেন্সির ওপর নির্ভর করছে, যার মধ্যে স্টেবলকয়েন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ডলারের সঙ্গে মূল্য নির্দিষ্ট রাখার কারণে স্টেবলকয়েন আন্তর্জাতিক লেনদেনে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

তেল বিক্রির অর্থ সরাতে ক্রিপ্টো

ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার অন্যতম লক্ষ্য দেশটির তেল রপ্তানি থেকে পাওয়া অর্থের প্রবাহ সীমিত করা। তবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ইরানি তেল বিক্রির অর্থ সরাতে ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের অভিযোগ নতুন নয়।

সেপ্টেম্বরে মার্কিন বিচার বিভাগ প্রায় ৬ কোটি ১০ লাখ ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি জব্দের জন্য একটি দেওয়ানি বাজেয়াপ্তি মামলা করে। মার্কিন কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, ওই অর্থ নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ইরানি অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য বিক্রির মাধ্যমে অর্জিত এবং ইরান সরকার ও সামরিক সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নির্ধারিত ছিল।

মার্কিন প্রসিকিউটরদের ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট একটি নেটওয়ার্ক ইরানি তেল বিক্রির অর্থ হিসেবে ১৫০ কোটি ডলারের বেশি ক্রিপ্টো লেনদেন করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। চীন ও অন্যান্য দেশের ক্রিপ্টো-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর এবং এর উৎস আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়নি; এটি একটি দেওয়ানি বাজেয়াপ্তি মামলা।

USDT ঘিরে বাড়ছে নজরদারি

ইরানের ক্রিপ্টো লেনদেনে স্টেবলকয়েনের ভূমিকা নিয়ে সাম্প্রতিক মার্কিন তদন্তেও উদ্বেগ উঠে এসেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন সিনেটের একটি তদন্তে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ৮৪৬টি ক্রিপ্টো ওয়ালেট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এগুলোর ৮৪ শতাংশ কোনো না কোনো পর্যায়ে টেথারের USDT স্টেবলকয়েন ব্যবহার করেছে।

USDT-এর মূল্য মার্কিন ডলারের সঙ্গে প্রায় ১:১ অনুপাতে রাখার চেষ্টা করা হয়। ফলে প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে এটি ব্যবহারকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে।

রয়টার্স জানিয়েছে, টেথার ২০২৬ সালে ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ৫৫ কোটি ডলারের USDT জব্দ বা ফ্রিজ করতে মার্কিন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতা করেছে বলে জানিয়েছে। অর্থাৎ ক্রিপ্টো লেনদেন নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর সুযোগ তৈরি করলেও সেগুলো পুরোপুরি নজরদারির বাইরে নয়।

‘নতুন প্রযুক্তিতে পুরোনো নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর কৌশল’

মেইজলিশের মতে, ইরানের জন্য ক্রিপ্টোকারেন্সি ও স্টেবলকয়েনের গুরুত্ব এখন আগের চেয়ে বেশি। তিনি মনে করেন, তেহরান এমন দেশ, অঞ্চল ও ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জের দিকে ঝুঁকতে পারে যেগুলো তুলনামূলকভাবে কম নিয়ন্ত্রিত এবং যেখানে বড় অঙ্কের অর্থ স্থানান্তর করা সম্ভব।

এফডিডির এক আলোচনায় মেইজলিশ এর আগে বলেছিলেন, ইরানি সরকার ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো স্টেবলকয়েন, বিশেষ করে USDT, ব্যবহার করে বিপুল অর্থ স্থানান্তর করেছে এবং নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা কিছু ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জও এ ধরনের লেনদেনে যুক্ত ছিল।

তাঁর ভাষায়, এটি মূলত নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর পুরোনো কৌশলেরই নতুন প্রযুক্তিনির্ভর রূপ। অর্থাৎ আগে যেভাবে মধ্যস্থতাকারী, শেল কোম্পানি ও বিকল্প আর্থিক চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থ সরানোর চেষ্টা করা হতো, এখন সেই ব্যবস্থায় ব্লকচেইন ও ডিজিটাল সম্পদ যুক্ত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের হাতেও রয়েছে পাল্টা ব্যবস্থা

তবে ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের কারণে ইরানের অর্থপ্রবাহ পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে না। ব্লকচেইনের লেনদেন সাধারণত ডিজিটাল রেকর্ড রেখে যায়। ফলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ এবং অন্যান্য দেশের আইনশৃঙ্খলা সংস্থা ওয়ালেট ও লেনদেনের গতিপথ অনুসরণ করতে পারে।

মেইজলিশের মতে, যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্রিপ্টো সম্পদ ফ্রিজ বা জব্দ করার সক্ষমতা রাখে। কিন্তু এর কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করে স্টেবলকয়েন ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান এবং বিদেশি নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সহযোগিতার ওপর।

মার্কিন ট্রেজারি বর্তমানে ইরানের অর্থনীতির বিভিন্ন খাত তেল, আর্থিক ব্যবস্থা, ডিজিটাল সম্পদ ও প্রযুক্তিসহ নিষেধাজ্ঞার আওতায় রাখছে।

নিষেধাজ্ঞা বনাম ডিজিটাল অর্থনীতি

ইরানের ওপর মার্কিন অর্থনৈতিক চাপ যত বাড়ছে, ততই দেশটির বিকল্প অর্থপ্রবাহের সন্ধান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক মার্কিন পদক্ষেপে ইরানি তেল বাণিজ্য এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক নেটওয়ার্কের ওপর নজরদারি আরও জোরদার হয়েছে। এর পাশাপাশি ইরানের মুদ্রা রিয়ালও সাম্প্রতিক সময়ে রেকর্ড নিম্নমুখী হয়েছে, যা দেশটির অর্থনৈতিক চাপের মাত্রা বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এ অবস্থায় স্টেবলকয়েন ইরানের জন্য সীমিত হলেও একটি বিকল্প আর্থিক চ্যানেল হয়ে উঠতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। তবে একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রও ব্লকচেইন বিশ্লেষণ, ওয়ালেট ফ্রিজ এবং ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জের ওপর চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে এসব প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে।

ফলে ইরানের জন্য ক্রিপ্টোকারেন্সি ও স্টেবলকয়েনের ব্যবহার যেমন নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলার একটি সম্ভাব্য হাতিয়ার হয়ে উঠছে, তেমনি ওয়াশিংটনের জন্যও এটি নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের নতুন একটি ক্ষেত্র তৈরি করেছে।

এএম
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত