ইরানের ভয়েই কী আরব দেশে নেতানিয়াহুর দৌড়ঝাঁপ?

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০৫ পিএম

ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা অব্যাহত থাকার মধ্যেই আরব দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। সর্বশেষ গত রোববার তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে গিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, প্রায় ছয় ঘণ্টার ওই বৈঠকে ইরানসহ আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

নেতানিয়াহুর এই সফর এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের প্রভাব উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতেও পড়ছে। ফলে আবুধাবির বৈঠককে শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয় হিসেবে দেখছেন না পর্যবেক্ষকদের অনেকে। ইরানকে ঘিরে সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি, আঞ্চলিক সমীকরণ এবং ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও আলোচনায় থাকতে পারে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ওয়াম জানিয়েছে, শেখ মোহাম্মদ ও নেতানিয়াহু দুই দেশের সম্পর্ক এবং তা আরও জোরদারের উপায় নিয়ে আলোচনা করেছেন। নেতানিয়াহুর কার্যালয়ও জানিয়েছে, বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

তবে তিনজন জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তার বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, বৈঠকটি প্রায় ছয় ঘণ্টা স্থায়ী হয় এবং আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল ইরান।

এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ, ইরানের সঙ্গে ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের বৈরিতা এখন কেবল দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সংঘাতের প্রভাব উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা, জ্বালানি অবকাঠামো, নৌপথ এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতেও পড়ছে।

নেতানিয়াহুর আবুধাবি সফর ঘিরে আরও বড় একটি দাবি সামনে আসে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের বরাতে কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, নেতানিয়াহু ও শেখ মোহাম্মদের বৈঠকের পর একটি সম্প্রসারিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, মিসর, মরক্কো, বাহরাইন, কুয়েত, ওমান ও লিবিয়ার প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়।

ইসরায়েলের চ্যানেল ১৪-এর প্রতিবেদনে ওই বৈঠকে ইরান ও ইয়েমেনের হুথিদের মতো ‘অভিন্ন হুমকি’, গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং একটি আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা কাঠামো নিয়ে আলোচনা হওয়ার দাবি করা হয়েছে। এমনকি হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল পরিবহনের বিকল্প পথ নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। তবে এসব তথ্যের স্বাধীন ও সরকারি নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।

বরং সৌদি আরব সরাসরি ওই বৈঠকে তাদের কোনো প্রতিনিধি থাকার খবর অস্বীকার করেছে। সৌদি কর্মকর্তার বরাতে আরব নিউজ জানিয়েছে, সৌদি প্রতিনিধির উপস্থিতির খবর সত্য নয় এবং অন্য কোনো দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এমন বৈঠকের খবরও অস্বীকার করা হয়েছে। জর্ডানের একজন কর্মকর্তাও তাদের কোনো প্রতিনিধি বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন।

ফলে নেতানিয়াহু ‘একাধিক আরব দেশের সঙ্গে বৈঠক করেছেন’—এমন দাবি নিশ্চিত তথ্য হিসেবে বলা যাচ্ছে না। তবে আবুধাবি সফর এবং সেখানে ইরানকেন্দ্রিক আলোচনা নিশ্চিতভাবে ঘটেছে।

২০২০ সালের আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের মাধ্যমে ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও কৌশলগত যোগাযোগ বেড়েছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের সময় হামলার মুখে পড়ার পর আমিরাত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করেছে। আবুধাবির সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ককে ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

তবে একই সময়ে আমিরাত ইরানের সঙ্গে যোগাযোগের পথও খোলা রাখতে চাইছে। দেশটির প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ সম্প্রতি বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদি সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে ইরানের সঙ্গে সংলাপ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর হামলা বন্ধের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন।

অর্থাৎ আবুধাবির অবস্থানকে কেবল ইসরায়েলপন্থী নিরাপত্তা সহযোগিতা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। একদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ—দুই দিকই ধরে রাখার চেষ্টা করছে দেশটি।

নেতানিয়াহুর আবুধাবি সফর নিয়ে তেহরানও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আঞ্চলিক দেশগুলোকে সতর্ক করে বলেছে, ইসরায়েলের উপস্থিতি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে কোনো দেশের ভূখণ্ড যেন আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত করার কাজে ব্যবহার না হয়, সে আহ্বানও জানিয়েছে ইরান।

এর আগে ইরান আমিরাতকে নেতানিয়াহুকে আতিথ্য দেওয়ার পরিণতি নিয়েও সতর্ক করেছিল। তেহরানের বক্তব্য, ইসরায়েলের সঙ্গে আঞ্চলিক দেশগুলোর নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়লে তার প্রভাব পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর পড়তে পারে।

নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক তৎপরতার সঙ্গে ইরানকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগের একটি স্পষ্ট যোগসূত্র রয়েছে—বিশেষ করে আবুধাবিতে তাঁর দীর্ঘ বৈঠকের আলোচনায় ইরান গুরুত্ব পাওয়ার কারণে। তবে এটিকে সরাসরি ‘ইরানের ভয়ে নেতানিয়াহুর আরব দেশগুলোতে দৌড়ঝাঁপ’ হিসেবে চূড়ান্তভাবে ব্যাখ্যা করার মতো প্রমাণ এখনো নেই।

বরং ঘটনাগুলো থেকে যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হলো—ইরানকে ঘিরে সংঘাত ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নতুন করে আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের কৌশলগত যোগাযোগকে সামনে এনেছে। নেতানিয়াহু একদিকে আমিরাতের মতো মিত্র দেশের সঙ্গে নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করছেন, অন্যদিকে সৌদি আরবসহ অন্য দেশগুলোর সঙ্গে সম্ভাব্য যোগাযোগের খবরও আলোচনায় এসেছে—যদিও সেসবের কিছু সংশ্লিষ্ট দেশ অস্বীকার করেছে।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক তৎপরতাও পাশাপাশি চলছে। কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে পরোক্ষ আলোচনা অব্যাহত রয়েছে এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় স্বাভাবিক করার বিষয়টি আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে।

সব মিলিয়ে নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক আবুধাবি সফরকে মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত নিরাপত্তা সমীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা যায়। তবে এর পেছনে ব্যক্তিগত ‘ইরান-ভীতি’ কাজ করছে কি না, তা নিশ্চিত করার মতো প্রকাশ্য প্রমাণ নেই। ভীতিইরান-ভীতি? একের পর এক আরব দেশে নেতানিয়াহুর দৌড়ঝাপ- এই শিরোনামের সাপোর্ট করে এমন তথ্য সংগ্রহ করে একটি নিউজ তৈরি করে দিন

ওয়াইএ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত